Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ তালিকা সূচি

অনলাইন সংগ্রহশালা ‘আমার নজরুল’-এর এই বিশেষ বিভাগে আপনাদের স্বাগতম। বাংলা সাহিত্যের প্রলয়ঙ্করী সাড়া জাগানো কবি ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনবদ্য সাহিত্য-সমুদ্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু তাঁর কালজয়ী কাব্যসাম্রাজ্য। পরাধীনতার বিরুদ্ধে অগ্নিগর্ভ অনল বর্ষণ থেকে শুরু করে বিরহ-প্রেমের সূক্ষ্ম সুর, অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদ কিংবা শিশুদের জন্য নির্মল ছন্দের মায়াজাল—নজরুলের প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই উদ্ভাসিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বহুমাত্রিক রূপ।

পাঠক ও নজরুল-অনুরাগীদের সুবিধার্থে এই পাতায় কাজী নজরুল ইসলামের প্রকাশিত সকল কাব্যগ্রন্থের একটি সুবিন্যস্ত ও বিস্তারিত তালিকার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো। এখানে উল্লিখিত প্রতিটি কাব্যগ্রন্থের শিরোনামের সাথেই যুক্ত রয়েছে তার নিজস্ব পাতার লিংক। আপনি যে কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে বিশদ জানতে বা তার অন্তর্গত কবিতাগুলো পড়তে চান, সেই কাব্যগ্রন্থের ওপর ক্লিক করলেই সরাসরি পৌঁছে যাবেন এর মূল পাতায়—যেখানে বইটির প্রতিটি কবিতার তালিকা, স্বতন্ত্র পঠন-সংযোগ এবং বিস্তারিত রূপরেখা সাজানো রয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ সমূহের তালিকা ও বিবরণ

১. অগ্নিবীণা (১৯২২)

‘অগ্নিবীণা’ বাংলা সাহিত্যের বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ, যা কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত কাব্যসংগ্রহ। এটি ১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (অক্টোবর, ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থে নজরুলের বিদ্রোহী, প্রগতিশীল ও বিপ্লবী চিন্তাধারা স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রন্থটি কবি স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী নেতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করেন। অগ্নিবীণার প্রচ্ছদপটের নকশা করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং এঁকেছিলেন তরুণ চিত্রশিল্পী বীরেশ্বর সেন। এই গ্রন্থটি বাংলা কবিতায় আধুনিকতা ও বৈপ্লবিক ভাবনার এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

২. দোলনচাঁপা (১৯২৩)

‘দোলনচাঁপা’ কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, যা ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (আশ্বিন, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্সি ও হুগলি জেলে বন্দী থাকাকালে কবি এই কাব্যের অধিকাংশ কবিতা রচনা করেন। জেল কর্তৃপক্ষের অগোচরে কবিতাগুলো বাইরে এনে আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে এটি প্রথম সংস্করণ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে রোমান্টিক আবেগ, বিরহ, মানবতাবাদ ও স্বাধীনতার তেজস্বী সুর বিদ্যমান।

৩. বিষের বাঁশি (১৯২৪)

১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘বিষের বাঁশি’ নজরুলের অন্যতম অগ্নিগর্ভ ও রাজদ্রোহমূলক কাব্যগ্রন্থ। এতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজের অমানবিক শাসন, অত্যাচার ও কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ এবং মুক্তিকামী বিপ্লবীদের অদম্য ত্যাগ ও সংগ্রামের জয়গান গাওয়া হয়েছে। রাজদ্রোহমূলক উপাদানে পূর্ণ থাকার কারণে প্রকাশের মাত্র দু’ মাসের মাথায় (২২ অক্টোবর ১৯২৪) ব্রিটিশ সরকার কাব্যগ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

৪. ভাঙার গান (১৯২৪)

১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘ভাঙার গান’ মূলত নজরুলের একটি জাতীয়তাবাদী ও বৈপ্লবিক সংগীত-কাব্যসংগ্রহ। পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করা এবং শোষকের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়ার সোচ্চার আহ্বানে সমৃদ্ধ এই গ্রন্থটিও প্রকাশের পরপরই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়।

৫. ছায়ানট (১৯২৫)

১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘ছায়ানট’ নজরুলের এক অনবদ্য রোমান্টিক ও গীতিময় কাব্যগ্রন্থ। এতে কবির প্রীতি, বিরহ, প্রকৃতিপ্রেম ও রোমান্টিক ভাবালুতা অত্যন্ত মাধুর্যময় ভাষায় ও বৈচিত্র্যময় ছন্দে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিদ্রোহের পাশাপাশি নজরুলের কোমল সাঙ্গীতিক সত্তার এক অনন্য নিদর্শ এটি।

৬. চিত্তনামা (১৯২৫)

১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘চিত্তনামা’ কাব্যগ্রন্থটি নজরুল রচনা করেছিলেন জননেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আকস্মিক প্রয়াণে শোকাতুর হয়ে। দেশবন্ধুর মহীয়ান জীবন, ত্যাগ এবং রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে এই শোককাব্যটি রচিত ও প্রকাশিত হয়।

৭. সাম্যবাদী (১৯২৫)

১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে (পৌষ, ১৩৩২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থটি নজরুলের সমাজতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দর্শনের এক ঐতিহাসিক দলিল। এতে কবি জাত, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও সাম্যের জয়গান গেয়েছেন। তৎকালীন ঔপনিবেশিক শোষণ ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এটি ছিল এক সাহসী কাব্যিক প্রতিবাদ।

৮. পুবের হাওয়া (১৯২৬)

১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘পুবের হাওয়া’ একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ও সংগীতের সংকলন। এতে কবির যৌবনের উন্মাদের মতো বৈপ্লবিক আকুলতা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক মুক্তিকামী আন্দোলনের সংহতির সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

৯. ঝিঙে ফুল (১৯২৬)

১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ নজরুলের একটি অনন্য শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ। এটি মূলত ছোটদের জন্য লেখা ছড়া ও কবিতা সংকলন, যা বাংলা শিশুসাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এতে শিশুদের মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতি, প্রাণিজগৎ ও কল্পনার রঙিন চিত্র সহজ, সুরময় ও আনন্দদায়ক ভাষায় ফুটে উঠেছে।

১০. সর্বহারা (১৯২৬)

১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থটিতে কৃষক, শ্রমিক, মজুর ও মেহনতি মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং অধিকার আদায়ের দাবির কথা সোচ্চার হয়েছে। সর্বহারা শ্রেণির শোষণমুক্তির সংগ্রাম ও প্রসংগকে কবি এতে অত্যন্ত দরদী ও বিপ্লবী ভাবনায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

১১. ফণি-মনসা (১৯২৭)

১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘ফণি-মনসা’ সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ প্রতিবাদী কাব্যগ্রন্থ। পরাধীন দেশের অত্যাচারিত জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং ব্রিটিশ শোষকদের অন্যায়ের প্রতি কবি তীব্র চাবুক হেনেছেন এই কাব্যের রচনাগুলোতে।

১২. সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৭)

১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থে নজরুলের আধ্যাত্মিক, রোমান্টিক ও দার্শনিক ভাবনার এক নতুন উন্মেষ ঘটে। সমুদ্রের বিশালতা ও তরঙ্গের রূপকে কবি এখানে মানবপ্রেম, বিরহ এবং বিশ্বচেতনাকে উপস্থাপন করেছেন। কাব্যগ্রন্থটি তিনি হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও শামসুন নাহার চৌধুরীকে উৎসর্গ করেন।

১৩. জিঞ্জীর (১৯২৮)

১৯২৮ সালে প্রকাশিত ‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থটি পরাধীনতার শৃঙ্খল এবং দেশবাসীর অশুভ মানসিক জড়তার বিরুদ্ধে রচিত একটি বলিষ্ঠ কাব্য। এতে কবির প্রলয়ঙ্করী দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশপ্রেমের ধারা অত্যন্ত সতেজভাবে ফুটে উঠেছে।

১৪. চক্রবাক (১৯২৯)

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘চক্রবাক’ নজরুলের একটি সংবেদনশীল রোমান্টিক ও বিরহপ্রধান কাব্যগ্রন্থ। বিরহী চক্রবাক পাখির রূপকে কবি জীবনের শূন্যতা, বেদনা এবং প্রেমময় অনুভূতির সূক্ষ্ম ও গম্ভীর চিত্রায়ন করেছেন।

১৫. সন্ধ্যা (১৯২৯)

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘সন্ধ্যা’ নজরুলের অসুস্থতাপূর্ব সাহিত্যজীবনের অন্যতম পরিণত কাব্যগ্রন্থ। গোধূলির আলো-আঁধারির মতো এতে কবির বৈপ্লবিক উদ্দীপনার পাশাপাশি এক গভীর উদাসীনতা ও জীবনের গোধূলিলগ্নের ভাবাবেগ প্রকাশ পেয়েছে।

১৬. প্রলয়শিখা (১৯৩১)

১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘প্রলয়শিখা’ কাব্যগ্রন্থটি ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ও সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক অনলে পূর্ণ। এর উগ্র বিপ্লবী বাণীর কারণে প্রকাশের সাথে সাথেই ইংরেজ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করে এবং নজরুলকে রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

১৭. নির্ঝর (১৯৩৯)

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘নির্ঝর’ কাব্যগ্রন্থটিতে নজরুলের গীতিময়তা, ভাবালুতা এবং নির্ঝরিণীর মতো অবিরাম কাব্যপ্রবাহের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। এতে কবির মানসিক পরিপক্বতা ও বিচিত্র ভাবোচ্ছ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটেছে।

১৮. নতুন চাঁদ (১৯৪৫)

১৯৪৫ সালে প্রকাশিত (রচিত ১৯৩৯) ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থে নজরুলের বিপ্লবী চেতনা, প্রেম, মানবতা ও সাম্যবাদের রূপায়ণ ঘটেছে। জরাজীর্ণ পুরাতন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাঁধন থেকে মুক্তি লাভ করে নতুন যুগের আলোয় আবির্ভূত হওয়ার বার্তাই এই কাব্যের মূল সুর।

১৯. মরু-ভাস্কর (১৯৫১)

১৯৫১ সালে প্রকাশিত ‘মরু-ভাস্কর’ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর জীবন ও আদর্শ অবলম্বনে রচিত এক অনন্য ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ। চারটি সর্গে বিভক্ত এই গ্রন্থটিতে কবি ওজস্বী ও ভক্তিপূর্ণ ভাষায় নবীজীর জন্ম, নবুয়ত, নীতি, দয়া ও সার্বজনীন মানবপ্রেমের মহাকাব্যিক চিত্র তুলে ধরেছেন।

২০. শেষ সওগাত (১৯৫৮)

১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সওগাত’ নজরুল ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মরণোত্তর কাব্যসংগ্রহ। কবি সাহিত্যসাধনা থেকে নীরব হয়ে যাওয়ার পূর্বে রচিত বিভিন্ন সাময়িকীতে ছড়িয়ে থাকা দুর্লভ ও অপ্রকাশিত কবিতা এতে সংকলিত হয়।

২১. ঝড় (১৯৬০)

১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘ঝড়’ নজরুলের প্রলয়ঙ্করী ও বৈপ্লবিক ভাবনার কবিতা নিয়ে তৈরি একটি সংকলিত কাব্যগ্রন্থ। এতে পরাধীনতা ও অন্যায়ের জরাজীর্ণ ভিত্তিকে ঝড়ের বেগে চূর্ণ করার বিপ্লবী রূপায়িত বাণী সংগৃহীত রয়েছে।
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত