বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য-সমুদ্রে ‘নির্ঝর’ (১৯৩৯) এক পরম ব্যতিক্রমী ও ভাগ্যবিড়ম্বিত কাব্যগ্রন্থ। কবিজীবনের প্রারম্ভিক পর্বে—১৯২৪ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে রচিত কবিতাগুলোর সমন্বয়ে ১৯২৬ সালেই এই কাব্যের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু নানা অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা, প্রকাশকদের অনীহা ও দীর্ঘ ১৩ বছরের ইতিহাস-পরিক্রমা পেরিয়ে বইটি অবশেষে ১৯৩৯ সালের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ) গ্রন্থাকারে আলোর মুখ দেখায়।
কাব্যচর্চার সূচনাপর্বের রচনা হলেও ‘নির্ঝর’ প্রকাশিত হয় নজরুলের সুস্থ-সক্রিয় সাহিত্যজীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে। কবির বাঁধভাঙা যৌবনের উচ্ছ্বাস, রোমান্টিক ভাবালুতা, প্রকৃতিপ্রেম ও রূপক-চেতনার এক স্বতঃস্ফূর্ত পাহাড়ি ঝরনার মতো রূপায়িত প্রকাশ ঘটেছে এই কাব্যগ্রন্থে।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস ও পাণ্ডুলিপির রোমাঞ্চকর পথচলা
‘নির্ঝর’ কাব্যগ্রন্থটি নজরুলের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ অলিখিত প্রতীক্ষার সাক্ষী। ১৯২৬ সালে নজরুল যখন ঢাকায় গমন করেন, তখন ঢাকার কয়েকজন তরুণ উদীয়মান সাহিত্যিক (মোহাম্মদ কাসেম, আবদুল কাদির প্রমুখ)-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। মোহাম্মদ কাসেম ‘অভিযান’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছা জানালে কবি তাঁকে ‘অভিযান’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখে দেন। পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদ কাসেম কবির একটি গ্রন্থ প্রকাশের আগ্রহ দেখালে নজরুল স্বল্প অর্থ সম্মানের বিনিময়ে ‘নির্ঝর’ কাব্যের মূল পাণ্ডুলিপিটি তাঁর নিকট হস্তান্তর করেন।
তবে আর্থিক সংকট ও পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে মোহাম্মদ কাসেম গ্রন্থটি সময়মতো প্রকাশ করতে পারেননি। ১৯৩০-৩১ সালের দিকে পাণ্ডুলিপিটি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ‘মোহসিন অ্যান্ড কোং’-এর সত্ত্বাধিকারী মৌলবী এমদাদ আলি খানের প্রেসে এটি মুদ্রণের কাজ শুরু হয়। প্রেসের ফর্মা ছাপা শেষ হওয়া সত্ত্বেও অজানা কারণে বইটি দীর্ঘকাল বাঁধাই ও বাজারজাতকরণ থেকে আটকে থাকে। অবশেষে ১৯৩৯ সালে কলকাতার ৬৬-১এ বৈঠকখানা রোডস্থ ‘দি মডেল লিথো অ্যান্ড প্রিন্টিং ওয়ার্কস’ থেকে প্রচ্ছদসহ বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। প্রকাশনার এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণেই গবেষকগণ ‘নির্ঝর’-কে নজরুলের কাব্য-ইতিহাসের এক ‘ভাগ্যবিড়ম্বিত রত্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
২. নামকরণ ও মূল ভাবাদর্শ
‘নির্ঝর’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো পাহাড়ি ঝরনা বা প্রবাহ। পর্বতগুহা থেকে যেভাবে কোনো বাঁধা না মেনে স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় জলরাশি সমতলে নেমে আসে, ঠিক তেমনি তরুণ নজরুলের হৃদয়ের পুঞ্জীভূত আবেগ, গীতিময়তা ও সৌন্দর্যতৃষ্ণা কবিতা হয়ে ঝরে পড়েছে এই সংকলনে।
কাব্যগ্রন্থের মূল ভাবাদর্শ তৈরি হয়েছে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর:
১. যৌবনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও গীতিময়তা: প্রথাগত ব্যাকরণ বা জটিল দর্শনের তোয়াক্কা না করে অন্তরের সহজ রূপতৃষ্ণাকে গীতিময় ছন্দে প্রকাশ করা।
২. প্রকৃতি ও মানব হৃদয়ের ব্যাকুলতা: বসন্ত, নিশীথ, গোধূলি কিংবা পাহাড়ি কাননের পটভূমিতে প্রেমিক হৃদয়ের চিরন্তন বিরহ ও অভিসার।
৩. মুক্তির অন্বেষণ ও বাঁধনহারা সত্তা: সামাজিক ও মানসিক সকল প্রথা ভেঙে অসীমের পানে ছুটে চলার অদম্য আকুলতা।
৩. কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু ও গীতি-সুর
‘নির্ঝর’ কাব্যগ্রন্থে সঞ্চিত ২৫টি কবিতার মধ্যে নজরুলের বহুমাত্রিক তরুণ সত্তার বেশ কয়েকটি রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
- রোমান্টিকতা ও অনাগত প্রিয়ার রূপচিত্র: কাব্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অনামিকা বা অনাগত প্রেয়সীর প্রতি অদম্য আকর্ষণ। ‘অ-নামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘চির-দূরে থাকা’ কিংবা ‘মায়াবিনী’ কবিতাগুলোতে অধরা প্রেমের যে সূক্ষ্ম বিরহগাথা ফুটে উঠেছে, তা নজরুলের রোমান্টিক কাব্যধারার শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
- প্রকৃতি ও পরিবেশের রূপক: প্রকৃতিকে কবি কেবল বাইরের দৃশ্যপট হিসেবে দেখেননি, তাকে নিজের কাব্যিক অনুভূতির আয়না বানিয়েছেন। ‘অমর কানন’, ‘গোধূলি’ এবং ‘ফাল্গুনী’ রচনাগুলোতে প্রকৃতির রূপ বদলের সাথে সাথে মানুষের মনোজাগতিক তোলপাড় চমৎকারভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।
- পথিক-চেতনা ও দূর-পিয়াসী মন: ‘পথচারী’, ‘পথ-পাগল’ ও ‘দূর-বংশী’ কবিতায় ধরা পড়ে নজরুলের চিরন্তন মুসাফির রূপ। কোনো এক সুদূর বাঁশির টানে সংসার-সীমানা ছেড়ে অসীমের পথে পা বাড়ানোর যে বৈরাগ্যময় সুর, তা নজরুলের বাউল ও আধ্যাত্মিক সত্তাকে স্পষ্ট করে।
৪. সাহিত্যিক গুরুত্ব ও নান্দনিক মূল্যায়ন
নজরুল-সাহিত্যের বিচারে ‘নির্ঝর’-এর স্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
- সূচনা ও পরিণতি পর্বের সেতু বন্ধন: ১৯২৪-২৫ সালের তরুণ নজরুলের সতেজ অনুভূতি এবং ১৯৩৯ সালের প্রৌঢ় নজরুলের পরিপক্ব গ্রন্থায়নের সমন্বয় এই বইটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
- গীতিময় ছন্দের প্রাচুর্য: এতে জটিল রাজদ্রোহ বা সাম্যবাদী রাজনীতির হট্টগোল কম, কিন্তু শব্দচয়ন, মিল এবং ছন্দের এক অপূর্ব মিষ্টতা রয়েছে যা পাঠককে আচ্ছন্ন করে।
- নজরুল-গবেষণার দুর্লভ আকর: কবি কীভাবে ‘বিদ্রোহী’ থেকে ‘গীতিকবি’তে নিজেকে রূপান্তর করছিলেন, তার প্রারম্ভিক অণুবীক্ষণিক চিত্র এই কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে।
‘নির্ঝর’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা সূচি
- অভিমানী
- অ-নামিকা
- নিশীথ-প্রদীপ
- অমর কানন
- পথচারী
- চির-দূরে থাকা
- আত্মকথা
- নির্ঝর
- খেয়ালী
- পূজারী
- বন্দিনী
- ফাল্গুনী
- অনাগত
- উদাসী
- অভিসার
- স্বপ্ন-সহচরী
- বিদায়-আরতি
- রূপ-তৃষ্ণা
- বাউলের গান
- গোধূলি
- বন্দনা
- মায়াবিনী
- পথ-পাগল
- দূর-বংশী
- শেষ-উপহার




















