কাজী নজরুল ইসলামের বিচিত্র সাহিত্য-সাধনায় ‘সন্ধ্যা’ (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, রূপান্তরকালীন ও মহিমাময় অধ্যায়। ১৯২৯ সালের আগস্ট মাসে (ভাদ্র, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত এই গ্রন্থটি কবির যৌবনের তুঙ্গ মুহূর্ত, মুক্তিকামী তরুণ সমাজের জাগরণ, প্রলয়ঙ্করী বিদ্রোহ এবং একই সাথে এক স্নিগ্ধ, গভীর ভাবালুতার অপূর্ব মেলবন্ধন।
নজরুলের প্রথমার্ধের কাব্যধারায় যেখানে অনলবর্ষী রাজদ্রোহ (‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’) কিংবা রোমান্টিক প্রেমের আবেশ (‘দোলনচাঁপা’, ‘ছায়ানট’) প্রাধান্য পেয়েছিল, সেখানে ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থে এসে কবির স্বর লাভ করেছে এক নতুন দিগন্ত—যেখানে রয়েছে যৌবনের জয়গান, রণসংগীতের অদম্য ছন্দ, সামাজিক অসঙ্গতির চাবুক এবং বৈশ্বিক মুক্তিসংগ্রামের প্রতি গভীর সংহতি।
Table of Contents
Toggle১. নামকরণ ও কাব্যভাবনা
‘সন্ধ্যা’ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে আলো-আঁধারির গোধূলিলগ্ন বা অবসানকে নির্দেশ করলেও, নজরুলের কাব্যে এই ‘সন্ধ্যা’ কোনো নিষ্প্রভ সমাপ্তি নয়। এটি মূলত প্রাচীন জরা ও শৃঙ্খলে আবদ্ধ পরাধীন যুগের ‘সন্ধ্যা’ বা অবসান, যা নতুন প্রভাতের উষালগ্নকে আবাহন জানায়।
কাব্যগ্রন্থের সূচনা কবিতা ‘সন্ধ্যা’ এবং অন্যান্য কবিতায় কবি শোষিত ও ঘুমন্ত স্বদেশকে জাগানোর আকুলতা ব্যক্ত করেছেন। একদিকে পরাধীন স্বদেশের ওপর জমে থাকা অন্ধকার, অন্যদিকে যৌবনের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে সেই অন্ধকার ভেদ করার প্রত্যয়—এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণই হলো নজরুলের ‘সন্ধ্যা’।
২. ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
১৯২০-এর দশকের শেষার্ধ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উত্তাল অধ্যায়। সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন, তরুণ বিপ্লবীদের ঝটিকা অভিযান এবং বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামের দাবানল তখন ছড়িয়ে পড়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে নজরুল তরুণ সমাজকে কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং সামাজিকভাবে ও আত্মিকভাবে জাগ্রত করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন।
একই সাথে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও কবির ভাবনাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। মরক্কোর রিফ অঞ্চলে ‘আব্দুল করিম’-এর নেতৃত্বে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং তুর্কি ও মুসলিম বিশ্বের নবজাগরণ কবিকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, যার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে এই কাব্যের কবিতায়।
৩. মূল ভাবাদর্শ ও থিমভিত্তিক বিশ্লেষণ
ক) যৌবনের গতিবেগ ও রণসংগীত
এই কাব্যগ্রন্থেরই সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজন হলো কালজয়ী গান ‘চল্ চল্ চল্’, যা পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘জাতীয় রণসংগীত’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে। উচ্চকিত ছন্দে রচিত এই গানটিতে যৌবনের গতি, শৃঙ্খলভাঙার উন্মাদের মতো স্পর্ধা এবং বাধা-বিঘ্ন চূর্ণ করে এগিয়ে যাওয়ার যে মন্ত্র ধ্বনিত হয়েছে, তা সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেই বিরল।
একই ভাবধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘জীবন-বন্দনা’, যেখানে কবি জীবনকে ভয় না পেয়ে অজানার উদ্দেশ্যে ধাবমান দুঃসাহসী বেদুঈন ও তরুণদের জয়গান গেয়েছেন।
খ) বৈশ্বিক মুক্তিসংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক সংহতি
গ) সামাজিক কুসংস্কার ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ
ঘ) ভোরের আবাহন ও নতুন যুগের প্রত্যাশা
৪. সাঙ্গীতিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
‘সন্ধ্যা’ গ্রন্থটি নজরুলের কাব্য ও সঙ্গীত—এই দুই রূপের এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণ। এতে সংকলিত বহু রচনা কেবল পাঠ্য কবিতা হিসেবেই নয়, বরং গান হিসেবেও অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কুচকাওয়াজের লয়, মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ঝংকার এবং তৎসম ও আরবি-ফারসি শব্দের স্বচ্ছন্দ ব্যবহার কবিতাগুলোকে দান করেছে অসাধারণ এক সাঙ্গীতিক গতিশীলতা।
বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক বল জোগাতে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের উদ্দীপনা তৈরিতে এই কাব্যের ‘চল্ চল্ চল্’ গানের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ
- সন্ধ্যা
- অন্ধ স্বদেশ
- তরুণ তাপস
- আমি গাই তারি গান
- জীবন-বন্দনা
- চল্ চল্ চল্ (বাংলাদেশের জাতীয় রণসংগীত)
- জীবন
- যৌবন
- তরুণের গান
- ভোরের পাখি
- কাল-বৈশাখী
- ভোরের সানাই
- যৌবন-জল-তরঙ্গ
- রীফ-সর্দার
- বাংলার “আজিজ”
- নগদ কথা
- পাথেয়
- দাড়ি-বিলাপ
- তর্পণ
- না-আসা-দিনের কবির প্রতি
- জাগরণ
- জাগো সুন্দর
- সন্ধ্যা-তারা
- প্রভাতী আকাশ

















