Editor's Choice

বাংলা সাহিত্যের প্রলয়ঙ্করী ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙে ফুল’ (১৯২৬)। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে যখন তিনি এক হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘অগ্নিবীণা’ বা ‘বিষের বাঁশি’ বাজাচ্ছিলেন, অন্য হাতে ঠিক তখনই শিশু-কিশোরদের নির্মল আনন্দের জগতে সৃষ্টি করেছিলেন এক অনাবিল রূপকথার ভুবন। কঠোর রাজনৈতিক উত্তাপ ও বিপ্লবের পাশাপাশি নজরুলের কোমল, শিশুলভ ও দূরন্ত হৃদয়ের অনন্য আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এই গ্রন্থে। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে ‘ঝিঙে ফুল’ কেবল একটি কবিতার বই নয়, বরং এটি শৈশবের চপলতা, প্রকৃতিপ্রেম, অনাবিল হাস্যরস ও চিরন্তন শিশুমনস্তত্ত্বের এক অপূর্ব দলিল।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পটভূমি

‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থটি ১৩ ৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ) কলকাতা থেকে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

  • প্রকাশক: ডি. এম. লাইব্রেরি (৬১ নম্বর কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, কলকাতা)।
  • মুদ্রণালয়: কান্তিক প্রেস (২২ নং সুকিয়া স্ট্রিট, কলকাতা)।
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা ও মূল্য: প্রথম সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪২ এবং বিক্রি মূল্য রাখা হয়েছিল মাত্র ১২ আনা।

১৯২৬ সালটি নজরুলের সাহিত্য জীবনের অন্যতম ব্যস্ত ও বৈচিত্র্যময় সময় ছিল। এই বছর একদিকে তাঁর ‘সর্বহারা’ ও ‘পুবের হাওয়া’-র মতো প্রগতিশীল বই প্রকাশিত হয়, অন্যদিকে প্রকাশিত হয় শিশুতোষ সংকলন ‘ঝিঙে ফুল’। শিশুদের জন্য লেখা হলেও এর প্রাঞ্জল সাঙ্গীতিক ছন্দ ও নিখাদ রস সাহিত্যের সকল বয়সের পাঠকদের সমভাবে মুগ্ধ করেছিল।

২. শিশুমনস্তত্ত্ব ও ভাববস্তুর বহুমাত্রিকতা

নজরুল ‘ঝিঙে ফুল’-এ শিশুদের উপদেশদাতার মতো কোনো নীতিবাক্য বা শুষ্ক পাঠ শেখাননি। বরং তিনি স্বয়ং এক শিশু সেজে শিশুদের দলে মিশে গেছেন। এই কাব্যের মূল ভাবধারাকে কয়েকটি বিশিষ্ট দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়:

ক) প্রকৃতির সাথে শৈশবের আত্মীয়তা

কাব্যগ্রন্থের নামকরণের কবিতা ‘ঝিঙে ফুল’ কিংবা চিরচেনা ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’-তে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের সাথে শিশুর সহজ-সরল বন্ধুত্বের ছবি ধরা পড়েছে। মাচানের হলুদ ঝিঙে ফুলটি মাটি-মায়ের প্রতি ভালোবাসায় আসমানের তারার ডাক ফিরিয়ে দেয়, আর পুতুল-খেলুড়ে খুকি পেয়ারা খাওয়া কাঠবেড়ালির সাথে বায়না ধরে স্নেহের অভিমান করে। প্রকৃতির এই সজীব রূপায়ণ শিশুদের পর্যবেক্ষণশক্তি ও সংবেদনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে।

খ) শৈশবের চপলতা, রোমাঞ্চ ও ছদ্ম-দুষ্টুমি

শিশুদের দূরন্তপনা, ফল চুরি করার রোমাঞ্চ এবং ধরা পড়ার পর মজার ভয় ফুটিয়ে তুলতে ‘লিচু চোর’ কবিতার কোনো তুলনা নেই। “বাবুদের তাল-পুকুরে / হাবুদের ডাল-কুকুরে” থেকে শুরু করে মালি ও কুকুরের তাড়া খাওয়ার দৃশ্যকল্প বাংলা ভাষার প্রতিটি পাঠকের শৈশবস্মৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। একইভাবে ‘হোঁদলকুতকুতের বিজ্ঞাপন’ কবিতায় বৈচিত্র্যময় স্বভাবের শিশুদের রসাত্মক ও মজার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

গ) সামাজিক কৌতুক ও আত্মীয়তার মায়াজাল

কাব্যগ্রন্থে বাঙালি পরিবারের পারিবারিক আমেজ ও আত্মীয়তার মাধুর্য অত্যন্ত সজীব। ‘খাঁদু-দাদু’, ‘দিদির বে-তে খোকা’, ‘খোকার গপ্‌প বলা’ কিংবা ‘খোকার বুদ্ধি’ কবিতাগুলোতে নানা পারিবারিক চরিত্র ও খোকার অদ্ভুত সব কল্পনাবিলাস হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে।

ঘ) শুভ সকাল ও জাগরণের বার্তা

কাব্যের অন্যতম সেরা সংযোজন ‘প্রভাতী’ কবিতা। “ভোর হোলো / দোর খোলো / খুকুমণি ওঠ রে!”—এই অমর পংক্তির মাধ্যমে কবি কেবল খুকুমণিকে ঘুম থেকে ওঠার আহ্বান জানাননি, বরং অলসতা ছেড়ে নতুন দিনের নতুন সম্ভাবনাকে স্বাগত জানানোর সার্বজনীন প্রেরণা দিয়েছেন।

৩. ভাষাশৈলী, ছন্দ ও শব্দকৌশল

‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর প্রধান শক্তি হলো এর অনন্য সাঙ্গীতিক গতি এবং বাকছন্দ।
  • অনুকরণাত্মক শব্দ ব্যবহার: নজরুল শিশুদের আধো-আধো কথা, হাসিকান্না ও লোকায়ত ঢং ধরে রাখতে প্রভূত অনোনোমেটোপিয়া বা ধ্বন্যাত্মক শব্দ ব্যবহার করেছেন (যেমন—নাক ডেঙাডেং ড্যাং, মিচকে-মারা, ছ্যাঁচড় ছেলে, ড্যাবড্যাবিয়ে, ভ্যাবিয়ে)।
  • কথোপকথনমূলক নাট্যগুণ: ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ বা ‘খোকার গপ্‌প বলা’ কবিতাগুলো যেন এক একটি ছোট নাটিকা। সংলাপে ভরা ভাষা পাঠকে সরাসরি দৃশ্যের ভেতরে নিয়ে যায়।
  • ছন্দের দ্রুত লয়: স্বরবৃত্ত বা ছড়ার ছন্দে রচিত এই রচনাগুলো আবৃত্তি করা সহজ এবং সুর দিয়ে গান হিসেবে গাওয়াও অত্যন্ত প্রাঞ্জল।

৪. বাংলা শিশুসাহিত্যে ‘ঝিঙে ফুল’-এর ঐতিহাসিক স্থান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা যোগীন্দ্রনাথ সরকারের শিশুসাহিত্যের নিজস্ব আভিজাত্য ও লালিত্য ছিল। কিন্তু নজরুল ‘ঝিঙে ফুল’-এর মাধ্যমে বাংলা শিশুসাহিত্যে এক নতুন প্রাণবন্ত মাটির গন্ধ ও অনাবিল স্পন্দন এনে দেন। এখানে শিশুরা পুতুল সদৃশ কোনো আদর্শ চরিত্র নয়; তারা আছাড় খায়, গাছে ওঠে, মার খায়, গপ্পো বানায় এবং খিলখিল করে হাসে।

এই বইটির কবিতাগুলো কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী শিশুদের মনে কল্পনার জগৎ তৈরি করে আসছে। ‘ঝিঙে ফুল’ প্রমাণ করে যে, যিনি বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা ও বিপ্লবের গান গাইতে পারেন, তিনিই পরম মমতায় একটি শিশুর হৃদয়ের ভাষা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে পড়তে পারেন।

ঝিঙে ফুল কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র

‘ঝিঙে ফুল’ (১৯২৬) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত ১৪টি কালজয়ী কবিতার ধারাবাহিক তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত