Table of Contents
Toggle১. রচনার নেপথ্য, কালপঞ্জি ও প্রকাশনা ইতিহাস
‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বই আকারে আত্মপ্রকাশ করলেও এটি নজরুলের সুস্থ থাকাকালীন সৃষ্টি। ১৯৪২ সালে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারানোর পূর্বেই তিনি এই কাব্যগ্রন্থের সিংহভাগ কবিতা রচনা শেষ করেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন পান্ডুলিপি ও সাময়িকীতে ছড়িয়ে থাকা কবিতাগুলোকে সংকলিত করে গ্রন্থাকারে আলোয় আনা হয়।
কাব্যের নামকরণ ‘মরু-ভাস্কর’ রূপকটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর মূল দর্শন। ‘মরু’ অর্থাৎ আরবের শুষ্ক, তপ্ত প্রান্তর; আর ‘ভাস্কর’ শব্দের অর্থ সূর্য। অনাচার, অজ্ঞতা ও অমানবিকতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব মরুপ্রান্তরে আলোর বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন যে মহামানব—নজরুল তাঁকেই চিত্রিত করেছেন মরুভূমির অবিনাশী প্রখর সূর্য হিসেবে।
২. মূল ভাবাদর্শ: অলৌকিকত্ব অতিক্রম করে ‘মানব মুহাম্মদ (সঃ)’
- মহাসাম্যের ঘোষণা: জাতপাত, বর্ণ ও গোত্রীয় অহংকার চূর্ণ করে কীভাবে একজন মানুষ দাস প্রথার অবসান ঘটান এবং মানবজাতিকে এক সমতাভিত্তিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন।
- উৎপীড়িতের আশ্রয় ও ক্ষমা: শত্রুর প্রতি অসীম ক্ষমা, অনাথ-দরিদ্রের প্রতি অপরিসীম মমতা এবং পার্থিব ঐশ্বর্য ত্যাগ করে অতি সাধারণ জীবনযাপনের মহতী রূপায়ণ।
- নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা: আরব সমাজের অন্ধকার যুগে কন্যাসন্তান হত্যা ও নারীকে পণ্যের মতো দেখার গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নারীর সামাজিক ও আত্মিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জয়গান।
৩. কাব্যিক গঠন রূপরেখা: চার সর্গের মহাসঙ্গীত
- প্রথম সর্গ (আবির্ভাব ও প্রাক-জীবন): হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শুভ আবির্ভাবের পূর্ব মুহূর্তের জরাগ্রস্ত আরব সমাজ, অনাগত আলোর অপেক্ষা, তাঁর প্রসূতি আমিনার স্বপ্ন এবং দাদা আবদুল মুত্তালিবের সান্নিধ্যে শৈশবের দিনগুলোর কাব্যিক সুর।
- দ্বিতীয় সর্গ (শৈশব ও বাল্যলীলা): দাই-মা হালিমার কোলে কাটানো সময়, মায়ের প্রয়াণ, ‘সাক্কুস সাদর’ বা হৃদয় উন্মোচনের আধ্যাত্মিক ঘটনা এবং ইয়াতিম মোহাম্মদের ‘সর্বহারা’ রূপ—যা তাঁকে বিশ্ব সর্বহারার পরম বন্ধুই হিসেবে গড়ে তোলে।
- তৃতীয় সর্গ (কৈশোর ও সত্যাগ্রহ): কৈশোরের দিনগুলো, সত্য ও ন্যায়ের পথে তাঁর অবিচল অবস্থান এবং সমাজের অনাচারের বিরুদ্ধে শান্তিকামী ‘হিলফুল ফুজুল’ গঠনের মতো ঘটনাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত।
- চতুর্থ সর্গ (যৌবন, বিবাহ ও কাবা পুনর্নির্মাণ): বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, ‘নও কাবা’ কবিতায় হাজরে আসওয়াদ বসানো নিয়ে কুরাইশদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে তাঁর প্রজ্ঞা এবং কাব্যের শেষে পরম ‘সাম্যবাদী’ চেতনার বিজয় ঘোষণা।
৪. ভাষাশৈলী ও শব্দ অলংকার
‘মরু-ভাস্কর’-এ নজরুলের শব্দচয়ন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের সাবলীল সংমিশ্রণের সাথে সংস্কৃত ও দেশি শব্দবন্ধকে তিনি এমন এক রসায়নে যুক্ত করেছেন, যা পাঠকমনে মুহূর্তেই এক মরুময় গাম্ভীর্য ও আরব্য আবহ তৈরি করে।
ওজস্বী ছন্দের প্রবাহ, ভাবগম্ভীর সুর এবং আখ্যান রচনার চাতুর্য কবিতাগুলোকে একাধারে শ্রুতিমধুর ও হৃদগ্রাহী করে তুলেছে। নজরুল এখানে কোনো অন্ধ গোঁড়ামির আশ্রয় নেননি, বরং সত্যের প্রতি এক অকুন্ঠ অনুরাগে কবিতার ছন্দ বুনেছেন।
৫. সাহিত্যিক ও কালজয়ী গুরুত্ব
নজরুল যখন ‘মরু-ভাস্কর’ রচনা করেন, তখন বাংলা সাহিত্যের এক অংশে ইসলামি ঐতিহ্যকে কেবল সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার মানসিকতা ছিল। নজরুল সেই প্রাচীর ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, মহানবী (সঃ)-এর জীবন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মের ফ্রেমে বন্দী নয়; তিনি সমগ্র বিশ্বমানবের।
বিদ্রোহের অগ্নিবীণা যিনি বাজিয়েছেন, তিনিই আবার পরম ভক্তিতে ‘মরু-ভাস্কর’-এর স্তোত্র রচনা করেছেন—এই বৈচিত্র্যই নজরুলের অবিনাশী কবিসত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলা ভক্তিমূলক ও ইসলামি কাব্যধারায় ‘মরু-ভাস্কর’ আজও সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে।
মরু-ভাস্কর কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র
প্রথম সর্গ
- অবতরণিকা
- অনাগত
- স্বপ্ন
- আলো-আঁধারি
- দাদা
- পরভৃত
দ্বিতীয় সর্গ
- শৈশব-লীলা
- প্রত্যাবর্তন
- “সাক্কুস সাদ্র” (হৃদয় উন্মোচন)
- সর্বহারা
তৃতীয় সর্গ
- কৈশোর
- সত্যাগ্রহী মোহাম্মদ
চতুর্থ সর্গ
- শাদী মোবারক
- খদিজা
- সম্প্রদান
- নও কাবা
- সাম্যবাদী




















