Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের কবিমানসের এক বিরল ও অমূল্য রত্ন ‘মরু-ভাস্কর’ (১৯৫১)। সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলকে অনেকেই চেনার চেষ্টা করেছেন প্রলয়ঙ্করী বিদ্রোহ, প্রেম কিংবা বিরহের সংগীতে; কিন্তু তাঁর সৃষ্টির গভীরে যে পরম আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা, ভক্তি ও মানবতার প্রতি নিখাদ নিষ্ঠা বিদ্যমান ছিল—তার উজ্জ্বলতম স্মারক এই ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থ। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর জীবনচরিত ও আদর্শ অবলম্বনে রচিত এই কাব্যটি বাংলা সাহিত্যে ধর্মীয় ভাবধারা ও কাব্যিক নান্দনিকতার এক ঐতিহাসিক সংমিশ্রণ।

১. রচনার নেপথ্য, কালপঞ্জি ও প্রকাশনা ইতিহাস

‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বই আকারে আত্মপ্রকাশ করলেও এটি নজরুলের সুস্থ থাকাকালীন সৃষ্টি। ১৯৪২ সালে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারানোর পূর্বেই তিনি এই কাব্যগ্রন্থের সিংহভাগ কবিতা রচনা শেষ করেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন পান্ডুলিপি ও সাময়িকীতে ছড়িয়ে থাকা কবিতাগুলোকে সংকলিত করে গ্রন্থাকারে আলোয় আনা হয়।

কাব্যের নামকরণ ‘মরু-ভাস্কর’ রূপকটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর মূল দর্শন। ‘মরু’ অর্থাৎ আরবের শুষ্ক, তপ্ত প্রান্তর; আর ‘ভাস্কর’ শব্দের অর্থ সূর্য। অনাচার, অজ্ঞতা ও অমানবিকতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব মরুপ্রান্তরে আলোর বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন যে মহামানব—নজরুল তাঁকেই চিত্রিত করেছেন মরুভূমির অবিনাশী প্রখর সূর্য হিসেবে।

২. মূল ভাবাদর্শ: অলৌকিকত্ব অতিক্রম করে ‘মানব মুহাম্মদ (সঃ)’

‘মরু-ভাস্কর’ কেবল কোনো প্রথাগত ধর্মীয় প্রশংসাগীতি নয়। নজরুল এখানে মহানবী (সঃ)-কে অতিপ্রাকৃতিক অলৌকিকত্বের আবরণে ঢেকে না রেখে, তাঁর পরম মানবিক রূপটিকে উন্মোচিত করেছেন। কাব্যগ্রন্থটিতে নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন:
  • মহাসাম্যের ঘোষণা: জাতপাত, বর্ণ ও গোত্রীয় অহংকার চূর্ণ করে কীভাবে একজন মানুষ দাস প্রথার অবসান ঘটান এবং মানবজাতিকে এক সমতাভিত্তিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন।
  • উৎপীড়িতের আশ্রয় ও ক্ষমা: শত্রুর প্রতি অসীম ক্ষমা, অনাথ-দরিদ্রের প্রতি অপরিসীম মমতা এবং পার্থিব ঐশ্বর্য ত্যাগ করে অতি সাধারণ জীবনযাপনের মহতী রূপায়ণ।
  • নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা: আরব সমাজের অন্ধকার যুগে কন্যাসন্তান হত্যা ও নারীকে পণ্যের মতো দেখার গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নারীর সামাজিক ও আত্মিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জয়গান।
নজরুলের কলমে মহানবী (সঃ) আবির্ভূত হয়েছেন একাধারে সত্যাগ্রহী, সাম্যবাদী, মানবদরদী সংস্কারক এবং স্রষ্টার পরম প্রেরিত আলোকবর্তিকা হিসেবে।

৩. কাব্যিক গঠন রূপরেখা: চার সর্গের মহাসঙ্গীত

‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথাগত গীতিকবিতার সীমানা ছাড়িয়ে এক ধরণের আখ্যানকাব্য বা ক্ষুদ্র মহাকাব্যের অবয়ব ধারণ করেছে। পুরো কাব্যগ্রন্থটি চারটি সর্গ (Canto)-এ বিভক্ত এবং এতে মোট ১৮টি খণ্ড-কবিতা সংকলিত রয়েছে:
  • প্রথম সর্গ (আবির্ভাব ও প্রাক-জীবন): হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শুভ আবির্ভাবের পূর্ব মুহূর্তের জরাগ্রস্ত আরব সমাজ, অনাগত আলোর অপেক্ষা, তাঁর প্রসূতি আমিনার স্বপ্ন এবং দাদা আবদুল মুত্তালিবের সান্নিধ্যে শৈশবের দিনগুলোর কাব্যিক সুর।
  • দ্বিতীয় সর্গ (শৈশব ও বাল্যলীলা): দাই-মা হালিমার কোলে কাটানো সময়, মায়ের প্রয়াণ, ‘সাক্কুস সাদর’ বা হৃদয় উন্মোচনের আধ্যাত্মিক ঘটনা এবং ইয়াতিম মোহাম্মদের ‘সর্বহারা’ রূপ—যা তাঁকে বিশ্ব সর্বহারার পরম বন্ধুই হিসেবে গড়ে তোলে।
  • তৃতীয় সর্গ (কৈশোর ও সত্যাগ্রহ): কৈশোরের দিনগুলো, সত্য ও ন্যায়ের পথে তাঁর অবিচল অবস্থান এবং সমাজের অনাচারের বিরুদ্ধে শান্তিকামী ‘হিলফুল ফুজুল’ গঠনের মতো ঘটনাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত।
  • চতুর্থ সর্গ (যৌবন, বিবাহ ও কাবা পুনর্নির্মাণ): বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, ‘নও কাবা’ কবিতায় হাজরে আসওয়াদ বসানো নিয়ে কুরাইশদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে তাঁর প্রজ্ঞা এবং কাব্যের শেষে পরম ‘সাম্যবাদী’ চেতনার বিজয় ঘোষণা।

৪. ভাষাশৈলী ও শব্দ অলংকার

‘মরু-ভাস্কর’-এ নজরুলের শব্দচয়ন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের সাবলীল সংমিশ্রণের সাথে সংস্কৃত ও দেশি শব্দবন্ধকে তিনি এমন এক রসায়নে যুক্ত করেছেন, যা পাঠকমনে মুহূর্তেই এক মরুময় গাম্ভীর্য ও আরব্য আবহ তৈরি করে।

ওজস্বী ছন্দের প্রবাহ, ভাবগম্ভীর সুর এবং আখ্যান রচনার চাতুর্য কবিতাগুলোকে একাধারে শ্রুতিমধুর ও হৃদগ্রাহী করে তুলেছে। নজরুল এখানে কোনো অন্ধ গোঁড়ামির আশ্রয় নেননি, বরং সত্যের প্রতি এক অকুন্ঠ অনুরাগে কবিতার ছন্দ বুনেছেন।

৫. সাহিত্যিক ও কালজয়ী গুরুত্ব

নজরুল যখন ‘মরু-ভাস্কর’ রচনা করেন, তখন বাংলা সাহিত্যের এক অংশে ইসলামি ঐতিহ্যকে কেবল সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার মানসিকতা ছিল। নজরুল সেই প্রাচীর ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, মহানবী (সঃ)-এর জীবন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মের ফ্রেমে বন্দী নয়; তিনি সমগ্র বিশ্বমানবের।

বিদ্রোহের অগ্নিবীণা যিনি বাজিয়েছেন, তিনিই আবার পরম ভক্তিতে ‘মরু-ভাস্কর’-এর স্তোত্র রচনা করেছেন—এই বৈচিত্র্যই নজরুলের অবিনাশী কবিসত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলা ভক্তিমূলক ও ইসলামি কাব্যধারায় ‘মরু-ভাস্কর’ আজও সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে।

মরু-ভাস্কর কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র

কাজী নজরুল ইসলামের ‘মরু-ভাস্কর’ (১৯৫১) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত চারটি সর্গের ১৮টি কবিতার তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:

প্রথম সর্গ

  1. অবতরণিকা
  2. অনাগত
  3. স্বপ্ন
  4. আলো-আঁধারি
  5. দাদা
  6. পরভৃত

দ্বিতীয় সর্গ

  1. শৈশব-লীলা
  2. প্রত্যাবর্তন
  3. “সাক্কুস সাদ্‌র” (হৃদয় উন্মোচন)
  4. সর্বহারা

তৃতীয় সর্গ

  1. কৈশোর
  2. সত্যাগ্রহী মোহাম্মদ

চতুর্থ সর্গ

  1. শাদী মোবারক
  2. খদিজা
  3. সম্প্রদান
  4. নও কাবা
  5. সাম্যবাদী
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.