Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ (১৯২৪) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করার এক অবিনাশী ও অগ্নিগর্ভ সংগীত-সংগ্রহ। ১৯২০-এর দশকের উত্তাল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবীদের বন্দিদশা এবং কারারুদ্ধ রাজবন্দীদের প্রতি ঔপনিবেশিক রাজতন্ত্রের চরম নিপীড়নের পটভূমিতে রচিত এই কাব্যগ্রন্থটি ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসকে এক সাঙ্গীতিক ও বৈপ্লবিক মাত্রা প্রদান করেছিল। ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশি’র ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত এই গ্রন্থটি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এর বজ্রনির্ঘোষ সুর শত কোটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার দাবানল জেলে দিয়েছিল।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও রাজকীয় নিষেধাজ্ঞা

‘ভাঙার গান’ গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে (শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ)। বইটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই সমগ্র বাংলায় এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তরুণ সমাজ ও মুক্তিসেনাদের কাছে এটি হয়ে ওঠে আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার।

গ্রন্থের ভেতরের গান ও কবিতাগুলোতে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য ও স্পর্ধিত বিদ্রোহের সুর ছিল, তা ঔপনিবেশিক সরকারকে চরম আতঙ্কিত করে তোলে। ফলে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের মাত্র তিন মাসের মাথায়—১৯২৪ সালের ১১ নভেম্বর—তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯-এ ধারা অনুযায়ী ‘ভাঙার গান’-কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিপ্লবীদের গোপন পাঠচক্রে এবং জাতীয়তাবাদী মিছিলে মিছিলে ‘ভাঙার গান’-এর সুর ছড়িয়ে পড়েছিল দাবানলের মতো।

২. ঐতিহাসিক পটভূমি ও সৃষ্টির আলেখ্য

‘ভাঙার গান’ রচনার সময়কালটি ছিল ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক সংসংক্ষুব্ধ অধ্যায়।

  • ১৯২১-২২ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের রাজবন্দীদের গ্রেফতার,
  • ১৯২৩ সালে স্বয়ং নজরুল ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সহ প্রখ্যাত নেতাদের কারাবাস,
  • হুগলি জেলে রাজবন্দীদের ওপর ব্রিটিশ পুলিশ ও জেল সুপার আর্বাথনটের অমানবিক অত্যাচার, এবং
  • বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি ও সাম্যবাদী আন্দোলনের উত্থান।

নজরুল নিজেও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করে জেলের ভিতরের নিপীড়ন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দাঁড়িয়ে লোহার শিকলকে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে নজরুল যে সুর সৃষ্টি করেছিলেন, তারই সুবিন্যস্ত রূপায়ন ঘটেছে এই গ্রন্থে।

৩. কালজয়ী শীর্ষ গান: “কারার ঐ লৌহ-কপাট”

‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থটির নাম উচ্চারণের সাথে সাথেই যে ঐতিহাসিক সংগীতটি বাংলাভাষীর মনে দোলা দেয়, তা হলো এর নাম-সংগীত “কারার ঐ লৌহ-কপাট”।

গানটির রচনার পেছনে রয়েছে এক অনন্য ইতিহাস:

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গ্রেফতার হলে তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী তরুণ নজরুলকে অনুরোধ করেছিলেন জাতীয় আন্দোলনের জন্য একটি উদ্দীপনামূলক গান রচনা করতে। নজরুল এক রাতের মধ্যে সৃষ্টি করেন এই অমর গীত। ১৯২১ সালের শেষভাগে দেশবন্ধুর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বাংলার কথা’ পত্রিকায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে ‘উপাসনা’ পত্রিকায় সংকলিত হয়। ১৯২৪ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় কবি এটিকে কাব্যের শীর্ষ সংগীত হিসেবে নির্বাচন করেন।

“কারার ঐ লৌহ-কপাট,

ভেঙে ফেল কর রে লোপাট,

রক্ত-জমাট

শিকল-ভাঙার পাষাণ-বেদী!”

এই একটিমাত্র গান জেলের অন্ধকূপকে মুক্তিসংগ্রামের তীর্থক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছিল। এটি কেবল বাংলা সাহিত্যের নয়, বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা বীররসাত্মক জাতীয় গান।

৪. মূল ভাবাদর্শ ও বৈপ্লবিক বিষয়বস্তু

‘ভাঙার গান’ মূলত গান ও কবিতার সমন্বয়ে তৈরি এক রণসঙ্গীতের আলেখ্য, যার মূল ভাবাদর্শকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যায়:

ক) জেলখানা ও রাজবন্দীদের শৃঙ্খলমোচন

কাব্যগ্রন্থের অন্যতম প্রধান সুর হলো জেলের লোহার শিকল ও কারাপ্রাচীর ভেঙে মুক্ত হওয়ার সংকল্প। ‘রাজবন্দীর গান’, ‘বন্দীর বন্দনা’ এবং ‘সুপার-আর্বাথনটকে’ রচনাগুলোতে কবি অত্যন্ত ধারালো ভাষায় কারাধ্যক্ষদের বর্ণবাদী আচরণ ও ইংরেজদের স্বৈরাচারকে আক্রমণ করেছেন।

খ) আন্তর্জাতিক সাম্যবাদ ও শ্রমিক জাগরণ

নজরুল ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী বিশ্ব নাগরিক। ‘ভাঙার গান’-এ তিনি বাংলা কবিতায় আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটান।
  • Eugene Pottier রচিত বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মূল সংগীত ‘L’Internationale’—এর ঐতিহাসিক বাংলা রূপান্তর করেন তিনি “জাগো অনশন বন্দী” শিরোনামে।
  • একইভাবে বিখ্যাত শ্রমিক গান ‘The Red Flag’—এর অনুসরণে রচনা করেন “লাল পতাকার গান”।

গ) স্বরাজ আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও স্বদেশী আন্দোলনকারীদের অদম্য ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি রচনা করেন ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’। রাজনৈতিক নেতাদের আপসহীন সংগ্রামকে কবি কাব্যের মাধ্যমে বন্দনা করেছেন।

৫. সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষা

‘ভাঙার গান’-এর ভাষা অত্যন্ত গতিশীল, ওজোগুণসম্পন্ন এবং মার্চের তালে গীত হওয়ার মতো স্বকীয় লয়ে রচিত। কবি এখানে কোমল পদের পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন প্রলয়ঙ্করী শব্দাবলী। দামামা, তূর্য, শিকলের ঝংকার এবং হুঙ্কারের অনুকরণে ছন্দের যে দ্রুত লয় কবি তৈরি করেছেন, তা পাঠক ও শ্রোতার মনে তাৎক্ষণিক উদ্দীপনা জাগায়।

৬. সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

বাংলা গীতিসাহিত্যে ‘ভাঙার গান’ এক যুগান্তকারী সংযোজন। এটি প্রমাণ করে যে গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, তা রাষ্ট্রীয় শক্তিকে কাঁপিয়ে দেওয়ার অমোঘ অস্ত্র হতে পারে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে “কারার ঐ লৌহ-কপাট” সম্প্রচারিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। শোষণ, অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে চিরকালের এক প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ‘ভাঙার গান’ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

ভাঙার গান কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র

কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ (১৯২৪) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত কালজয়ী ১১টি কবিতা ও সংগীতের ধারাবাহিক তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:
  1. ভাঙার গান (কারার ঐ লৌহ-কপাট)
  2. ঘূর্ণী-হাওয়া
  3. পূর্ণ-অভিনন্দন
  4. সুপার-আর্বাথনটকে
  5. বন্দীর বন্দনা
  6. জাগো অনশন বন্দী (অন্তর-ন্যাশনাল / L’Internationale)
  7. লাল পতাকার গান (The Red Flag)
  8. ওকালতি-আবেদন
  9. রাজনৈতিক সংগী
  10. রাজবন্দীর গান
  11. সাবধান
Tags :

সাহিত্য ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.