বাংলা সাহিত্য ও নজরুল-চর্চার ইতিহাসে ‘ঝড়’ (১৯৬০) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত কাব্যসংগ্রহ। ১৯৪২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম আকস্মিক জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি ও সৃজনশীলতা হারিয়ে নিঃশব্দ আঁধারে তলিয়ে যান। কবির নিভৃত নীরবতার দীর্ঘ দেড় দশক পর, ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় এই গ্রন্থটি। এটি মূলত কবির অসুস্থতার পূর্বে লিখিত, বিভিন্ন সাময়িকপত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এবং কিছু পূর্বপ্রকাশিত দুর্লভ কবিতার একটি বিশেষ সংকলন। নজরুল-অনুরাগী ও সংগ্রাহকদের উদ্যোগে গ্রন্থিত এই কাব্যটি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার হুঙ্কার, আন্তর্জাতিক মুক্তিসংগ্রাম, শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং শিশুতোষ রম্যরসের এক অভূতপূর্ব মিলনক্ষেত্র।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস ও গ্রন্থায়নের পটভূমি
নজরুলের কর্মমুখর জীবনে অসংখ্য কবিতা ও গান তৎকালীন জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোতে (যেমন—ধূমকেতু, লাঙল, সাওগাত, কল্লোল, মৌচাক) আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু তাঁর আকস্মিক অসুস্থতার কারণে অনেক রচনাই মূলধারার কাব্যগ্রন্থগুলোতে স্থান পাওয়ার আগেই হারিয়ে যেতে বসেছিল।
১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘ঝড়’ কাব্যগ্রন্থটি সেই ঐতিহাসিক শূন্যতা পূরণের এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রকাশক ও নজরুল-চর্চাকারীরা কবির গ্রন্থবহির্ভূত কবিতাগুলোর পাশাপাশি এমন কিছু কালজয়ী রচনাকে এই সংকলনে পুনর্মুদ্রিত করেন, যা কবির বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সামনে পুনরায় উপস্থাপন করে।
২. নামকরণের তাৎপর্য ও মূল ভাবাদর্শ
কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম ‘ঝড়’ কবির চিরন্তন প্রলয়ঙ্করী ও দ্রোহী চেতনারই এক মূর্ত প্রতীক। নজরুলের কাব্যদর্শনের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল স্থবিরতা, কুসংস্কার, সামন্তবাদী অন্যায় এবং ঔপনিবেশিক শাসনকে প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের বেগে উপড়ে ফেলা।
কাব্যগ্রন্থের সূচনা কবিতা ‘উঠিয়াছে ঝড়’-এ কবি সমাজদেহে জমতে থাকা ক্ষয় ও জড়তার বিরুদ্ধে এক অবিনাশী সংহারী হাওয়ার আবাহন জানিয়েছেন। এই ‘ঝড়’ কেবল ধ্বংসের নয়; এটি প্রাচীনকে বিনাশ করে নতুন প্রভাত এবং জাতীয় মুক্তির পথ উন্মোচনের এক নবজাগরণী বার্তা।
৩. বিষয়বস্তুর বহুমাত্রিকতা ও ক্যানভাস
ক) বৈশ্বিক মুক্তি সংগ্রাম ও বিপ্লবীদের বন্দনা
খ) স্মৃতিতর্পণ ও বরেণ্যদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
গ) আধ্যাত্মিকতা ও ক্ষমার বার্তা
ঘ) শিশু-কিশোর তোষ ও কৌতুক রসাত্মক কবিতা
ঙ) প্রেম, প্রকৃতি ও ছন্দের পরীক্ষা-নিরীক্ষা
৪. অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের সাথে সংযোগ ও বৈশিষ্ট্য
‘ঝড়’ কাব্যগ্রন্থে মোট ২৪টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। এই সংকলনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর মধ্যে প্রায় ১১টি কবিতা নজরুলের পূর্ব প্রকাশিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ—বিশেষ করে ‘সন্ধ্যা’ (১৯২৯) এবং ‘জিঞ্জীর’ (১৯২৮)-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তৎকালীন সম্পাদনা পর্ষদ নজরুলের রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক কাব্যধারাকে একটি ভিন্ন বিন্যাসে উপস্থাপনের লক্ষ্যেই এই যৌথ সংকলন রূপায়ন করেছিলেন, যা সং সং সংগৃহীত রচনাগুলোর কালানুক্রমিক ও শৈল্পিক গুরুত্বকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দেয়।
৫. সাহিত্যিক গুরুত্ব ও ‘আমার নজরুল’ সংগ্রহশালায় অবস্থান
সংগ্রহশালার বিচারে ‘ঝড় (১৯৬০)’ কাব্যগ্রন্থটি নজরুল গবেষণায় এক অনন্য উপাদান। এটি দেখায় কীভাবে একজন কবি নীরব হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর সৃষ্টি সমাজ ও সাহিত্যের পটভূমিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংহারী হুঙ্কার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইতিহাস সচেতনতা এবং শিশুমনস্কতার এই অপূর্ব সংমিশ্রণ নজরুলকে কেবল একজন কবি হিসেবে নয়, বরং সার্বজনীন মানবমুক্তির রূপকার হিসেবে অমর করে রেখেছে।
‘ঝড়’ (১৯৬০) কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র
- উঠিয়াছে ঝড়
- জীবনে যাহারা বাঁচিল না
- আমানুল্লাহ (জিঞ্জীর কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- ভোরের পাখি (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- বাংলার “আজিজ” (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- শাখ্-ই-নবাত্
- খোকার গপ্প বলা
- গদাই-এর পদবৃদ্ধি
- ক্ষমা করো হজরত
- সাম্পানের গান
- চিঠি
- রীফ-সর্দার (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- খালেদ (জিঞ্জীর কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- শরৎচন্দ্র (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- তরুণের গান
- অনামিকা
- জীবন (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- যৌবন (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- তর্পণ (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- নগদ কথা (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- জাগরণ (সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থেও সংকলিত)
- আরবী ছন্দের কবিতা
- প্রলয়-আবাহন
- মুক্তিসেনানী







![ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম 2 ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/ডায়ারের-স্মৃতিস্তম্ভ-150x150.jpg)













