বাংলা সাহিত্যের অগ্নিপুরুষ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩)। প্রলয়ঙ্করী ও দ্রোহদীপ্ত প্রথম কাব্য ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২)-এর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সুরের পর ‘দোলনচাঁপা’য় কবি নজরুল উন্মোচিত করেন তাঁর সম্পূর্ণ ভিন্ন—কোমল, সংবেদনশীল, অনুরাগী ও অনন্য গীতিময় রূপকে। কারারুদ্ধ রাজবন্দী হিসেবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর পাষাণ প্রাচীরের পেছনে বসে রচিত এই কাব্যগ্রন্থটি প্রমাণ করে যে, কোনো শৃঙ্খল বা শাসকের চাবুক কবির স্বাধীন সৃজনশীলতা ও হৃদয়ের সুকোমল সুরকে স্তব্ধ করতে পারে না।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস ও কারাজীবনের পটভূমি
‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (আশ্বিন, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) কলকাতার ‘আর্য পাবলিশিং হাউস’ থেকে প্রকাশিত হয়।
কাব্যগ্রন্থটির জন্মের পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ ও রোমাঞ্চকর। ১৯২২ সালের দুর্গাপূজার প্রাক্কালে নজরুল তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী কালজয়ী কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশ করেন। এর জের ধরে রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ইংরেজ সরকার কবিকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে প্রেসিডেন্সি জেলে এবং পরবর্তীতে হুগলি জেলে বন্দী করে।
কারাবাসের চরম প্রতিকূল পরিবেশ ও নির্জন প্রকোষ্ঠেও নজরুল সাহিত্যসাধনায় অটল থাকেন। জেলের ভেতর রচিত এই কোমল প্রেমের কবিতাগুলো বাহিরের জগতের কাছে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে কবিবন্ধুদের পরিকল্পনায় এবং কয়েকজন দরদী কারারক্ষী (ওয়ার্ডার)-র সাহায্যে রাজবন্দী নজরুলের এই পাণ্ডুলিপিগুলো গোপনে জেলখানার বাইরে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে কবিবন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের তদারকিতে আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে বই আকারে ‘দোলনচাঁপা’ আলোর মুখ দেখে। গ্রন্থটির ভূমিকারূপে “দুটি কথা” শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকা লিখেছিলেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়।
২. মূল ভাবাদর্শ ও বিষয়বস্তু
‘অগ্নিবীণা’র বজ্রনির্ঘোষ বিপ্লবের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘দোলনচাঁপা’ হলো বিরহ, প্রেম, আত্মনিবেদন এবং সৃষ্টির উল্লাসে উচ্ছ্বল এক সাঙ্গীতিক আলেখ্য:
- সৃষ্টি-সুখের আনন্দময় উল্লাস: কাব্যগ্রন্থের সর্বাগ্রে মুখবন্ধরূপে যুক্ত হওয়া কালজয়ী কবিতা “আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে” কাব্যের মূল সুর বেঁধে দেয়। কারারুদ্ধ বন্দী অবস্থায় রচিত হলেও এতে ধরা পড়েছে জরা ও বন্দিত্বকে জয় করে নতুন কিছু সৃষ্টি করার এক প্রলয়ঙ্করী আনন্দ।
- প্রেম ও বিরহের তীব্রতা: কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি পংক্তিতে দোলনচাঁপা ফুলের মতো সুবাসিত ও সুকোমল ভালোবাসার স্পর্শ রয়েছে। বিরহী আত্মার আকুলতা, প্রিয়জনের অভাবের বেদনা, গোপন প্রীতি এবং আত্মোৎসর্গের সুর কবিতাগুলোকে এক অনন্য নান্দনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
- প্রকৃতি ও রূপক কাব্যাবেশ: বর্ষা, পৌষ, চাতক, ফুল ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির উপাদানে কবি নিজের মনের গোপন অনুভূতি ও ব্যাকুলতাকে প্রকাশ করেছেন।
- শৃঙ্খলমুক্ত আত্মার ঘোষণা: কায়িক বিচারে কবি কারাগারে বন্দী হলেও তাঁর আত্মা যে সম্পূর্ণ মুক্ত, সার্বভৌম ও স্বাধীন—সেই আত্মিক স্বাধীনতার অদম্য বাণীই ফুটে উঠেছে এই কাব্যে।
৩. সাহিত্যিক গুরুত্ব ও ‘রোমান্টিক নজরুল’
বাংলা সাহিত্যে নজরুলকে প্রায়শই কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, ‘দোলনচাঁপা’ প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন একাধারে বিদ্রোহী এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেম ও গীতিকবি। বিদ্রোহ ও ভালোবাসা নজরুলের ব্যক্তিত্বের দুটি বিপরীতমুখী কিন্তু পরিপূরক দিক ছিল।
যে হাতে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘অগ্নিবীণা’ বাজিয়েছিলেন, সেই হাতেই তিনি ‘দোলনচাঁপা’র স্নিগ্ধ মাল্য গাঁথতে পেরেছিলেন। কারাবাসের মতো যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন চিরন্তন সৌন্দর্য ও গীতিময় রস সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত।
৪. গঠন ও সংকলন রূপরেখা
‘দোলনচাঁপা’র প্রথম সংস্করণে মোট ১৯টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কবিতাগুলোর বিন্যাসে সাঙ্গীতিক ঝংকার, লয় এবং ছন্দের বৈচিত্র্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সূচিপত্রের ঠিক পূর্বে মুখবন্ধরূপে সংযোজিত বিখ্যাত কবিতা “আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে” প্রথম কল্লোল পত্রিকায় (জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্করণে কিছু কবিতা সংযোজন ও অদলবদল করা হলেও, প্রথম সংস্করণের মূল রূপটিই এর ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।
দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র
- দুটি কথা
- আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে (সূচিপত্রের পূর্বে মুখবন্ধরূপে সংযোজিত)
- দোদুল্ দুল্
- বেলাশেষে
- পউষ






















