বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আবেগময় প্রেমের কবিতা বা গান হলো ‘চপল সাথি’। এই কবিতায় প্রিয়জনের চপল বা অস্থির পদচারণা এবং তার ফলে প্রেমিকের হৃদয়ে যে গভীর আলোড়ন ও ব্যথার সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
প্রিয়তমের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন প্রেমিকের বুকে এসে বাজে। প্রিয়জনের এই অসতর্ক ও চপল চলার মাঝেই প্রেমিকের আনন্দ, অভিমান এবং জীবন-মরণ জড়িয়ে আছে। ভালোবাসার মানুষটি যখন ভুল পথে পা বাড়ায় বা ব্যথার বুকে পা ফেলে, তখন সেই আঘাত প্রেমিকের কাছে মৃত্যুসম মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত সেই চপল চরণই তার একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রেমের এই তীব্র, একনিষ্ঠ ও সমর্পণমূলক অনুভূতিই এই সৃষ্টির মূল প্রাণ।
চপল সাথি (পুরো কবিতা):
প্রিয়!
সামলে ফেলে চলো এবার চপল তোমার চরণ!
তোমার
ওই চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন-মরণ।
কোথায় দূরে নূপুর বাজে তোমার পায়ে,
হেথায় রোদন আমার ওঠে উথলায়ে,
তোমার উদাসীন ওই বিষম চলার ঘায়ে
আজ কাঁপে আমার সকল শরম-ভরম।
এখন
ওই দ্বিধাহীন চরণ করো মোর বুকে সম্বরণ।
তোমার
ওই চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন-মরণ।
তুমি
চলার ঝোঁকে দেখছ না হায় পড়ছে চরণ কোথায়,
ওগো চপল পরান-প্রিয়!
হেরো
এবার তোমার পা পড়েছে আমার বুকের ব্যথায়
এখন ধীরে চরণ নিয়ো।
তোমার ওই যে দোলন দোদুল-দোলা-চলায়,
আজ পথ-পাগলের পথের নেশা ভোলায়,
এবার থামাও সে দোল আমার বুকের তলায়,
আর সরিয়ো না মোর ব্যথায়-বাজা চরণ।
আমার ব্যথায় রেঙে হোক ও-চরণ নিখিল-মনোহরণ।
ওই
অধীর চরণ চলার নেশায় হলে বিপথগামী
আমি বাঁচব কি আর প্রিয়?
তোমার
বিপথ সে যে আমার তরে মৃত্যু-আঘাত, স্বামী!
এখন ধীরে চরণ নিয়ো!
ওগো জানি শুধু চলার সুখে
তুমি পা ফেলেছ আমার ব্যথার বুকে,
ওই চলাই তোমার আমার গভীর দুখে,
শেষে প্রেম হয়ে সে করল অবতরণ।
আজ
একা তোমার নয় ও-চরণ আমার নিখিল শরণ!
তোমার
ওই চলাতে জড়িয়ে গেছে আমার জীবন মরণ!
প্রিয়
সামলে ফেলে চলো এবার চপল তোমার চরণ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।


















