Editor's Choice

দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থের ‘অভিশাপ’ কবিতা — কাজী নজরুল ইসলাম

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅভিশাপ
কবির নামকাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থদোলনচাঁপা
প্রকাশের বছর১৯২৩ (আশ্বিন ১৩৩০ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক, বিরহ ও অভিমানী প্রেমের কবিতা (Romantic / Melancholic Love Poem)

কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:

১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (আশ্বিন ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত ‘দোলনচাঁপা’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত প্রথম প্রেমের কাব্যগ্রন্থ। ‘অভিশাপ’ এই গ্রন্থের সবচেয়ে পঠিত ও আবৃত্ত কবিতাগুলোর একটি। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত বা অবহেলিত প্রেমিকের এক বুক অভিমান নিয়ে লেখা এই কবিতায় প্রেমিক বলছেন, আজ সে অবহেলিত হলেও একদিন যখন সে চিরতরে হারিয়ে যাবে, তখন প্রেমিকা তার শূন্যতা তীব্রভাবে অনুভব করবে এবং প্রতিটি স্মৃতি তাকে দগ্ধ করবে। নজরুলের প্রেমের কবিতায় বিরহ ও অভিমানের যে তীব্র দহন দেখা যায়, তার চূড়ান্ত নিদর্শন এই ‘অভিশাপ’।

অভিশাপ কবিতা (সম্পূর্ণ)

যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,

অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মর” কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

স্বপন ভেঙে নিশুত্‌ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,-
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদ্‌নাতে চোখ বুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুজবে।

গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্‌বে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?’’
আস্‌বে ভেঙে কান্না!
প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি
ঘন ঘন মুছবে-
বুঝ্‌বে সেদিন বুঝবে!

আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ-
কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
চোখের জলে সেদিন বালা
মুখের হাসি ঘুচবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি,
থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী!
আসবে শিশির-রাত্রি!
থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন,
থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন,
বঁধুর বুকের পরশনে
আমার পরশ আনবে মনে-
বিষিয়ে ও-বুক উঠবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে-
তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে,
আসবে না ক’ আর সে!
প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে
মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে,
মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!
সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায়
কাঁটা হ’য়ে ফুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে,
সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে-
দুলবে তরী রঙ্গে,
প’ড়বে মনে সে কোন্‌ রাতে
এক তরীতে ছিলেম সাথে,
এমনি গাঙ ছিল জোয়ার,
নদীর দু’ধার এমনি আঁধার
তেম্‌নি তরী ছুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ-
সখার কারা-বন্ধ!
বন্ধু তোমার হান্‌বে হেলা
ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;
দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,
বইতে প্রাণের শান- এ ভার
মরণ-সনে বুঝ্‌বে-
বুঝবে সেদিন বুঝ্‌বে!

ফুট্‌বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী,
আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্‌নী-
চৈতী-রাতের চাঁদ্‌নী।
ঋতুর পরে ফির্‌বে ঋতু,
সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু!
চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়,
আমার মতন চোখ ভ’রে চায়
যে-তারা তা’য় খুঁজবে-
বুঝ্‌বে সেদিন বুঝ্‌বে!

আস্‌বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন,
কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন-
টুটবে যবে বন্ধন!
পড়বে মনে, নেই সে সাথে
বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে-
আপনি গালে যাচবে চুমা,
চাইবে আদর, মাগ্‌বে ছোঁওয়া,
আপনি যেচে চুমবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে।

আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্‌ত,
সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান–
আসবে তখন পান’।
হয়ত তখন আমার কোলে
সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে,
আপনি সেদিন সেধে কেঁদে
চাপ্‌বে বুকে বাহু বেঁধে,
চরণ চুমে পূজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

Obhishap Kobita romanized version:

Jedin ami hariye jabo, bujhbe shedin bujhbe,
Ostoparer shondhyataray amar khobor puchhbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Chhobi amar buke bẽdhe
Pagol ho’le kẽde kẽde
Phirbe moru kanon giri,
Shagor akash batash chiri’
Jedin amay khujbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Swopon bhenge nishut rate jagbe hotat chomke,
Kahar jeno chena-chhoway uthbe o-buke chhomke,-
Jagbe hotat chomke!
Bhabbe bujhi amii eshe
Bo’shnu buker kolti gheshe,
Dhorte giye dekhbe jokhon
Shunnyo shojja! Mitthya swopon!
Bedonate chokh bujbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Gaite bo’she kontho chhire ashbe jokhon kanna,
Bo’lbe shobai-” shei je pothik tar shekhano gan na?”
Ashbe bhenge kanna!
Po’rbe mone amar shohag,
Konthe tomar kãdbe behag!
Po’rbe mone onek phãki
Oshru-hara kothin ãkhi
Ghono ghono muchhbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Abar jedin shiuli phute bho’rbe tomar ongon,
Tulte she phul gãthte mala kãpbe tomar konkon-
Kãdbe kutir-ongon!
Shiuli dhaka mor shomadhi
Po’rbe mone, uthbe kãdi’!
Buker mala ko’rbe jwala
Chokher jole shedin bala
Mukher hashi ghuchbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Ashbe abar ashin-hawa, shishir-chhẽcha ratri,
Thakbe shobai – thakbe na ei moron-pother jatri!
Ashbe shishir-ratri!
Thakbe pashe bondhu shwojon,
Thakbe rate bahur bãdhon,
Bõdhur buker poroshone
Amar porosh anbe mone-
Bishiye o-buk uthbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Ashbe abar shiter rati, ashbe na ko ar she-
Tomar shukhe po’rto badha thakle je-jon parshe,
Ashbe na ko’ ar she!
Po’rbe mone, mor bahute
Matha thuye je-din shute,
Mukh phiriye thakte ghrinay!
Shei smriti to oi bichhanay
Kãta ho’ye phutbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Abar gange ashbe jowar, dulbe tori ronge,
Shei torite hoyto keho thakbe tomar shonge-
Dulbe tori ronge,
Po’rbe mone she kon rate
Ek torite chhilem shathe,
Emni gang chhilo jowar,
Nodir du’dhar emni ãdhar
Temni tori chhutbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Tomar shokhar ashbe jedin emni kara-bondho,
Amar moton kẽde kẽde hoyto hobe ondho-
Shokhar kara-bondho!
Bondhu tomar hanbe hela
Bhangbe tomar shukher mela;
Dirgho bela katbe na ar,
Boite praner shan- e bhar
Moron-shone jujhbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Phutbe abar dolon chãpa choiti-rater chãdni,
Akash-chhawa taray taray bajbe amar kãdni-
Choiti-rater chãdni.
Ritur pore phirbe ritu,
Shedin-he mor shohag-bhitu!
Chaibe kẽde nil nobho ga’y,
Amar moton chokh bho’re chay
Je-tara ta’y khujbe-
Bujhbe shedin bujhbe!
Ashbe jhor, nachbe tufan, tutbe shokol bondhon,
Kãpbe kutir shedin trashe, jagbe buke krondon-
Tutbe jobe bondhon!
Porbe mone, nei she shathe
Bãdhbe buke dukkho-rate-
Apni gale jachbe chuma,
Chaibe ador, magbe chhowa,
Apni jeche chumbe-
Bujhbe shedin bujhbe.
Amar buker je kãta-gha tomay byatha hanto,
Shei aghati jachbe abar hoyto ho’ye shranto-
Ashbe tokhon pantho.
Hoyto tokhon amar kole
Shohag-lobhe po’rbe dho’le,
Apni shedin shedhe kẽde
Chapbe buke bahu bẽdhe,
Choron chume pujbe-
Bujhbe shedin bujhbe!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • তীব্র অভিমান ও শূন্যতা: অবহেলিত ও প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের চিরতরে দূরে চলে যাওয়ার পর প্রেমিকার জীবনে যে নিদারুণ শূন্যতা, অনুশোচনা ও হাহাকার নেমে আসবে, তারই এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক পূর্বাভাস।
  • স্মৃতি ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: শিউলি ফুল, আশিন হাওয়া, শীতের রাত বা নদীর জোয়ার—প্রকৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গের সাথে কীভাবে পুরনো স্মৃতি জড়িয়ে থাকবে এবং তা প্রেমিকাকে দংশন করবে, তারই এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর রূপায়ণ এই কবিতার মূল প্রাণ।

উৎস:

কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ, বানানরীতি (আপনার প্রদত্ত টেক্সট থেকে মুদ্রণপ্রমাদগুলো আংশিক সংশোধন করে) এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৩) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.