বাংলা গীতিসাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘চন্দ্রবিন্দু’ (১৯৩১) কেবল একটি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত হাস্যরসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক গানের সংকলন নয়; এটি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন, মেকি রাজনীতি এবং তৎকালীন রূপসর্বস্ব সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক ক্ষুরধার সাঙ্গীতিক প্রতিরোধ। নজরুলের বিদ্রোহী কবিসত্তা কেবল সংহারী কবিতার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়নি; চাবুকের মতো ধারালো ব্যঙ্গপ্রবণ গানের মাধ্যমে কীভাবে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া যায়, ‘চন্দ্রবিন্দু’ তারই এক ঐতিহাসিক পরাকাষ্ঠা।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস, বাজেয়াপ্তকরণ ও ব্যক্তিগত শোক
‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থটি ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (১৩৩৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন) কলকাতার বিখ্যাত ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে প্রথম সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
- প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
- মূল্য: প্রথম সংস্করণের মূল্য ছিল দুই টাকা।
- উৎসর্গ: কবি এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন বাংলার প্রখ্যাত চাটুকারিতা-বিরোধী ও চটুল হাস্যরসের সাধক, ‘দ দাদাঠাকুর’ নামে পরিচিত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত-কে। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল:“পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমদ্দাঠাকুর শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত মহাশয়ের শ্রীচরণকমলে…”
সৃষ্টির আড়ালে করুণ ট্র্যাজেডি
এই রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক গানগুলো সৃষ্টির পেছনে লুকিয়ে আছে নজরুলের জীবনের সবচেয়ে বড় শোকাভিঘাত। ১৯৩০ সালের মে মাসে কবির পরম স্নেহের চার বছরের পুত্র বুলবুল বসন্ত রোগে অকালে প্রাণ হারায়। নিদারুণ পুত্রশোকে আচ্ছন্ন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কবি যখন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিলেন, ঠিক তখনই এক অলৌকিক মানসিক শক্তিতে তিনি এই তীব্র হাস্যরস ও ব্যঙ্গাত্মক গানগুলো রচনা করেন। এক চরম বেদনার মধ্যে দাঁড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গরসের এমন তুঙ্গীয় প্রকাশ বিশ্বের সাহিত্য ইতিহাসে বিরল।
ব্রিটিশ রাজের নিষেধাজ্ঞা ও পুনর্বাসিত সংস্করণ
গ্রন্থে স্থান পাওয়া গানগুলোতে ঔপনিবেশিক শাসন, ব্রিটিশদের চক্রান্ত এবং মেকি নেতাদের এত তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছিল যে, প্রকাশের মাত্র এক মাসের মাথায়—১৯৩১ সালের ১৪ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার ‘চন্দ্রবিন্দু’ বইটি বাজেয়াপ্ত করে এবং এর প্রচার ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দীর্ঘ ১৪ বছর বাজেয়াপ্ত থাকার পর, ১৯৪৫ সালের ৩০ নভেম্বর রাজবন্দীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে এর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৩৫২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (১৯৪৬ সালের শুরুতে) ‘নূর লাইব্রেরি’ থেকে ৩ টাকা ৫০ আনা মূল্যে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
২. মূল ভাবাদর্শ, সামাজিক সচেতনতা ও তীব্র রাজনৈতিক ব্যঙ্গ
‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থে স্থান পাওয়া ১৮টি গান মূলত তৎকালীন রাজনৈতিক চক্রান্ত ও সামাজিক ভণ্ডামির ওপর এক একটি সুতীব্র সাঙ্গীতিক কষাঘাত:
ক) ঔপনিবেশিক রাজনীতি ও ব্রিটিশ চক্রান্তের ব্যবচ্ছেদ
তৎকালীন সময়ে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্তিমিত করতে ব্রিটিশ সরকার যেসব রাজনৈতিক নাটক সাজাচ্ছিল, নজরুল তাঁর গানে সেগুলোর মুখোশ উন্মোচন করেন। ‘সাইমন কমিশন’, ‘গোলটেবিল বৈঠক’, কিংবা ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’-এর মতো রাজনৈতিক টোপগুলোকে কবি গানে গানে চরম উপহাস করেছেন।
খ) মেকি নেতৃত্ব ও স্বদেশী ভণ্ডামির ওপর চাবুক
যেসব তথাকথিত ‘লিডার’ বা নেতা মুখে স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন, কবি তাঁদের নাম দিয়েছেন ‘রাজনৈতিক ডুগডুগি’। এছাড়া জাতপাত নিয়ে গোঁড়ামি, অস্পৃশ্যতা এবং অন্ধ কুসংস্কারকে আক্রমণ করে কবি রচনা করেন ‘জাতের বজ্জাতি’ কিংবা ‘আইন-সভা’ এর মতো প্রতিবাদী গান।
গ) লোকজ সুর ও হাস্যরসের চটুল ছন্দ
কঠিন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া সত্ত্বেও গানগুলোর সুরের বুনন ছিল অত্যন্ত কৌতুকপ্রদ, ছন্দময় এবং শ্রুতিমধুর। ধামাল, চটকা, রূপক এবং মার্চ-সংগীতের ছন্দে রচিত এই গানগুলো আমজনতার মুখে মুখে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও নজরুল-চর্চায় ‘চন্দ্রবিন্দু’
বাংলা সংগীতে ‘হাসির গান’ বা ‘কমিক সং’ বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল (যেমন—দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের হাসির গান)। কিন্তু হাসির গানের অবয়বে এমন সোচ্চার রাজনৈতিক প্রতিবাদ, গণজাগরণের আহ্বান এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হুঙ্কার বাংলা গানে কেবল নজরুলের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রমাণ করে যে, স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াইয়ে কেবল রক্তক্ষয়ী সংগ্রামই নয়, বরং হাস্যরস ও ব্যঙ্গাত্মক গানও এক অবিনাশী দূরন্ত অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
‘চন্দ্রবিন্দু’ (১৯৩১) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার কাঠামোগত সুবিধার্থে ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থে সংকলিত ১৮টি কালজয়ী ব্যঙ্গ ও হাসির গানের নির্ভুল নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
- রাজভক্তের গোলটেবিল
- সাইমন কমিশনের রিপোর্ট
- লিডার
- ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস
- আইন-সভা
- প্যাক্ট
- রাজনৈতিক ডুগডুগি
- আত্ম-সমর্পণ
- বেলতলা
- জাতের বজ্জাতি
- মদের বোতল
- ল্যাঙ্গোট
- স্বরাজ্য পার্টি
- চন্দ্রবিন্দু
- সুরাজ-বিচার
- চরকা-গান
- ভবের পাশা খেলায়
- কে বিলাতি কে দেশী




![রোজ কেয়ামত- বা প্রলয় দিন [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম রোজ কেয়ামত- বা প্রলয় দিন [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/রোজ-কেয়ামত-বা-প্রলয়-দিন-1024x655.jpg)













