বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আবেগময় ও অভিমানী প্রেমের কবিতা হলো ‘ব্যথা গরব’। এই কবিতায় প্রিয়জনের অবহেলা, আঘাত ও উপেক্ষাকেই প্রেমের শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে গ্রহণ করার এক তীব্র অভিমানী ও মরমী অনুভূতি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ব্যথা গরব |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | দোলনচাঁপা |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৩ (আশ্বিন ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও অভিমানী প্রেমের লিরিক কবিতা (Romantic / Passionate Love Lyric) |
কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:
১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (আশ্বিন ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত ‘দোলনচাঁপা’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত প্রথম প্রেমের কাব্যগ্রন্থ। ‘ব্যথা গরব’ কবিতায় কবি প্রেমিকের এক অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন, যেখানে প্রিয়জনের আঘাত বা অবহেলাকেও পরম আদরে বুকে ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের (বিষ্ণু) বুকে ভৃগুমুনির পদাঘাতের পৌরাণিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করে কবি বুঝিয়েছেন, প্রিয়তমের দেওয়া পদাঘাত তাঁর কাছে বিষ্ণুর বক্ষে থাকা কৌস্তুভ মণির চেয়েও দামি। প্রেমের এই অহংকার বা ‘গরব’ কবিতাটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
ব্যথা গরব কবিতা (সম্পূর্ণ)
তোমার কাছে নাই অজানা কোথায় আমার ব্যথা বাজে।
ওগো প্রিয়! তবু এত ছল করা কি তোমার সাজে?
কেন তোমার অনাদরে বক্ষ আমার ডুকরে ওঠে,
চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে, কলজে ছিঁড়ে রক্ত ছোটে,
এ অভিমান এ ব্যথা মোর
জানি, জানো, হে মনোচোর,
তবু কেন এমন কঠোর
বুঝতে আমি পারি না যে!
অন্হেলা না পুলক-লাজে॥
যখন ভাবি আমার আদর কতই তোমায় হানে বেদন
বুকের ভিতর আছড়ে পড়ে অসহায়ের হুতাশ রোদন।
যতই আমায় সইতে নারো
আঁকড়ে ততই ধরি আরো;
মারো প্রিয় আরো মারো
তোমার আঘাত-চিহ্ন রাজে
যেন আমার বুকের মাঝে॥
মনে পড়ে সেদিন তুমি ঘুমিয়ে ছিলে অঘোর ঘুমে
এ দীন কাঙাল এসেছিল তোমার পায়ের আঙুল চুমে।
আমার অশ্রু-আঘাত লেগে
চমকে তুমি উঠলে জেগে
চরণ-আঘাত করলে রেগে
সেই পরশের সান্ত্বনা যে
আজো আমার মর্মে রাজে॥
এমনি তোমার পদ্মপায়ের আঘাত-সোহাগ দিয়ো দিয়ো
এই ব্যথিত বুকে আমার, ওগো নিঠুর পরান-প্রিয়!
সেই পদ-চিন বক্ষে রেখে
ভগবানে কইব ডেকে–
‘ছাই ভৃগুপদ, যাও হে দেখে
কি কৌস্তুভ এ হিয়ায় রাজে!’
মরবে হরি হিংসা-লাজে॥
বিষ্ণুজয়ী ভালোবাসার গর্বে এ বুক উঠবে দুলে,
সর্বহারার হাহাকার আর কাঁদবে নাকো চিত্ত-কূলে।
এই যে তোমার অবহেলা
তাই নিয়ে মোর কাটবে বেলা,
হেলাফেলার বসবে মেলা,
একলা আমার বুকের মাঝে,
সুখে দুখে সকল কাজে॥
Byatha Gorob Kobita romanized version:
Tomar kache nai ojana kothay amar byatha baje.
Ogo priyo! Tobu eto chhol kora ki tomar shaje?
Keno tomar onadore bokkho amar dukre othe,
Chokh phete jol goriye pore, kolje chhire rokto chhote,
E obhiman e byatha mor
Jani, jano, he monochor,
Tobu keno emon kothor
Bujhte ami pari na je!
Onhela na pulok-laje..
Jokhon bhabi amar ador kotoi tomay hane bedon
Buker bhitor achhre pore oshohaer hutash rodon.
Jotoi amay shoite naro
Akre totoi dhori aro;
Maro priyo aro maro
Tomar aghat-chinho raje
Jeno amar buker majhe..
Mone pore shedin tumi ghumiye chhile oghor ghume
E din kangal eshechhilo tomar payer angul chume.
Amar oshru-aghat lege
Chomke tumi uthle jege
Choron-aghat korle rege
Shei porosher shantona je
Ajo amar morme raje..
Emni tomar poddopayer aghat-shohag diyo diyo
Ei byathito buke amar, ogo nithur poran-priyo!
Shei podo-chin bokkhe rekhe
Bhogobane koibo deke-
‘Chhai bhrigupod, jao he dekhe
Ki koustubh e hiyay raje!’
Morbe Hori hingsha-laje..
Bishnujoyi bhalobashar gorbe e buk uthbe dule,
Shorboharar hahakar ar kãdbe nako chitto-kule.
Ei je tomar obohela
Tai niye mor katbe bela,
Hela-phelar boshbe mela,
Ekla amar buker majhe,
Shukhe dukhe shokol kaje..
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- আঘাত ও অবহেলার অহংকার: প্রিয়জনের দেওয়া আঘাত ও অবহেলাকে কোনো যন্ত্রণা হিসেবে নয়, বরং প্রেমের এক শ্রেষ্ঠ উপহার ও অহংকার বা ‘ব্যথা গরব’ হিসেবে গ্রহণ করার তীব্র অভিমানী বাসনা।
- পৌরাণিক রূপক ও চরম সমর্পণ: শ্রীকৃষ্ণের (বিষ্ণু) বুকে ভৃগুমুনির পদাঘাতের পৌরাণিক উপাখ্যান টেনে কবি ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রেমিকের পদাঘাত বিষ্ণুর বুকের কৌস্তুভ মণির চেয়েও দামি। এই নিঃশর্ত, অভিমানী ও একাত্ম প্রেমের সমর্পণই এই কবিতার মূল প্রাণ।
উৎস:
কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৩) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।