Editor's Choice

বাংলা গীতিসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বনগীতি’ (১৯৩২) এক অনন্য ও সুরভিত গীতি-আলেখ্য। ১৯২০-এর দশকের শেষভাগ থেকে নজরুল যখন নগর কলকাতার বৈঠকখানা ও স্টুডিওতে পারস্যের গজল এবং শাস্ত্রীয় রাগের চর্চায় মগ্ন, ঠিক তখনই তিনি বাংলার মেঠোপথ, নদীমাতৃক প্রকৃতি এবং লোকজীবনের মাটির গন্ধে ফিরে তাকান। নাগরিক কৃত্রিমতার সীমান্ত পেরিয়ে রূপসী বাংলার নদী-নালা, বনের উদাসী হাওয়া, বাউলের একতারা আর ভাটিয়ালির উদাস করা সুরকে গীতি-কবিতায় রূপ দিয়ে নজরুল সৃষ্টি করেছিলেন এই কালজয়ী ‘বনগীতি’।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও পটভূমি

‘বনগীতি’ সংকলনটি ১৯৩২ সালে (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) কলকাতার প্রখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে ১ম সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
  • প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
  • বিষয়শ্রেণী: প্রকৃতি বিষয়ক গান, লোকজ সুর, ভাটিয়ালি, বাউল, ঝুমুর ও পল্লীগীতির সংকলন।
তৎকালীন যুগে মেগাফোন ও এইচএমভি গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির জন্য নজরুল যেসব চমৎকার লোকজ ও প্রাকৃতিক আবহনির্ভর গান রচনা করেছিলেন, সেগুলোর শ্রেষ্ঠ গানগুলোকে একত্রে গ্রন্থিত করে এই ‘বনগীতি’ প্রকাশ করা হয়। এটি প্রকাশিত হওয়ার পর বঙ্গীয় সুশীল সমাজ বুঝতে পারে যে নজরুল কেবল নগরের বিদ্রোহী কবি বা গজলের স্রষ্টা নন, তিনি গ্রামীণ বাংলার মৃত্তিকালগ্ন আত্মারও সবচেয়ে কাছের রূপকার।

২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও ভাববস্তু

‘বনগীতি’ সংকলনে কবি নজরুল ভারতীয় লোকসুরের বৈচিত্র্যময় সম্ভারকে আধুনিক বাংলা গানের মেলোডির সাথে যুক্ত করেছেন:

ক) নদী ও মাঝিমাল্লাদের জীবনগাথা

নদীমাতৃক বাংলার চিরন্তন রূপ ফুটে উঠেছে এই সংকলনের গানগুলোতে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার ঢেউ, জোয়ার-ভাটার খেলা, সাম্পানের পাল এবং নদীর বাঁকে বিরহী মাঝির উদাসী মনকে নজরুল সুরে রূপায়িত করেছেন। ‘পদ্মার ঢেউ রে’, ‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’, কিংবা ‘নদীর স্রোতে মালার কুসুম ভাসিয়ে দিলাম’—গানগুলোতে নদী কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, বরং মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বিরহের এক জীবন্ত রূপক।

খ) ভাটিয়ালি, বাউল ও ঝুমুর সুরের প্রবর্তন

নজরুল বাংলা গানের মূলধারায় লোকজ সুরের বৈচিত্র্যময় ধারাগুলোকে সাহসিকতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন। ময়মনসিংহের ভাটিয়ালি, রবীন্দ্র-উত্তর বীরভূমের বাউল গান, সাঁওতালি পরগনার ঝুমুর এবং উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়ার সুরকে তিনি সাধারণ শিক্ষিত শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন।

গ) প্রকৃতির রূপক ও বিরহবেদনা

বন-বিহঙ্গের ডাক, শিউলি ও বকুল ঝরার শব্দ, শ্যামল ধানের শিষের দোলা কিংবা বৈশাখের ঝড়ের তাণ্ডব—সবকিছুর ভেতরে নজরুল খুঁজে পেয়েছেন এক গভীর অনুরাগের সুর। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সাথে মানবমনের আনন্দ-বেদনাকে মিলিয়ে দেওয়া ছিল এই গ্রন্থের গানগুলোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৩. গ্রামোফোন রেকর্ড ও লোকজ সংগীতে প্রভাব

‘বনগীতি’ প্রকাশের ফলে বাংলা সঙ্গীত জগতে লোকজ সুরভিত্তিক আধুনিক গানের এক নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। শচীন দেববর্মন (এস ডি বর্মন), আব্বাসউদ্দীন আহমদ, এবং কৃষ্ণচন্দ্র দে-র (কে সি দে) মতো প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পীরা নজরুলের রচিত এসব লোকজ ও প্রকৃতির গান গেয়ে তৎকালীন রেকর্ড বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। বিশেষ করে শচীন কর্তার গাওয়া ভাটিয়ালি ও বাউল অঙ্গের গানগুলো ঘরে ঘরে বিপুল সমাদর লাভ করে।

‘বনগীতি’ (১৯৩২) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র

(সংগ্রহশালার কাঠামোগত সুবিধার্থে ‘বনগীতি’ গ্রন্থে সংকলিত কালজয়ী গানগুলোর নির্ভুল ও পরিমার্জিত নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
  1. নদী পারের খবর বলতে পারো
  2. এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে
  3. বন-বিহঙ্গ যাও রে উড়ে
  4. পদ্মার ঢেউ রে
  5. নদীর স্রোতে মালার কুসুম ভাসিয়ে দিলাম
  6. সাম্পান মাঝি রে
  7. ও কালো বউ
  8. রাঙা মাটির পথে লো মাদল বাজে
  9. আমুদে মেয়ে ওগো আমুদে মেয়ে
  10. ওরে ও মরাল-গামিনী
  11. শ্যামল ধানের শিষের দোলায়
  12. নদীর ঘাটে আইল গোরী
  13. ঝুমুর ঝুমুর নূপুর বাজে
  14. কে বিরহী বনে কাঁদে
  15. ওগো দখিন হাওয়া
  16. মন ভোমরা রে
  17. বন ঝাউয়ের ঐ থোকা থোকা ফুল
  18. ভাটিয়ালি সুরে মন কাঁদে রে
  19. দূর গাঁয়ের ওই আঁকা বাঁকা পথ
  20. বাউলা বাতাস কায় গিয়া কয়
  21. মাঝগাঙ্গে বান এসেছে
  22. চল ওরে মন নদীয়াপানে
  23. মেঠো সুরের উদাসী বাউল
  24. বাঁশরি বাজাইয়া কে যায় রে
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত