Editor's Choice

অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের ‘মোহররম’ কবিতা — কাজী নজরুল ইসলাম

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমোহররম
কবির নামকাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থঅগ্নিবীণা
প্রকাশের বছর১৯২২ (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনঐতিহাসিক ও বিপ্লবী শোককাব্য লিরিক (Historical / Revolutionary Elegiac Lyric)

কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:

১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘অগ্নিবীণা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক। এই গ্রন্থের দ্বাদশ ও সর্বশেষ কবিতা হলো ‘মোহররম’। কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত এই কবিতায় কবি কেবল মাতম বা কান্নার সুর তোলেননি; বরং শহীদের রক্তে রাঙা ত্যাগের মহিমাকে পুনর্জাগরণের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ফোরাতের তীরে অবুঝ শিশু আসগরের তৃষ্ণা, কাসিমের রক্তে রাঙা মেহাদীর রঙ মুছে যাওয়া এবং জয়নাল আবেদিনের বেদনা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি কবি মুসলিম জাতিকে শোক ভুলে শম্‌শের (তরবারি) হাতে তুলে নেওয়ার এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অমর বাণী শুনিয়েছেন।

মোহররম কবিতা (পুরো কবিতা)

নীল সিয়া আসমা লালে লাল দুনিয়া,–
‘আম্মা ! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’।
কাঁদে কোন্ ক্রদসী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে !
রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া দামেশকে–
‘জয়নালে পরাল এ খুনিয়ারা বেশ কে?

‘হায় হায় হোসেনা’ ওঠে রোল ঝন্‌ঝায়,
তল্‌ওয়ার কেঁপে ওঠে এজিদেরো পঞ্জায়!
উন্‌মাদ ‘দুলদুল্’ ছুটে ফেরে মদিনায়,
আলি-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়!
মা ফাতেমা আস্‌মানে কাঁদে খুলি কেশপাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেতবাস!

রণে যায় কাসিম্ ঐ দু’ঘড়ির নওশা,
মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা!
‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা–
‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেলো সকিনা!’
কাঁদে কে রে কোলে করে কাসিমের কাটা-শির?

খান্‌খান্ খুন হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর!
কেঁদে গেছে থামি হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,
বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র!
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
‘আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা!’
নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,
কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার!
দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্‌মনও ‘সাব্বাস’!

দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা!’
মা’র থনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়্‌পায়!
জিভ চুষে কচি জান থাকে কিরে ধড়্‌টায়?দাউদাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,
কাঁদে বানু–’পানি দাও, মরে জাদু আস্‌গর!’
কলিজা কাবাব সম ভুনে মরু-রোদ্দুর,
খাঁ খাঁ করে কার্‌বালা, নাই পানি খর্জুর,
পেল না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,
ডাকে মাতা, –পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিঁড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে!
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল,
‘দাদা! তেরি হর্ কিয়া বর্‌বাদ্ পয়মাল!’
হাইদরি-হাঁক হাঁকি দুল্‌দুল্-আস্‌ওয়ার
শম্‌শের চম্‌কায় দুশমনে ত্রাস্‌বার!
খসে পড়ে হাত হতে শত্রুর তরবার,
ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার।নিঃশেষ দুশ্‌মন্; ওকে রণ-শ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মুছে আঁখি-প্রান্ত?
কোথা বাবা আস্‌গর্? শোকে বুক-ঝাঁঝরা
পানি দেখে হোসনের ফেটে যায় পাঁজরা!ধুঁকে ম’লো আহা তবু পানি এক কাৎরা
দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম্‌জাত্‌রা!
অঞ্জলি হতে পানি পড়ে গেল ঝর্-ঝর্
লুটে ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জর!
হল্‌কুমে হানে তেগ ও কে বসে ছাতিতে?–আফ্‌তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে!
আস্‌মান ভরে গেল গোধূলিতে দুপরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে!
বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্–
‘আরশের পায়া ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা,
‘এয়্ খোদা বদ্‌লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জনা করো গোনা পাপী কম্‌বখ্‌তের!’

কত মোহর্‌রম্ এল্ গেল চলে বহু কাল–
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!
মুস্‌লিম্! তোরা আজ জয়নাল আবেদিন,
‘ওয়া হোসেনা-ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!
ফিরে এল আজ সেই মোহর্‌রম মাহিনা,–
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না!

উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবির,
দুনিয়াতে নত নয় মুস্‌লিম কারো শির;–
তবে শোনো ঐ শোনো বাজে কোথা দামামা,
শম্‌শের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকিবের তূর্য,
হুশিয়ার ইস্‌লাম, ডুবে তব সূর্য!
জাগো ওঠো মুস্‌লিম, হাঁকো হাইদরি হাঁক।

শহীদের দিনে সব-লালে-লাল হয়ে যাক!
নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তিন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস দিন।
হাসানের মতো পি’ব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মতো নিব বুকে ছুরি কহরের;
আস্‌গর সম দিব বাচ্চারে কোর্‌বান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান!
সকিনার শ্বেতবাস দেব মাতা কন্যায়,
কাসিমের মতো দেবো জান রুধি অন্যায়!
মোহর্‌রম্! কারবালা! কাঁদো ‘হায় হোসেনা!’
দেখো মরু-সূর্যে এ খুন যেন শোষে না!

 

Mohorrom Kobita romanized version:

Nil siya asma lale lal duniya,–

‘Amma! Lal teri khun kiya khuniya’.

Kãde kon krondoshi Karbala Forate,

She kandone ãsu ane Simarer-o chhorate!

Rudro matam othe duniya Dameshke–

‘Joynale paral e khuniyara besh ke?’

‘Hay hay Hosena’ othe rol jhonjhay,

Talowar kẽpe othe Ejidero ponjay!

Unmad ‘Duldul’ chhute phere Modinay,

Ali-jada Hosen-er dekha hetha jodi pay!

Ma Fatema ashmane kãde khuli keshpash,

Betader lash niye bodhuder shwetbash!

Rone jay Kasim oi du’ghorir nowsha,

Mehedir rongtuku muche gelo shohosha!

‘Hay hay’ kãde bay Purobi o Dokkhinā–

‘Kongkon poĩchi khule phelo Sokina!’

Kãde ke re kole kore Kasimer kata-shir?

Khankhan khun hoye khore buk-phata nir!

Kẽde gechhe thami hetha mrittu o rudro,

Bishwer byatha jeno balika e khudro!

Goragori diye kãde kochi meye Fatima,

‘Amma go pani dao phete gelo chhati ma!’

Niye trisha Saharar, duniyar hahakar,

Karbala-prantore kãde bachcha aha kar!

Dui hat kata tobu sher-nor Abbas

Pani ane mukhe, hãke dushmon-o ‘sabbas’!

Drim drim baje ghon dundubhi damama,

Hãke bir ‘shir dega, nehi dega amama!’

Mar thone dudh nai, bachchara torpay!

Jibh chushe kochi jan thake ki re dhortay?

Dau dau jole shire Karbala-bhaskar,

Kãde Banu–‘pani dao, more jadu Asgar!’

Kolija kabab shom bhune moru-roddur,

Khã khã kore Karbala, nai pani khorjur,

Pelo na to pani shishu piye gelo kãcha khun,

Dake mata,–pani debo phire ay bachcha shun!

Putrohin ar bidhobar kandone

Chhire ane mormer bottrish bandhane!

Tambute shojjay kãde eka Joynal,

‘Dada! teri hor kiya borbad paymal!’

Haidori-hãk haki Duldul-aswar

Shomshere chomkay dushmone trasbar!

Khose pore hat hote shotrur torobar,

Bhase chokhe kiyamat-e Allar dorbar.

Nihshesh dushmon; oke ron-shranto

Forater nire neme muche ãkhi-pranto?

Kotha baba Asgar? Shoke buk-jhãjhra

Pani dekhe Hosen-er phete jay pajra!

Dhunke m’lo aha tobu pani ek katra

Deyni re bachchader mukhe komjat-ra!

Anjoli hote pani pore gelo jhor-jhor

Lute bhume mohabahu khonjor-jorjor!

Holkume hane teg o ke boshe chhatite?

Aftab chheye nil ãdhiyara ratite!

Ashman bhore gelo godhulite dupure,

Lal nil khun jhore kufrer upore!

Betader lohu-ranga pirahan-hate, ah–

‘Arsher paya dhore kãde mata Fatema,

‘Ey Khoda bodlate betader rokter

Marjona koro gona papi kombokhter!’

Koto Mohorrom elo gelo chole bohu kal–

Bhulinigo ajo shei shahider lohu lal!

Muslim! tora aj Joynal Abedin,

‘Wa Hosena-Wa Hosena’ kẽde tai jabe din!

Phire elo aj shei Mohorrom mahina,–

Tyag chai, morsiya-krondon chai na!

Ushnish Koraner, hate teg Arabir,

Duniyate noto noy Muslim karo shir;–

Tobe shono oi shono baje kotha damama,

Shomsh er hate nao, bãdho shire amama!

Bejechhe nakara, hãke nokiber turjo,

Hushiyar Islam, dube tobo surjo!

Jago otho Muslim, hãko Haidori hãk.

Shahider dine shob-lale-lal hoye jak!

Nowshar shaj nao khun-khacha astin,

Moydane lutate re lash ei khas din.

Hasaner moto pi’b piyala she johorer,

Hosen-er moto nib buke chhuri kohorer;

Asgar shom dib bachchare korban,

Zalimer dad nebo, debo aj gor jan!

Sokinar shwetbash debo mata konnay,

Kasimer moto debo jan rudhi onnay!

Mohorrom! Karbala! Kãdo ‘Hay Hosena!’

Dekho moru-shurje e khun jeno shoshe na!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ও শোক: কারবালার প্রান্তরের মর্মান্তিক ঘটনা, ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের অসামান্য আত্মত্যাগ এবং পানির জন্য অবুঝ শিশুদের হাহাকারের এক হৃদয়বিদারক রূপায়ণ।
  • বিপ্লবী জাগরণ ও ত্যাগের দীক্ষা: কেবল মাতম বা শোক প্রকাশ না করে, কারবালার শহীদদের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শম্‌শের (তরবারি) হাতে তুলে নেওয়া এবং মুস্লিম উম্মাহর আত্মমর্যাদা রক্ষার উদাত্ত আহ্বান—এই কবিতার মূল প্রাণ।

উৎস:

কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২২) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.