বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম জনপ্রিয় শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙে ফুল’-এর একটি অত্যন্ত মজাদার ও কৌতুকপূর্ণ ছড়া-কবিতা হলো ‘হোঁদলকুতকুতের বিজ্ঞাপন’। এই কবিতায় কবি শিশুদের বিচিত্র স্বভাব, চেহারা এবং আচরণের ওপর ভিত্তি করে তাদের নানান মজাদার নাম ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | হোঁদলকুতকুতের বিজ্ঞাপন |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ঝিঙে ফুল |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৬ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস) |
| প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলিকাতা |
| উৎসর্গ | বীর বাদলকে |
| কবিতার ধরন | শিশুতোষ ও কৌতুকপূর্ণ ছড়া-কবিতা (Children’s Comic Rhyme) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৬ সালে (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ। শিশুদের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের চঞ্চল স্বভাব নজরুলের অত্যন্ত প্রিয় বিষয় ছিল। ‘হোঁদলকুতকুতের বিজ্ঞাপন’ কবিতায় তিনি অত্যন্ত হালকা ও হাস্যরসাত্মক মেজাজে শিশুদের রকমারি স্বভাবের (যেমন—ছিঁচকাঁদুনে, ডানপিটে, হাঁদা, ডেঁপো) এক নিখুঁত ও মজাদার তালিকা তৈরি করেছেন, যা পাঠকদের অনাবিল আনন্দ দেয়। এই হাস্যকৌতুকের আড়ালে তিনি পরাধীন দেশের মুক্তির জন্য সাহসী তরুণদেরও (‘বীর বাদল’) আহ্বান জানিয়েছেন।
হোঁদলকুতকুতের বিজ্ঞাপন – সম্পূর্ণ কবিতা
মিচকে-মারা কয় না কথা মনটি বড়ো খুঁতখুঁতে।
‘ছিঁচকাঁদুনে’ ভ্যাবিয়ে ওঠেন একটু ছুঁতেই না ছুঁতে।
ড্যাবরা ছেলে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে থেকে গাল ফুলান,
সন্দেশ এবং মিষ্টি খেতে – বাসরে বাস – এক জাম্বুবান!
নিম্নমুখো-যষ্টি ছেলে দশটি ছেলে লুকিয়ে খান,
বদমায়েশির মাসি পিসি, আধখানা চোখ উঁচিয়ে চান!
হাঁদারা হয় হদ্দ বোকার, সব কথাতেই হাঁ করে!
ডেঁপো চতুর আধ-ইশারায় সব বুঝে নেয় ঝাঁ করে!
ভোঁদা খোকার নামটি ভুঁদো বুদ্ধি বেজায় তার ভোঁতা।
সব চেয়ে ভাই ইবলিশ হয় যে ছেলেদের ঘাড় কোঁতা।
পুঁয়ে-লাগা সুঁটকো ছেলে মুখটা সদাই মুচকে রয়!
পেটফুলো তার মস্ত পিলে, হাত-পাগুলোও কুঁচকে রয়!
প্যাঁটরা ছেলের য়্যাব্বড়ো পেট, হাত নুলো আর পা সরু!
চলেন যেন ব্যাংটি হো হো উ-র্ গজ-ঢাক গাল পুরু!
গাবদা ছেলের মনটি সাদা একটুকুতেই হন খুশি,
আদর করে মা তারে তাই নাম দিয়েছেন মনটুসি।
ষাঁড়ের নাদ সে নাদুস নুদুস গোবর-গণেশ যে শ্রীমান,
নাঁদার মতন য়্যাভ ভুঁড়ি তাঁর চলতে গিয়ে হুমড়ি খান!
ছ্যাঁচড় ছেলে বেদড় ভারি ধুমসুনি খায় সব কথায়।
উদমো ছেলে ছটফটে খুব একটুকুতেই উতপুতায়!
ফটকে ছেলে ছটকে বেড়ায় আঁটি তারা বজ্জাতের,
দুষ্টু এবং চুলবুলেরা সবখানে পায় লজ্জা ঢের।
বোঁচা-নাকা খাঁদা যে হয় নাম রেখো তার চামচিকে,
এসব ছেলে তেঁদড় ভারী ডরায় না দাঁত-খামচিকে!
টুনিখুকির মুখটি ছোটো টুনটুনি তার মন সরল,
ময়না-মানিক নাম যার ভাই মনটি তারও খুব তরল!
গাল টেবো যাঁর নাম টেবি তাঁর একটুকুতেই যান রেগে।
কান-খড়কে মায়ের লেঠা, রয় ঘুমুলেও কান জেগে।
খুদে খুকির নামটি টেপু মা-দুলালি আবদেরে।
ডর-পুকুনে আঁতকে ওঠে নাপতে দেখে আঁক করে!
পুঁটুরানি বাপ-সোহাগি, নন্দদুলাল মানিক মা-র,
দাদু বুড়োর ন্যাওটা যে ভাই মটরু ছাগল নামটি তার!
ভুতো ছেলে ঠগ বড়ো হয়, ভয় করে না কাউকে সে,
নাই পরোয়া যতই কেন কিল আর থাপড় দাও ঠেসে।
দস্যি ছেলে ভয় করে না চোখ-রাঙানি ভূত-পেরেত,
সতর-চোখি জুজুর খোঁজে বেড়িয়ে বেড়ায় রাত বিরেত!
ডানপিটেরা ঝুলঝাপপুর গুলি-ডাণ্ডায় মদ্দ খুব!
বাঁদরা-মুখোর ভ্যাংচিয়ে মুখ দাঁত খিঁচে বে-হদ্দ হুব!
বীর বাদল সে – দেশের তরে প্রাণ দিতে ভাই যে শিখে,
আনবে যে সাত-সাগর-পারের বন্দিনী দেশ-লক্ষ্মীকে!
কেউ যদি ভাই হয় তোমজদের এমনিতরো মর্দ ফেরো,
হো হো! তাকে পাঠিয়ে দেব বাচ্চা হোঁদল কুতকুতের!
Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- শিশুদের বিচিত্র স্বভাব ও লোকজ শব্দের ব্যবহার:“হাঁদারা হয় হদ্দ বোকার, সব কথাতেই হাঁ করে! / ডেঁপো চতুর আধ-ইশারায় সব বুঝে নেয় ঝাঁ করে!”
— কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে শিশুদের নানারকম স্বভাব (যেমন: হাঁদা, ডেঁপো, ছিঁচকাঁদুনে, ডানপিটে) বর্ণনা করেছেন। খাঁটি বাংলা ও লোকজ শব্দের (যেমন: ড্যাবরা, গাবদা, ছ্যাঁচড়) ব্যবহারে কবিতাটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
- দৃশ্যকল্প ও নির্মল হাস্যরস:“প্যাঁটরা ছেলের য়্যাব্বড়ো পেট, হাত নুলো আর পা সরু! / চলেন যেন ব্যাংটি হো হো উ-র্ গজ-ঢাক গাল পুরু!”
— শিশুদের শারীরিক গঠন ও তাদের অদ্ভূত চালচলন নিয়ে কবি এমন সব মজাদার দৃশ্যকল্প তৈরি করেছেন, যা পাঠকমাত্রই হাসির উদ্রেক করে।
- হাসির আড়ালে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের আহ্বান:“বীর বাদল সে – দেশের তরে প্রাণ দিতে ভাই যে শিখে, / আনবে যে সাত-সাগর-পারের বন্দিনী দেশ-লক্ষ্মীকে!”
— কেবল হাস্যকৌতুকই নয়, কবিতার শেষাংশে এসে নজরুল তাঁর স্বভাবসুলভ বিদ্রোহী ও দেশপ্রেমিক রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘বীর বাদল’-এর মাধ্যমে তিনি এমন সাহসী তরুণদের বন্দনা করেছেন যারা মাতৃভূমিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৬) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।




![আমি সৈনিক [ দুর্দিনের যাত্রী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম আমি সৈনিক [ দুর্দিনের যাত্রী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/আমি-সৈনিক-1024x655.jpg)



















