Editor's Choice

বাংলা গীতিসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘জুলফিকার’ (১৯৩২) কেবল একটি গানের সংকলন নয়; এটি বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক কালজয়ী বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়-তৃতীয় দশক পর্যন্ত বাংলা গানে ইসলামী ভাবধারা, ঐতিহ্য ও ভক্তির রূপায়ণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। নজরুলই প্রথম ক্যালিওগ্রাফিক ছন্দ, ফারসি-আরবি শব্দের সাবলীল মিশ্রণ এবং ক্লাসিক্যাল সুরের মেলবন্ধনে বাংলা ইসলামী গানকে সঙ্গীত জগতের শীর্ষতম মর্যাদায় উন্নীত করেন। সেই ঐতিহাসিক সাঙ্গীতিক আন্দোলনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থরূপ হলো এই ‘জুলফিকার’।

১. প্রকাশনার ইতিহাস, নামকরণ ও ব্যাকগ্রাউন্ড

‘জুলফিকার’ গীতিগ্রন্থটি ১৯৩২ সালে (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বিখ্যাত ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।
  • নামকরণের তাৎপর্য: ‘জুলফিকার’ শব্দটি ঐতিহাসিক ও ইসলামী ঐতিহ্যে অত্যন্ত গভীর অর্থবহ। এটি ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক হযরত আলী (রাঃ)-কে উপহার দেওয়া ঐতিহাসিক দ্বি-ফলক তলোয়ারের নাম। কবি এই কাব্য-সংকলনের নামকরণে ‘জুলফিকার’ শব্দটি ব্যবহার করে যেন সঙ্গীত জগতে অসত্য, কুসংস্কার ও সুপ্ত জড়তার বিরুদ্ধে সুরের তীক্ষ্ণ খড়্গ পরিচালনা করেছিলেন।
  • সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট: ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের আকুল আহ্বানে নজরুল গ্রামোফোন কোম্পানির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলায় ইসলামী গান রচনায় হাত দেন। তখনকার সমাজে উর্দুর প্রভাব কাটিয়ে বাংলায় হামদ, না’ত ও কাওয়ালি প্রকাশের যে ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক পদক্ষেপ ‘টুইন’ ও ‘এইচএমভি’ রেকর্ড কোম্পানি নিয়েছিল, ‘জুলফিকার’-এর অভূতপূর্ব সাফল্য তাদের সমস্ত সংশয় মিটিয়ে দেয়।

২. বিষয়বস্তু ও সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য

‘জুলফিকার’ সংকলনে মোট ২৪টি কালজয়ী ইসলামী ও অসাম্প্রদায়িক অদেয় গান স্থান পেয়েছিল। এতে নজরুলের সুর-ভাবনার বিভিন্ন রূপ উন্মোচিত হয়:

ক) হামদ ও তাওহীদী চেতনা

আল্লাহ তায়ালার অপরিসীম করুণা, একত্ববাদ ও মোনাজাতের আকুতি ফুটে উঠেছে সংকলনের সূচনা গানগুলোতে। স্রষ্টার প্রতি নিখাদ আত্মসমর্পণ ও আত্মবিশ্বাসের সুর ধ্বনিত হয়েছে এসব রচনায়।

খ) না’ত-ই-রাসূল ও মদিনার প্রেম

মহানবী (সঃ)-এর মিলাদ, মানবপ্রেম এবং তাঁর সুকোমল চরিত্রের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে রাসুল-বিষয়ক গানগুলোতে। মরুভূমির উদাসী হাওয়া এবং মদিনার ভালোবাসাকে কবি সুরের মায়াজালে রূপায়িত করেছেন।

গ) ঈদ, কোরবানি ও মহররমের গীতিমালা

বাঙালি মুসলিম সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবের চিরায়ত রূপায়ণ ঘটেছে এই সংকলনে। ‘রোজার ঈদ’ থেকে শুরু করে মহররমের করুণ মর্সিয়া এবং কারবালার স্মৃতিবহ গানগুলো বাঙালির আবেগ ও ভক্তির অচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

ঘ) কাওয়ালি, গজল ও মার্চ-সঙ্গীত

নজরুল কেবল ঐতিহ্যবাহী সুরে সীমাবদ্ধ থাকেননি; মধ্যপ্রাচ্যের কাওয়ালি, ফারসি গজল ও কুচকাওয়াজের লয় ব্যবহার করে গানগুলোতে এক দুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য এনেছিলেন, যা তৎকালীন যুবসমাজকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

৩. ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বাংলা গানে প্রভাব

‘জুলফিকার’ প্রকাশের ফলে বাংলায় সাময়িক বিনোদনের গানের পাশাপাশি ভক্তি ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক বিশাল দুয়ার উন্মুক্ত হয়। এই সংকলনের মাধ্যমে যেমন আব্বাসউদ্দীন আহমদ সঙ্গীত জগতে অমরত্ব লাভ করেন, তেমনই সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায় স্বকীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস পায়। তৎকালীন গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রির সমস্ত রেকর্ড চূর্ণ করে ‘জুলফিকার’-এর গানগুলো প্রতিটি বাঙালি পরিবারে সুরের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল।

‘জুলফিকার’ (১৯৩২) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র

(নিচে ‘জুলফিকার’ সঙ্গীতগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ২৪টি গানের শিরোনামের নির্ভুল নির্ঘণ্ট প্রদান করা হলো:)
  1. আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
  2. ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
  3. তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
  4. ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ
  5. আল্লায় যে চায়, তারে পায় সে সর্বদাই
  6. কারবালার ঐ প্রান্তর কাঁদাতে এলো আবার
  7. ওগো আমিনা তোমার দুলাল
  8. মহররমের চাঁদ এলো ঐ
  9. মন রে আমার এই দুনিয়ার মহফিল
  10. খোদা এই গরীবের শোনো মোনাজাত
  11. নাম মোহাম্মদ বোল রে মন
  12. মোস্তফাকে গ্রন্থি বাঁধে কে রে
  13. আল্লার নামের বীজ বুনে যা
  14. ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর
  15. আল্লা মেহেরবান, তৌফিক দাও দ্বীন-ই-ইসলাম
  16. হে মদিনার বুলবুলি তোর সুর শুনে আজ
  17. আয় মরু-পারের হাওয়া, নিয়ে যা রে মদিনায়
  18. সাহারাতে ফুটলো যে ফুল
  19. বাজলো কি রে ভোরের সানাই
  20. তোরা দেখে যা রেশমি রুমাল
  21. রুমঝুমঝুম রুমঝুমঝুম খেয়া বয়
  22. কাফনের কাপড়ে জড়িয়ে মোরে
  23. তাওহীদেরই মুরলী বাজে
  24. দূর আরবের স্বপন দেখি
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত