কাজী নজরুল ইসলামের শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙে ফুল’-এর অন্যতম কালজয়ী ও জনপ্রিয় ছড়া-কবিতা হলো ‘প্রভাতী’। ভোরবেলার স্নিগ্ধ প্রকৃতি ও কর্মচাঞ্চল্যের চমৎকার বর্ণনা দিয়ে শিশুদের ঘুম থেকে ওঠার যে মিষ্টি আহ্বান এ কবিতায় রয়েছে, তা যুগে যুগে বাঙালি শিশুদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। এটি অনেকের কাছে ‘ভোর হলো দোর খোলো’ নামেই অধিক পরিচিত।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | প্রভাতী |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ঝিঙে ফুল |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৬ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস) |
| প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলিকাতা |
| উৎসর্গ | বীর বাদলকে |
| কবিতার ধরন | শিশুতোষ জাগরণমূলক ছড়া-কবিতা (Children’s Awakening Rhyme) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৬ সালে (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থে শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের উপযোগী ছন্দ নিয়ে নজরুলের মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। সহজ-সরল শব্দ, চটুল ছন্দ এবং ভোরের প্রকৃতির নৈসর্গিক চিত্রের মাধ্যমে নজরুল শিশুদের সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার আনন্দ ও প্রয়োজনীয়তা শিখিয়েছেন। কবিতাটি শিশুদের মনে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও নিয়মানুবর্তিতা জাগিয়ে তোলার এক অনবদ্য শৈল্পিক প্রয়াস।
প্রভাতী – সম্পূর্ণ কবিতা
ভোর হলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠ রে!
ঐ ডাকে
জুঁই-শাখে
ফুল-খুকি ছোটরে!
খুকুমণি ওঠো রে!
রবি মামা
দেয় হামা
গায়ে রাঙা জামা ওই,
দারোয়ান
গায় গান
শোন ঐ, রামা হৈ!’
ত্যাজি নীড়
করে ভিড়
ওড়ে পাখি আকাশে,
এন্তার
গান তার
ভাসে ভোর বাতাসে।
চুলবুল
বুলবুল
শিস্ দেয় পুষ্পে,
এইবার
এইবার
খুকুমণি উঠবে!
খুলি হাল
তুলি পাল
ঐ তরী চললো,
এইবার
এইবার
খুকু চোখ খুললো।
আলসে
নয় সে
ওঠে রোজ সকালে
রোজ তাই
চাঁদা ভাই
টিপ দেয় কপালে।
উঠলো
ছুটলো
ওই খোকা খুকি সব,
”উঠেছে
আগে কে”
ঐ শোনো কলরব।
নাই রাত
মুখ হাত
ধোও, খুকু জাগো রে!
জয়গানে
ভগবানে
তুষি বর মাগো রে।
Romanized Version
Bhor holo
Dor kholo
Khukumoni oth re!
Oi dake
Jũi-shakhe
Phul-khuki chhotre!
Khukumoni otho re!
Robi mama
Dey hama
Gaye ranga jama oi,
Darowan
Gay gan
Shon oi, rama hoi!’
Tyaji nir
Kore bhir
Ore pakhi akashe,
Entar
Gan tar
Bhashe bhor batashe.
Chulbul
Bulbul
Shish dey pushpe,
Eibar
Eibar
Khukumoni uthbe!
Khuli hal
Tuli pal
Oi tori chollo,
Eibar
Eibar
Khuku chokh khullo.
Alshe
Noy she
Othe roj shokale
Roj tai
Chãda bhai
Tip dey kopale.
Uthlo
Chhutlo
Oi khoka khuki shob,
”Uthechhe
Age ke”
Oi shono kolorob.
Nai rat
Mukh hat
Dhoo, khuku jago re!
Joygane
Bhogobane
Tushi bor mago re.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ভোরের প্রকৃতির নৈসর্গিক জাগরণ:“রবি মামা / দেয় হামা / গায়ে রাঙা জামা ওই,”— ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে চারপাশের প্রকৃতি কীভাবে জেগে ওঠে, তার এক প্রাণবন্ত চিত্র এঁকেছেন কবি। লাল জামা গায়ে যেন সূর্য মামা হামাগুড়ি দিয়ে উঠছে। পাখিরা বাসা ছেড়ে আকাশে উড়ছে, বুলবুলি ফুলে ফুলে শিস দিচ্ছে আর নদীতে মাঝি পাল তুলে নৌকা বেয়ে চলেছে।
- ভোরে ওঠার আনন্দ ও নিয়মানুবর্তিতা:“আলসে / নয় সে / ওঠে রোজ সকালে / রোজ তাই / চাঁদা ভাই / টিপ দেয় কপালে।”— যে শিশু সকালে ঘুম থেকে ওঠে, সে অলস নয়। ভোরের স্নিগ্ধ প্রকৃতি যেন তাকে আপন করে নেয়। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কে আগে বাইরে ছুটতে পারে, তা নিয়ে শিশুদের যে নির্দোষ প্রতিযোগিতা, তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
- প্রার্থনা ও শুভ সূচনা:“নাই রাত / মুখ হাত / ধোও, খুকু জাগো রে! / জয়গানে / ভগবানে / তুষি বর মাগো রে।”— দিনের শুরুটা যেন পবিত্রতা ও স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর মাধ্যমে হয়, সেই শিক্ষাই কবি কবিতার শেষাংশে দিয়েছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৬) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।























