বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙে ফুল’ (১৯২৬)-এর অন্যতম কৌতুকপূর্ণ ও মজাদার ছড়া-কবিতা হলো ‘খাঁদু-দাদু’। এই কবিতায় এক ছোট্ট শিশু তার দাদুর চ্যাপ্টা বা খাঁদা নাক নিয়ে মায়ের কাছে নানা ধরনের মজাদার প্রশ্ন ও অদ্ভুত সব তুলনা উপস্থাপন করেছে, যা শিশুদের কল্পনার এক নির্মল ও হাস্যরসাত্মক রূপায়ণ।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | খাঁদু-দাদু |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ঝিঙে ফুল |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৬ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস) |
| প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলিকাতা |
| উৎসর্গ | বীর বাদলকে |
| কবিতার ধরন | শিশুতোষ হাস্যরসাত্মক ছড়া-কবিতা (Children’s Humorous Rhyme) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থে শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের ভাবনা নিয়ে নজরুলের মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। শিশুদের চোখে বড়দের শারীরিক কোনো বৈশিষ্ট্য (যেমন—দাদুর চ্যাপ্টা নাক) কত রকম অদ্ভুত ও মজাদার রূপ নিতে পারে, কবি তা অত্যন্ত লঘু চালে ও নিপুণ ছন্দে এই কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
খাঁদু-দাদু – সম্পূর্ণ কবিতা
অ মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং?
খ্যাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা – নাক ডেঙাডেং ড্যাং!
ওঁর নাকটাকে কে করল খ্যাঁদা র্যাঁদা বুলিয়ে?
চামচিকে-ছা বসে যেন ন্যাজুড় ঝুলিয়ে!
বুড়ো গোরুর টিকে যেন শুয়ে কোলা ব্যাং!
অ মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ড্যাং!
ওঁর খ্যাঁদা নাকের ছেঁদা দিয়ে টুকি কে দেয় ‘টু’!
ছোড়দি বলে সর্দি ওটা, এ রাম! ওয়াক! থুঃ!
কাছিম যেন উপুড় হয়ে ছড়িয়ে আছেন ঠ্যাং!
অ মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ড্যাং!
দাদু বুঝি চিনাম্যান মা, নাম বুঝি চাং চু,
তাই বুঝি ওঁর মুখটা অমন চ্যাপটা সুধাংশু!
জাপান দেশের নোটিশ উনি নাকে এঁটেছেন!
অ মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ডেং!
দাদুর নাকি ছিল না মা অমন বাদুড়-নাক,
ঘুম দিলে ওই চ্যাপটা নাকেই বাজত সাতটা শাঁখ।
দিদিমা তাই থ্যাবড়া মেরে ধ্যাবড়া করেছেন!
অ মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ডেং!
লম্ফানন্দে লাফ দিয়ে মা চলতে বেজির ছা
দাড়ির জালে পড়ে জাদুর আটকে গেছে গা,
বিল্লি-বাচ্চা দিল্লি যেতে নাসিক এসেছেন!
অ মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ডেং!
দিদিমা কি দাদুর নাকে টাঙতে ‘আলমানাক’
গজাল ঠুকে দেছেন ভেঙে বাঁকা নাকের কাঁখ?
মুচি এসে দাদুর আমার নাক করেছে ‘ট্যান’!
অ মা! আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ড্যাং!
বাঁশির মতন নাসিকা মা মেলে নাসিকে,
সেথায় নিয়ে চলো দাদু দেখন-হাসিকে।
সেথায় গিয়ে করুন দাদু গরুড় দেবের ধ্যান,
খাঁদু-দাদু নাকু হবেন, নাক ডেঙাডেং ড্যাং।
Romanized Version
O ma! tomar babar nake ke merechhe lyang?
Khyãda nake nachchhe nyada – nak dengadeng dyang!
Õr naktake ke korlo khyãda ryãda buliye?
Chamchike-chha boshe jeno nyajur jhuliye!
Buro gorur tike jeno shuye kola byang!
O ma! ami heshe mori, nak dengadeng dyang!
Õr khyãda naker chhẽda diye tuki ke dey ‘tu’!
Chhordi bole shordi ota, e ram! wak! thuh!
Kachim jeno upur hoye chhoriye achhen thyang!
O ma! ami heshe mori, nak dengadeng dyang!
Dadu bujhi chinamyan ma, nam bujhi chang chu,
Tai bujhi õr mukhta omon chyapta shudhangshu!
Japan desher notish uni nake ẽtechen!
O ma! ami heshe mori, nak dengadeng deng!
Dadur naki chhilo na ma omon badur-nak,
Ghum dile oi chyapta nakei bajto shatta shãkh.
Didima tai thyabra mere dhyabra korechhen!
O ma! ami heshe mori, nak dengadeng deng!
Lomphanonde laph diye ma cholte bejir chha
Darir jale pore jadur atke gechhe ga,
Billi-bachcha dilli jete nashik eshechhen!
O ma! ami heshe mori, nak dengadeng deng!
Didima ki dadur nake tangte ‘almanak’
Gojal thuke dechhen bhenge bãka naker kãkh?
Muchi eshe dadur amar nak korechhe ‘tyan’!
O ma! ami heshe mori, nak dengadeng dyang!
Bãshir moton nashika ma mele nashike,
Shethay niye cholo dadu dekhon-hashike.
Shethay giye korun dadu gorur deber dhyan,
Khãdu-dadu naku hoben, nak dengadeng dyang.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- নির্মল হাস্যরস ও শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি:“অ মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং? / খ্যাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা – নাক ডেঙাডেং ড্যাং!”
— দাদুর চ্যাপ্টা বা ‘খাঁদা’ নাক দেখে শিশুর মনে যে কৌতূহল ও কল্পনার উদয় হয়েছে, কবি তা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শিশুটি ভাবছে কেউ হয়তো দাদুর নাকে ‘ল্যাং’ মেরেছে বা ‘র্যাঁদা’ দিয়ে চেঁছে দিয়েছে!
- মজাদার উপমা ও দৃশ্যকল্প:দাদুর নাককে চামচিকার ছানা, বুড়ো গরুর পিঠে বসে থাকা কোলাব্যাং, উপুড় হওয়া কাছিম কিংবা চিনাম্যানের চ্যাপ্টা মুখের সাথে তুলনা করে এক অনবদ্য হাস্যকৌতুকের সৃষ্টি করা হয়েছে। “জাপান দেশের নোটিশ উনি নাকে এঁটেছেন!”—এ ধরনের পংক্তি নজরুলের অসাধারণ রসবোধের পরিচয় দেয়।
- পারিবারিক খুনসুটি ও দিদিমার শাসন:“দিদিমা তাই থ্যাবড়া মেরে ধ্যাবড়া করেছেন!”
— শিশুটি কল্পনা করে, দাদু হয়তো নাক ডাকত বলে দিদিমা থাপ্পড় মেরে নাকটি এমন থ্যাবড়া করে দিয়েছেন। আবার হয়তো দিদিমা দাদুর নাকে পঞ্জিকা বা ‘আলমানাক’ টাঙাতে গিয়ে গজাল ঠুকে নাক ভেঙে দিয়েছেন। এই নির্দোষ পারিবারিক খুনসুটি ও শিশুর অদ্ভুত কল্পনা কবিতাকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘ঝিঙে ফুল’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২৬) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।






















