Editor's Choice

বাংলা গীতিসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব কেবল এক নতুন ধারার সূচনা করেনি, বরং সমগ্র বাঙালি সমাজকে সুরের বিচিত্র বর্ণালীতে ভরিয়ে দিয়েছিল। ১৯৩০-এর দশকটি ছিল নজরুলের সাঙ্গীতিক জীবনের পরম স্বর্ণযুগ। এই সময়েই গ্রামোফোন কোম্পানি, রেডিও এবং স্বদেশী মঞ্চগুলোতে তাঁর রচিয়তা ও সুরকার রূপের জয়জয়কার চলছিল। এই সাঙ্গীতিক জোয়ারেরই এক অবিস্মরণীয় ফসল হলো ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত নজরুলগীতির অন্যতম সেরা সংকলন ‘গানের মালা’।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও গ্রন্থ পরিচয়

‘গানের মালা’ গ্রন্থটি ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ অক্টোবর (৭ কার্তিক ১৩৪১ বঙ্গাব্দ) কলকাতার প্রখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স’ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪ + ৯৬ পৃষ্ঠা
  • মূল্য: দেড় টাকা (১ টাকা ৮ আনা)
  • উৎসর্গ: কবি গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন—
    “পরম স্নেহভাজন শ্রীমান অনিলকুমার দাস কল্যাণবরেষুকে”
গ্রন্থটিতে মোট ৯৫টি অসাধারণ গান সংকলিত হয়েছে। প্রকাশের সাথে সাথেই এটি কেবল সাধারণ শ্রোতা বা সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছেই নয়, বরং সেকালের শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীত সাধকদের কাছেও এক অনন্য সুরের নির্দেশিকা হিসেবে সমাদৃত হয়।

২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও ভাববস্তু

‘গানের মালা’ গ্রন্থটি নজরুলের বহুমাত্রিক সুর-ভাবনার এক উজ্জ্বল দলিল। এতে কোনো নির্দিষ্ট একটি ঘরানার গান নয়, বরং শ্যামাসঙ্গীত, স্বদেশী উদ্দীপনা, প্রকৃতি ও বর্ষার গান, গজল, রোমান্টিক বিরহগীতি এবং প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সুর-সংমিশ্রণে রচিত বিচিত্র গান স্থান পেয়েছে।

ক) শ্যামাসঙ্গীত ও ভক্তিমূলক সুরধারা

নজরুলের রচিত শ্যামাসঙ্গীত বাংলা ভক্তিগীতির ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ‘গানের মালা’য় স্থান পাওয়া ‘শ্মশান কালীর নাম শুনে রে’, ‘মহাকালের কোলে এসে গৌরী’, ‘দেখে যা রে রুদ্রাণী মা’, ‘তোমার পায়ে কে পরালো মুণ্ডমালা’, ‘দশ হাতে ঐ দশ দিকে মা’ এবং ‘মা এসেছে মা এসেছে’ গানগুলোতে কবির ভক্তিপ্রবণ অন্তর ও তান্ত্রিক-পৌরাণিক চেতনার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে।

খ) স্বদেশী চেতনা ও নবজাগরণী মার্চ-সংগীত

পরাধীন ভারতে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে হুঙ্কার নজরুল তাঁর কবিতায় দিতেন, গানের সুরের মাধ্যমেও সেই একই আগুন জ্বালিয়েছিলেন। ‘জননী মোর জন্মভূমি’, ‘বীরদল আগে চল্’, ‘চল্ রে চপল তরুণ দল বাঁধন হারা’, ‘শঙ্কাশূন্য লক্ষকণ্ঠে বাজিছে শঙ্খ ঐ’ এবং ‘জাগো দুস্তর পথের নব যাত্রী’ গানগুলো পরাধীন দেশের যুবসমাজকে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মবলিদানে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

গ) আরবী-ফারসী মেজাজ ও ভৌগোলিক রূপক

নজরুল গানে দূরদেশী আবহ ও ভৌগোলিক রূপক ব্যবহারে ছিলেন এক অনন্য জাদুকর। এই গ্রন্থে সংকলিত ‘দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি’ এবং ‘মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে’ গান দুটি বাংলা সুগম সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরন্তন ক্ল্যাসিক হিসেবে স্বীকৃত। মিশরীয় কিংবা দূর দ্বীপের আবহকে বাংলা গানের লয় ও তালের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার এই নৈপুণ্য অতুলনীয়।

ঘ) বিরহ, গজল ও রোমান্টিকতার সুরম্য রূপ

নজরুলের রোমান্টিক আধুনিক গান ও গজলগুলোতে বিরহের যে করুণ সুর বাজে, তা পাঠক ও শ্রোতার হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়’, ‘ফিরে ফিরে কেন তারই স্মৃতি’, ‘কলঙ্ক আর জোৎস্নায় মেশা তুমি সুন্দর চাঁদ’, ‘আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে’ কিংবা ‘ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি’ গানগুলোতে কবির স্পর্শকাতর প্রেমিক সত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে।

ঙ) প্রকৃতি ও ঋতু বন্দনা

বাংলার ষড়ঋতু, বিশেষ করে বর্ষা ও বসন্ত নজরুলের সুরের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ‘বাদলা মেঘের বাদল তালে ময়ূর নাচে’, ‘বরষা ঐ এল বরষ্য ঝরে বারি গগনে ঝুরুঝুরু’, ‘এল ঐ বনাস্তে পাগল বসন্ত’, এবং ‘এল এল রে বৈশাখী ঝড়’ গানগুলোতে কবি প্রকৃতির উদ্দাম রূপ ও সৌন্দর্যকে ছন্দের ঝংকারে ফুটিয়ে তুলেছেন।

৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব

‘গানের মালা’ কেবল একটি গানের বই ছিল না; এটি তৎকালীন গ্রামোফোন রেকর্ডে গাওয়া নজরুলের জনপ্রিয় গানগুলোকে গ্রন্থাকারে স্থায়ী রূপ দেওয়ার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। তৎকালীন সময়ে কে মল্লিক, ইন্দুবালা, আঙুরবালা, শচীন দেববর্মন, কমলা ঝরিয়া এবং কানন দেবীর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের কণ্ঠে ‘গানের মালা’র বহু গান রেকর্ড হয়ে বাঙালি ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল।
সুর ও বাণীর বিচারে ‘গানের মালা’ নজরুলগীতির অন্যতম মৌলিক আকর-গ্রন্থ হিসেবে আজীবন গবেষক ও গায়কদের কাছে এক অপরিহার্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

‘গানের মালা’ (১৯৩৪) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র

(মূল গ্রন্থে মোট ৯৫টি সুনির্দিষ্ট গান সংকলিত রয়েছে। প্রদত্ত তালিকা থেকে অনাবশ্যক ইংরেজি উচ্চারণ বাদ দিয়ে এবং পূর্বের তালিকায় থাকা পুনরাবৃত্তি সংশোধন করে সম্পূর্ণ ৯৫টি গানের নির্ভুল নির্ঘণ্ট নিচে দেওয়া হলো:)
  1. শ্মশান কালীর নাম শুনে রে
  2. মহাকালের কোলে এসে গৌরী
  3. দেখে যা রে রুদ্রাণী মা
  4. মাতলো গগন অঙ্গনে ঐ
  5. নাচে রে মোর কালো মেয়ে
  6. তোমার পায়ে কে পরালো মুণ্ডমালা
  7. জননী মোর জন্মভূমি
  8. বীরদল আগে চল্
  9. চল্ রে চপল তরুণ দল বাঁধন হারা
  10. শঙ্কাশূন্য লক্ষকণ্ঠে বাজিছে শঙ্খ ঐ
  11. দোলে প্রাণের কোলে প্রভুর নামের মালা
  12. শুভ্র সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল
  13. দূর প্রবাসে প্রাণ কাঁদে আজ
  14. এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী
  15. কে দুরন্ত বাজাও ঝড়ের ব্যাকুল বাঁশি
  16. বাদলা মেঘের বাদল তালে ময়ূর নাচে
  17. তোমার হাতের সোনার রাখি
  18. কোয়েলা কুহু কুহু ডাকে
  19. আমি অলস উদাস আনমনা
  20. মেঘ মেদুর গগন কাঁদে হুতাশ পরন
  21. স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণা এস মালবিকা
  22. আমি ময়নামতীর শাড়ি দেবো
  23. বরষা ঐ এল বরষ্য ঝরে বারি গগনে ঝুরুঝুরু
  24. তরুণ অশান্ত কে বিরহী
  25. মুঠি মুঠি আবীর ও কে কাননে ছড়ায়
  26. মদির স্বপনে মম বন ভবনে
  27. আঁখি তোলো দানো করুণা
  28. যবে সন্ধ্যাবেলায় প্রিয় তুলসী তলায়
  29. আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে
  30. মনের রঙ লেগেছে বনের পলাশ
  31. দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি
  32. বকুল বনের পাখি ডাকিয়া আর
  33. মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে
  34. চম্পা পারুল যুথী টগর চামেলি
  35. নিশি না পোহাতে যেয়ো না যেয়ো না
  36. তব যাবার বেলা বলে যাও
  37. বল্লরী ভুজ বন্ধন খোলো
  38. বল্ সখি বল্ ওরে সরে যেতে বল্
  39. বল্ রে তোরা বল্ ওরে ও আকাশ-ভরা তারা
  40. নিরুদ্দেশের পথে আমি হারিয়ে যদি যাই
  41. কার মঞ্জীর রিনিঝিনি বাজে
  42. আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে
  43. প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই
  44. ঝরাফুল বিছানো পথে এস
  45. ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি
  46. অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত দেহা
  47. না-ই পরিলে নোটন-খোঁপায়
  48. আধো আধো বোল
  49. আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি
  50. জাগো জাগো শঙ্খ চক্র গদা পদ্মধারী
  51. লুকোচুরি খেলতে হরি হার মেনেছে
  52. খর রৌদ্রের হোমানল জ্বালি
  53. শ্যামা তন্বী আমি মেঘ বরণা
  54. মম আগমনে বাজে আগমনীর সানাই
  55. বুনো ফুলের করুণ সুবাস ঝুরে
  56. উত্তরীয় লুটায় আমার
  57. এল শ্যামল কিশোর
  58. এল এল রে বৈশাখী ঝড়
  59. ঘুমাও ঘুমাও দেখিতে এসেছি
  60. কলঙ্ক আর জোৎস্নায় মেশা তুমি সুন্দর চাঁদ
  61. শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয়
  62. তুমি ভোরের শিশির রাতের নয়ন পাতে
  63. রাত্রি শেষের যাত্রী আমি
  64. ফুলের মতন ফুল্ল মুখে
  65. ফিরে ফিরে কেন তারই স্মৃতি
  66. আঁধার রাতের তিমির দুলে আমার সামনে
  67. দশ হাতে ঐ দশ দিকে মা
  68. মা এসেছে মা এসেছে
  69. ঐ কাজল কালো চোখ
  70. করুণ কেন অরুণ আঁখি
  71. এত জল ও কাজল চোখে
  72. আসে বসন্ত ফুলবনে
  73. দুরন্ত বায়ু পুরবইয়াঁ
  74. ও কালো বউ
  75. আগের মত আমের ডালে বোল ধরেছে
  76. তোর রূপে সই গাহন করে
  77. ঝড় ঝঞ্ঝায় ওড়ে নিশান ঘন
  78. আমার প্রাণের দ্বারে ডাক দিয়ে
  79. এল ঐ বনাস্তে পাগল বসন্ত
  80. সহসা কি গোল বাঁধালো পাপিয়া আর পিকে
  81. চাঁদের দেশের পথ ভোলা ফুল
  82. রঙ্গিলা আপনি রাধা
  83. কুমকুম আবির ফাগের
  84. দাও শৌর্য দাও ধৈর্য হে উদার নাথ
  85. এল ফুল দোল ওরে
  86. যাবার বেলায় ফেলে যেয়ো একটি খোঁপার ফুল
  87. জাগো দুস্তর পথের নব যাত্রী
  88. ডেকো না আর দূরের প্রিয়া
  89. ভেঙো না ভেঙো না ধ্যান
  90. যাহা কিছু মম আছে প্রিয়তম
  91. মোর বুক ভরা ছিল আশা
  92. বনে মোর ফুল ঝরার বেলা
  93. মিলন রাতের মালা হব তোমার অলকে
  94. যায় ঝিল্মিল্ ঢেউ তুলে
  95. কাজরী গাহিয়া চল গোপ ললনা
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত