বাংলা সুরের আকাশে বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক ছিল কাজী নজরুল ইসলামের অভূতপূর্ব সাঙ্গীতিক সৃষ্টির এক স্বর্ণযুগ। গ্রামোফোন রেকর্ড, রেডিও ও মঞ্চনাটকের মধ্য দিয়ে কবির গান যখন ঘরে ঘরে বঙ্গীয় শ্রোতাদের মুগ্ধ করছিল, ঠিক তখনই ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় সঙ্গীতগ্রন্থ ‘গীতি শতদল’। শতদল বা একশত পাপড়ির পদ্ম যেমন তার সুরভি ও সৌন্দর্যে অনন্য, তেমনই বিভিন্ন ভাব, রস ও রাগের একশত এক সুরপাপড়ির ডালি নিয়ে নজরুলের এই কাব্য-সঙ্গীতের সৃষ্টি।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
‘গীতি শতদল’ গ্রন্থটি ১৯৩৪ সালের এপ্রিল মাসে (বৈশাখ, ১৩৪১ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বিখ্যাত ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে প্রকাশিত হয়।
- গ্রন্থ কাঠামো: ৮ + ১০৪ পৃষ্ঠা
- মূল্য: দেড় টাকা (১ টাকা ৮ আনা)
- প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কলকাতা
গ্রন্থটির প্রারম্ভে কবি নজরুল ‘দুটি কথা’ শিরোনামে একটি আন্তরিক ভূমিকা সংযোজন করেছিলেন। সেই ভূমিকায় তিনি গ্রামোফোন কোম্পানি, রেডিও এবং সহকর্মী সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিখেছিলেন:
“‘গীতিশতদলে’র সমস্ত গানগুলিই গ্রামোফোন ও স্বদেশী মেগাফোন কোম্পানীর রেকর্ডে রেখাবদ্ধ হইয়া গিয়াছে। আমার বহু গীতি-শিল্পী বন্ধুর কল্যাণে ‘রেডিও’ প্রভৃতিতে গীত হওয়ায় এই গানগুলি ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এই অবসরে তাঁহাদের সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি।… আমার বুলবুল প্রভৃতি গানের বইয়ের মত “গীতিশতদল”-ও সকলকে আকর্ষণে সমর্থ হইলে নিজেকে ধন্য মনে করিব।”
কবির এই উক্তি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বই আকারে আত্মপ্রকাশ করার পূর্বেই এই সংকলনের গানগুলো গ্রামোফোন রেকর্ড এবং তৎকালীন রেডিওর মাধ্যমে বোদ্ধা ও সাধারণ শ্রোতামহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ
‘গীতি শতদল’ কেবল প্রেমের গানের সংকলন নয়; এতে নজরুলীয় সঙ্গীতধারার প্রায় প্রতিটি মেজাজ ও রূপ ফুটে উঠেছে। কবি এতে প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ, বৈষ্ণব কীর্তন, শাক্ত পদাবলী, ইসলামী জাগরণ এবং কৌতুকাশ্রয়ী রম্যগীতিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন।
ক) প্রকৃতি, ঋতুরূপ ও রোমান্টিক ভাবালুতা
প্রকৃতির বিচিত্র রূপ এবং বিরহী হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশের ক্ষেত্রে নজরুলের ছন্দময় শব্দচয়ন এই গ্রন্থে অনন্য রূপ পেয়েছে। ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’, ‘পলাশ ফুলের মউ পিয়ে’, ‘এস বসন্তের রাজা হে আমার’, ‘ঘুমায়েছে ফুল পথের ধুলায়’ কিংবা ‘চাঁদের পিয়ালাতে আজি’ গানগুলোতে কবি রূপক ও অলংকারের এক মায়াবী জগত রচনা করেছেন। প্রকৃতি ও মানুষের অনুভূতির এমন মেলবন্ধন বাংলা গানে বিরল।
খ) ব্রজলীলা, কীর্তন ও কৃষ্ণভক্তি
‘গীতি শতদল’-এর একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে বৈষ্ণব ভাবধারার কীর্তন ও কৃষ্ণপ্রীতির রসঘন পদাবলী। ‘চির কিশোর মুরলীধর’, ‘আজি নন্দ দুলালের সাথে’, ‘আমার নয়নে কৃষ্ণ’, ‘মোর মাধব শূন্য মাধবী কুঞ্জে’, ‘ও তুই যাস্নে রাই কিশোরী’ এবং ‘ব্রজের দুলাল ব্রজে আবার’ গানগুলোতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, ব্রজধামের বিরহ এবং ভক্তির গভীরতা চিরায়ত রূপ লাভ করেছে।
গ) শাক্তসঙ্গীত ও মায়ের আবাহন
দেবী দুর্গা ও মহাকালীকে উদ্দেশ্য করে নজরুলের ব্যাকুল আত্মনিবেদন এই গ্রন্থেও উজ্জ্বল। ‘অসুর বাড়ির ফেরৎ এ মা’ এবং ‘জাগো যোগমায়া জাগো মৃন্ময়ী’ গান দুটিতে পৌরাণিক পটভূমির পাশাপাশি মাটির মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করার এক প্রচ্ছন্ন আকুতি প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘ) চেতনার জাগরণী ও ইসলামী মেজাজ
ইসলামী সমাজ ও সংস্কৃতিকে সুরের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলার প্রয়াসে সংকলিত ‘জাগো জাগো রে মুসাফির’ গানটি নজরুলের এক কালজয়ী সৃষ্টি। অলসতা ও অতীতে বিভোর থাকা জাতিকে নতুন ভোরে জেগে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন কবি এই সুরের তরঙ্গে।
ঙ) রম্যগীতি ও হাস্যরসাত্মক রচনা
বিদ্রোহ ও বিরহের পাশাপাশি নজরুলের যে এক নির্মল প্রফুল্ল মন ছিল, তার প্রমাণ মেলে এই কাব্যের শেষদিকের কয়েকটিতে। ‘ওরে হুলোরে তুই রাত বিরেতে’, ‘চায়ের পিয়াসী পিপাসিত চিত আমরা চাতক দল’, কিংবা ‘গিন্নির ভাই গান গাহে’ গানগুলোতে হাস্যরস, সামাজিক চটুলতা ও রম্য ভাবধারা ফুটে উঠেছে যা শ্রোতাদের আনন্দ জোগায়।
৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও নজরুল-চর্চায় অবস্থান
‘গীতি শতদল’ প্রকাশ কালক্রমে বাংলা সুগম ও সুশীল সঙ্গীতের পথকে আরও প্রশস্ত করেছিল। তৎকালীন গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেডিওতে গাওয়া গানগুলোর সঠিক পাঠ সংরক্ষণে এই বইটির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। নজরুলগীতির বিশুদ্ধ সুর, ছন্দ ও বাণী অনুধাবনের জন্য গবেষক, শিল্পী ও সাধারণ শ্রোতাদের কাছে ‘গীতি শতদল’ আজও এক অমূল্য সম্পদ।
‘গীতি শতদল’ (১৯৩৪) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার সুবিধার্থে মূল গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ৯১টি গানের রোমান প্রতিলিপি ও অনাবশ্যক সংকেত বাদ দিয়ে পরিমার্জিত সূচিপত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো:)
- শুকনো পাতার নূপুর পায়ে
- চমকে চমকে ধীর ভীরু পায়
- ছন্দের বন্যা হরিণী অরণ্যা
- পলাশ ফুলের মউ পিয়ে
- এস বসন্তের রাজা হে আমার
- তুমি নন্দন পথ ভোলা
- তোমার ফুলের মতন মন
- হেসে হেসে কল্সি নাচাইয়া
- ঘুমায়েছে ফুল পথের ধুলায়
- গত রজনীর কথা পড়ে মনে
- পলাশ ফুলের গেলাস ভরি
- রহি রহি কেন আজো
- পিউ পিউ বোলে পাপিয়া
- চাঁদের পিয়ালাতে আজি
- এস শারদ প্রাতের পথিক
- মালঞ্চে আজ কাহার যাওয়া আসা
- সবুজ শোভার ঢেউ খেলে যায়
- আমার দেওয়া ব্যথা ভোলা
- হুল ফুটিয়ে গেলে শুধু
- সকরুণ নয়নে চাহে
- বাজিছে বাঁশির কার
- বন হরিণীর তব বাঁকা আঁখির
- রেশমি চূড়ির তালে
- সেই পুরানো সুরে আবার
- ধীরে যায় ফিরে ফিরে চায়
- পিয়াসী প্রাণ তারে চায়
- বেলা পড়ে এল
- এল ফুলের মহলে ভোমরা
- ফিরে ফিরে দ্বারে আসে যায়
- আজও ফোটেনি কুঞ্জে
- পলাশ মঞ্জরি পরায়ে দে লো
- এ ঘোর শ্রাবণ নিশি
- দিও ফুলদল বিছায়ে
- অবুঝ মোর আঁখি বারি
- উচাটন মন ঘরে রয় না
- ফিরে গেছে সই
- ছাড় ছাড় আঁচল বঁধু
- কুল রাখ না রাখ
- গোধূলির রং ছড়ালে
- ফিরিয়া এস এস হে
- আঁধি ঘুম ঘুম
- সেদিনো প্রভাতে
- জাগো জাগো রে মুসাফির
- কত জনম যাবে
- হায় ঝরে যায়
- এ কোথায় আসিলে হায়
- ভুল করে আসিয়াছি
- ভোলো প্রিয় ভোলো ভোলো
- আমি যেদিন রইব না গো
- এলে যে গো চির সাথী
- ও তুই যাস্নে রাই কিশোরী
- দুঃখ ক্লেশ শোক
- ভোলো অতীত স্মৃতি
- চির কিশোর মুরলীধর
- সাগর আমায় ডাক দিয়েছে
- ভালোবেসে অবশেষে
- এস নূপুর বাজাইয়া
- বাজিয়ে বাঁশি মনের বনে
- বিজন গোঠে কে রাখাল
- আজি নন্দ দুলালের সাথে
- শোনো লো বাঁশিতে
- মণি মঞ্জীর বাজে
- ফিরে যা সখি ফিরে যা ঘরে
- আনন্দ দুলালী ব্রজবালার সনে
- গুঞ্জ মালা গলে
- নাচে ঐ আনন্দে
- তোমারে কি দিয়া পূজি
- আমার নয়নে কৃষ্ণ
- মন লহ নিতি নাম
- তোমার সৃষ্টি মাঝে হরি
- দাও দাও দরশন
- মোর মাধব শূন্য মাধবী কুঞ্জে
- ব্রজের দুলাল ব্রজে আবার
- সখি যায়নি তো শ্যাম মথুরায়
- নমো নটনাথ
- ভবের এই পাশা খেলায়
- ভুবনে ভুবনে আজি
- অসুর বাড়ির ফেরৎ এ মা
- আজি প্রথম মাধবী ফুটিল কুঞ্জে
- জাগো যোগমায়া জাগো মৃন্ময়ী
- হোরির রঙ লাগে
- বহু পথে বৃথা ফিরিয়াছি প্রভু
- জাগো জাগো নব আলোকে
- নবীন বসন্তের রানী তুমি
- আজি মিলন বাসর
- ওরে হুলোরে তুই রাত বিরেতে
- নিয়ে কাদা মাটির তাল
- আজকে হোরি ও নাগরী
- আচ লাচনের লেগেচে যে গাঁদি
- চায়ের পিয়াসী পিপাসিত চিত আমরা চাতক দল
- গিন্নির ভাই গান গাহে



![জাতীয় শিক্ষা [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় শিক্ষা [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/জাতীয়-শিক্ষা-1-1024x655.jpg)















