Editor's Choice

বাংলা গীতিসাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বুলবুল’ (১ম খণ্ড, ১৯২৮) কেবল একটি গানের সংকলন নয়; এটি বাংলা সুগম সঙ্গীত ও সুকোমল গজলের জগতে এক অভূতপূর্ব সুর বিপ্লবের সূচনাপত্র। নজরুল রচিত ও প্রকাশিত গীতিগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বুলবুল’ ছিল গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর প্রথম একক সঙ্গীতসংগ্রহ। ১৯২০-এর দশকের শেষভাগে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি বাংলা কবিতার প্রথাগত কাঠামো চূর্ণ করে সুর, বাণী ও প্রাচ্য-প্রতীচ্যের রাগ-তালের এমন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিল, যা বাঙালি সমাজকে ‘নজরুলগীতি’র মায়াবী মোহে চিরকালের জন্য আচ্ছন্ন করে ফেলে।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও উৎসর্গ

‘বুলবুল’ গীতিগ্রন্থটি ১৯২৮ সালের ১৫ নভেম্বর (১৩৩৫ বঙ্গাব্দের আশ্বিন/কার্তিক) কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ডি এম লাইব্রেরি’ (৬১ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট) থেকে ১ম সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
  • প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কলকাতা।
  • মূল্য: সাধারণ সংস্করণের মূল্য ছিল ১ (এক) টাকা এবং বিশেষ রাজ সংস্করণের মূল্য ছিল ১ টাকা ৪ আনা (পাঁচ সিকা)।
  • উৎসর্গ: কবি গ্রন্থটি তাঁর অন্যতম প্রিয় সুরসঙ্গী, বিশিষ্ট সঙ্গীতসাধক ও বরেণ্য সুরশিল্পী দিলীপকুমার রায়-কে পরম শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করেছিলেন।
প্রকাশের সাথে সাথেই গ্রন্থটি সাধারণ সঙ্গীতপ্রেমী থেকে শুরু করে তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের মাঝে নজিরবিহীন উন্মাদনা সৃষ্টি করে। বইটির চাহিদা এতই বেশি ছিল যে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে, ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসেই এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়।

২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও ভাববস্তু

‘বুলবুল’ কাব্যাশ্রয়ী সঙ্গীতগ্রন্থে নজরুল যে সুরের বৈচিত্র্য উপহার দিয়েছিলেন, তা তৎকালীন বাঙালি শ্রোতার জন্য ছিল এক রোমাঞ্চকর নতুন অভিজ্ঞতা।

ক) বাংলা গজলের স্বর্ণযুগ ও প্রবর্তন

‘বুলবুল’ গ্রন্থের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান হলো বাংলা ভাষায় পারসী সুরাশ্রিত গজলের স্থায়ী প্রবর্তন। নজরুলের পূর্বে বাংলা ভাষায় এমন সুকোমল, দ্রোহ, নমনীয়তা ও বিরহমিশ্রিত গজল গায়কী অচিন্তনীয় ছিল। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘কে বিদেশী বন উদাসী’, ‘পরদেশী বঁধুয়া এলে কি এতদিনে’, কিংবা ‘বসিয়া বিজনে কেন একা মনে’—এই গানগুলো বাংলা গজলের ইতিহাসে চিরন্তন ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করেছে।

খ) অনুরাগের সূক্ষ্ম প্রকাশ ও বিরহবেদনা

প্রেমের ব্যাকুলতা এবং প্রিয়জনকে হারানোর গভীর আকুতির এক অনুপম আয়না এই সংকলনটি। ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না’, ‘এত জল ও কাজল চোখে’, ‘করুণ কেন অরুণ আঁখি’, ‘কেন আসিলে যদি যাবে চলি’, কিংবা ‘এ আঁখি জল মোছ পিয়া’ গানগুলোতে বিরহী হৃদয়ের বেদনার সুর অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

গ) শাস্ত্রীয় রাগ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন

নজরুল কেবল হালকা মেজাজের গান রচনা করেননি; ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের কঠিন রাগ-রাগিণীকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য সুরের কাঠামোয় নিয়ে এসেছিলেন। ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’, ‘দুরন্ত বায়ু পুরবইয়াঁ’, ‘গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু’, এবং ‘আজি দোল পূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়’ গানগুলোতে প্রকৃতি, ঋতু এবং রাগভিত্তিক সুরের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ ঘটেছে।

৩. সংগীতাঙ্গনে প্রভাব ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

‘বুলবুল’ গ্রন্থে সংকলিত গানগুলো দিয়েই তৎকালীন নতুন অডিও মাধ্যম ‘গ্রামোফোন রেকর্ড’-এ নজরুল-ঝড়ের সূচনা হয়। কে মল্লিক, ইন্দুবালা, আঙুরবালা, আশ্চর্যময়ী দেবী এবং দিলীপকুমার রায়ের কণ্ঠে রেকর্ড হওয়া ‘বুলবুল’-এর গানগুলো মেগাফোন ও এইচএমভি রেকর্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি শ্রোতার ঘরে পৌঁছে যায়।
বাংলা গানের ধারায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাববলয়ের বাইরে এসে কীভাবে সম্পূর্ণ স্বকীয়, বৈচিত্র্যময় এবং যুগান্তকারী সুর সৃষ্টি করা যায়—নজরুল ‘বুলবুল’ সংকলনের মধ্য দিয়েই তা প্রথম সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

‘বুলবুল’ (১ম খণ্ড, ১৯২৮) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র

  1. কেন কাঁদে পরান কী বেদনায়
  2. স্মরণ পারের ওগো প্রেয়ি
  3. শুকাল মিলন মালা আমি তবে যাই
  4. এ নহে বিলাস বন্ধু
  5. মুসাফির মোছ্ এ আঁখি জল
  6. কেন আসিলে যদি যাবে চলি
  7. কেমনে রাখি আঁখি চাপিয়া
  8. কেন আন ফুল ডোর
  9. পুরবের তরুণ অরুণ
  10. নমো যন্ত্রপতি
  11. কোন শরতে পূর্ণিমা চাঁদ
  12. জাগিলে পারুল কি গো
  13. সাজিয়াছ যোগী বল কার লাগি
  14. গহীন রাতে ঘুম কে এলে ভাঙাতে
  15. কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে
  16. গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু
  17. হৃদয় যত নিষেধ হানে
  18. হাজার তারার হার হয়ে গো দুলি
  19. আজি এ কুসুম হার সহি কেমনে
  20. অধীর অম্বরে শুরু গরজন
  21. আজি দোল পূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়
  22. রুমুঝুমু কে এলে নূপুর পায়
  23. আসিলে এ ভাঙা ঘরে কে মোর রাঙা অতিথি
  24. কেন উচাটন মন পরান এমন করে
  25. পরদেশী বঁধুয়া এলে কি এতদিনে
  26. কি হবে জানিয়া বল কেন জল নয়নে
  27. এ আঁখি জল মোছ পিয়া
  28. নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল
  29. কে বিদেশী বন উদাসী
  30. পরান প্রিয় কেন এলে অবেলায়
  31. সখি জাগো রজনী পোহায়
  32. এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো
  33. কেন দিলে এ কাঁটা যদি গো
  34. সখি বলো বঁধুয়ারে নিরজনে
  35. বসিয়া নদীকূলে এলোচুলে
  36. নিশি ভোর হল জাগিয়া
  37. চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না
  38. করুণ কেন অরুণ আঁখি
  39. এত জল ও কাজল চোখে
  40. মৃদুল বায়ে বকুল ছায়ে
  41. আসে বসন্ত ফুলবনে
  42. দুরন্ত বায়ু পুরবইয়াঁ
  43. বাগিচায় বুলবুলি তুই
  44. আমারে চোখ ইশারায়
  45. বসিয়া বিজনে কেন একা মনে
  46. ভুলি কেমনে আজো যে মনে
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত