কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন উর্বর মস্তিষ্কের প্রলয়ঙ্করী কবি বা সুরস্রষ্টাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সুরের মূল কাঠামো ও তার বিশুদ্ধতা রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এক অভিভাবক। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে যখন গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে তাঁর রচিত গানগুলো দাবানলের মতো সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন একটি গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়—বিভিন্ন শিল্পী ও শিক্ষক গান গাইতে গিয়ে সুর ও তাল নিজেদের মতো বদলে ফেলছিলেন। এই সুর-বিকৃতি রোধ করা এবং নিজ রচিত গানের মূল রাগ-রূপ ও তালকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার তাগিদ থেকে নজরুল উদ্যোগী হন স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশের। এই ঐতিহাসিক প্রয়াসেরই অন্যতম অমর সৃষ্টি হলো ১৯৩৪ সালে (১৩৪১ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত স্বরলিপি ও গীতি-সংকলন ‘সুরমুকুর’।
Table of Contents
Toggleগ্রন্থপরিচয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
গ্রামোফোন যুগ ও সুরের বিকৃতি রোধে নজরুলের পদক্ষেপ
‘সুরমুকুর’: নামকরণের তাৎপর্য ও দর্পণ-ভাবনা
সুরের প্রতিবিম্ব
সংকলনের গীতিশৈলী, রাগসংগীত ও স্বরলিপির বৈশিষ্ট্য
১. উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় রাগের সহজবোধ্য সংরক্ষণ
২. গান ও স্বরলিপির যুগলবন্দি
‘সুরমুকুর’ (১৯৩৪) সংকলনের ২১টি গানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
১. অরুণ-কান্তি কে গো যোগী-বর
- সুর ও রাগ: ভৈরবী / যোগিয়া
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: প্রভাতী আলোর রূপে পরম প্রিয়জনের আগমন ও ভক্তিভাব।
২. আজ নিশীথে কোন পরবাসী
- সুর ও রাগ: দরবারি কানাড়া / কাফি
- তাল: কাওয়ালি
- ভাবমূল: নিঝুম রাতের নিঃসঙ্গতা ও দূর পরবাসীর জন্য বিরহ ব্যাকুলতা।
৩. আজো কাঁদে কাননে কোয়েলিয়া
- সুর ও রাগ: ঝিঁঝিট / পিলু
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: বসন্তের বনে কোকিলের ডাকে প্রিয়হারানো হৃদয়ের হাহাকার।
৪. আধো আধো বল
- সুর ও রাগ: খাম্বাজ
- তাল: কাহারবা
- ভাবমূল: চপল প্রেম ও প্রিয়তমের মধুর মুখের কথা শোনার আকুলতা।
৫. আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
- সুর ও রাগ: মিশ্র ভৈরবী
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: অন্তরের গহীনে থাকা পরম প্রিয় ও অধরা সুহৃদকে খোঁজার বেদনা।
৬. আমার কালো মেঘের দল
- সুর ও রাগ: মেঘ / মেঘমল্লার
- তাল: রূপক / দাদরা
- ভাবমূল: বর্ষার কালো মেঘের সাথে মনের উদাস অনুভূতির মেলবন্ধন।
৭. আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী
- সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি-কাফি
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: জীবন-তরী কূলে পৌঁছানোর রূপকে আত্মানুসন্ধান।
৮. আসে বসন্ত ফুল-বনে
- সুর ও রাগ: পিলু-পাহাড়ি
- তাল: কাহারবা
- ভাবমূল: প্রকৃতিতে বসন্তের আগমন এবং নবীন রূপের আনন্দোচ্ছ্বাস।
৯. উছল নদী থির হলো
- সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি
- তাল: কাহারবা
- ভাবমূল: বহমান নদীর স্থির হয়ে যাওয়া ও থমকে দাঁড়ানো মনের ছবি।
১০. এ কোন্ খেয়াল খেলা
- সুর ও রাগ: মালকোশ / কেদার
- তাল: ঝাঁপতাল
- ভাবমূল: স্রষ্টার সৃষ্টিলীলা ও জীবনের বিচিত্র খেয়াল নিয়ে প্রশ্ন।
১১. কে নিবি গো ওজন ক’রে
- সুর ও রাগ: খাম্বাজ-গজল
- তাল: কাওয়ালি
- ভাবমূল: প্রেমের হাটে অমূল্য ভালোবাসা বিক্রি করার চমৎকার রূপক গীতি।
১২. গহীন রাতে কে গো বাজে
- সুর ও রাগ: বাঘেশ্রী / পিলু
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: গভীর রাতে ভেসে আসা রহস্যময় বংশীধ্বনি ও মনের তোলপাড়।
১৩. জাগে নৈশ নিঃশব্দতা
- সুর ও রাগ: বাঘেশ্রী
- তাল: কাওয়ালি
- ভাবমূল: রাতের নীরবতার মাঝে আত্মমগ্নতা ও প্রিয়জনের স্মৃতি।
১৪. দূর দীপবর্তিকা
- সুর ও রাগ: ছায়ানট
- তাল: তিতাল
- ভাবমূল: দূর দিগন্তে জ্বলে থাকা আশার প্রদীপের প্রতি ব্যাকুল দৃষ্টি।
১৫. নয়ন ভরে দেখব তোরে
- সুর ও রাগ: কাফি
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: প্রিয়জনকে চোখের সামনে বসিয়ে পরম মমতায় দেখার অনন্ত তৃষ্ণা।
১৬. পরদেশী বঁধু রে
- সুর ও রাগ: পিলু-গজল
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: প্রবাসী প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসার ব্যাকুল আকুতি।
১৭. পরানো-প্রিয় মোর
- সুর ও রাগ: যোগিয়া
- তাল: কাহারবা
- ভাবমূল: হৃদয়ের গভীরতম স্থানে থাকা ভালোবাসার মানুষের প্রতি সমর্পণ।
১৮. ফিরে ফিরে চায় কে গো
- সুর ও রাগ: বেহাগ / তিলং
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: যাওয়ার পথে বারবার ফিরে তাকানোর মুগ্ধ রূপ বর্ণনা।
১৯. বোল গো বোল কোয়েলিয়া
- সুর ও রাগ: পিলু
- তাল: কাহারবা
- ভাবমূল: কোকিলের কাছে প্রিয়জনের বারতার জন্য আকুল প্রশ্ন।
২০. মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
- সুর ও রাগ: ভৈরবী
- তাল: দাদরা
- ভাবমূল: স্বপ্নের আবেশে প্রিয়তমের আগমন এবং বাস্তব জেগে ওঠার বেদনা।
২১. শাওন-রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
- সুর ও রাগ: মেঘমল্লার / কাফি
- তাল: কাওয়ালি
- ভাবমূল: বর্ষার রাতে স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠা পুরনো ভালোবাসার সুর।
বাংলা সংগীতে ‘সুরমুকুর’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মূল্যায়ন
কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতজগতে ‘সুরমুকুর’ একটি দিকনির্দেশক গ্রন্থ। এটি কেবল গান গাওয়ার গাইড বই ছিল না, বরং বাংলা কাব্যসংগীতকে ব্যাকরণগত শৃঙ্খলায় বাঁধার একটি বৈজ্ঞানিক প্রয়াস ছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন তাঁর গানগুলোকে সংরক্ষণ করার জন্য স্বরলিপি সমিতি গঠন করেছিলেন এবং স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, নজরুলও ‘সুরমুকুর’-এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে তাঁর গান কেবল তাৎক্ষণিক আবেগের ফসল নয়; তা রাগসংগীতের সঠিক শাস্ত্রীয় কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা স্থায়ী শিল্পকর্ম।
পরবর্তীকালে নজরুল অ্যাকাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট এবং প্রখ্যাত সংগীত গবেষকরা যখন নজরুলের মূল সুর পুনরুদ্ধার ও প্রামাণীকরণ (Authentication) করার কাজ শুরু করেন, তখন এই ‘সুরমুকুর’ গ্রন্থটি তাঁদের সবচেয়ে বড় আইনি ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করেছে।
সংকলনটির একনজরে সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| গ্রন্থের নাম | সুরমুকুর (স্বরলিপি ও গীতি-সংকলন) |
| রচয়িতা | কাজী নজরুল ইসলাম |
| প্রকাশকাল | ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ (জুন / আষাঢ় ১৩৪১ বঙ্গাব্দ) |
| মূল প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা |
| স্বরলিপিকারগণ | কাজী নজরুল ইসলাম, শীতলকান্ত দাস (এস. কে. দাস), অহীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য |
| মোট গান সংখ্যা | ২১টি (পূর্ণাঙ্গ স্বরলিপিসহ) |
| গ্রন্থের ধরন | স্বরলিপিসহ রাগাশ্রিত গীতি-সংকলন |
| মূল উদ্দেশ্য | গানের শুদ্ধ সুর ও রাগ-রূপ সংরক্ষণ এবং সুরের বিকৃতি রোধ করা |
| নামকরণের অর্থ | সুরের দর্পণ বা আয়না (যেখানে সুরের অবিকল রূপ দেখা যায়) |




















