বাংলা কাব্যসংগীতের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি সুরের ভুবনে সমান সহজে মক্কা-মদিনার ভক্তিগীতি থেকে শুরু করে বীরভূমের শাক্ত পীঠস্থানের মেঠো সুরকে একসূত্রে বেঁধেছিলেন। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৪২ সালে কবি নীরব হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কালে তিনি শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। তাঁর রচিত এই কালজয়ী ভক্তিমূলক গানগুলোকে একত্র করে ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় বিখ্যাত গানগ্রন্থ ‘রাঙা জবা’। এটি কেবল একটি গান সংকলন নয়, বরং নজরুলীয় অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মাতৃসাধনা এবং শাক্ত পদাবলীর আধুনিকায়নের এক অনন্য দলিল।
Table of Contents
Toggleপ্রকাশনার প্রেক্ষাপট ও রচনার নেপথ্য
সাধনার পরিবেশ ও গ্রন্থরূপ লাভ
‘রাঙা জবা’: নামকরণের শাক্ত ঐতিহ্য ও প্রতীকী গভীরতা
রক্তজবার রূপকে আত্মনিবেদন
ভাববস্তু ও আধ্যাত্মিক দর্শনের বহুমুখী দিক
১. মাতৃরূপের আরাধনা ও পরম আত্মসমর্পণ
২. রামপ্রসাদী ধারার নবায়ন ও মানবীয় রূপায়ণ
৩. অসাম্প্রদায়িক ভারতীয় দর্শনের জয়গান
‘রাঙা জবা’ সংকলনের অবিস্মরণীয় শ্যামাসঙ্গীতসমূহ
প্রখ্যাত গানগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা ও ভাবসংক্ষেপ:
- “আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলো আলোকময়”:কালী যে কেবল অন্ধকারের প্রতীক নন, তিনি যে কোটি সূর্যের আলোর উৎস—এই পরম সত্যকে নজরুল অত্যন্ত সহজ ও সুন্দর কাব্যিক রূপ দিয়েছেন।
- “বল রে জবা বল / তোরা কোন্ সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল”:জবা ফুলের প্রতি কবির ঈর্ষা ও আকুলতা—কীভাবে সে মায়ের চরণে স্থান পেল, তা নিয়ে এক অনন্য ভক্তিমূলক প্রশ্ন।
- “মা আমার সাধ করেছিস কালী হতে”:দেবী কালীর কৃষ্ণবর্ণ রূপের পেছনের গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে চপল অথচ গভীর সুরে ব্যাখ্যা করেছেন নজরুল।
- “তোর কালো রূপ লুকিয়ে রাখার জায়গা যে নাই মা রে”:বিশ্বচরাচরের প্রতিটি অণুতে যে মায়ের রূপ ছড়িয়ে আছে, সেই অনুভূতির প্রকাশ।
- “মা তোর চরণে জবা হয়ে ফুটে থাকি”:নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে মায়ের পায়ে সঁপে দেওয়ার এক আকুল প্রার্থনা।
- “আমার মায়ের রূপ দেখে যা রে”:বাৎসলে ভরা এক পরম ভক্তের আনন্দের গান, যেখানে মা সর্বশক্তিমান হয়েও সন্তানের কাছে অত্যন্ত মমতাগ্রস্ত।
ভাষা, সুররীতির বৈচিত্র্য ও শাস্ত্রীয় মাধুর্য
শব্দবিন্যাসের সহজতা
বাংলা সংস্কৃতি ও হিন্দু সমাজমানসে ‘রাঙা জবা’-র চিরন্তন প্রভাব
‘রাঙা জবা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পর বাংলা সংগীতে নজরুলকে শাক্ত পদাবলীর শ্রেষ্ঠ আধুনিক রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রখ্যাত শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মৃণাল কান্তি ঘোষ এবং পরবর্তীতে আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুলের এই গানগুলো শ্যামাসঙ্গীতের ইতিহাসকে এক নতুন শিখরে নিয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন তাঁর ‘পূজা’ পর্যায়ে নিগুণ ব্রহ্মের বন্দনা করেছেন, নজরুল ঠিক তেমনি সগুণ মাতৃরূপের উপাসনায় ‘রাঙা জবা’র মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন।
সংকলনটির একনজরে সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| গ্রন্থের নাম | রাঙা জবা |
| রচয়িতা | কাজী নজরুল ইসলাম |
| প্রকাশকাল | ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ |
| মূল প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা |
| গ্রন্থের ধরন | শ্যামাসঙ্গীত ও শাক্ত ভক্তিমূলক গীতি-সংকলন |
| প্রধান উপজীব্য | দেবী কালীর করুণা, মাতৃরূপের আরাধনা, আত্মসমর্পণ ও আত্মনিবেদন |
| উল্লেখযোগ্য সুর/ধারা | রামপ্রসাদী সুর, কীর্তন, ভৈরবী, মালকোষ, কাফি ও খাম্বাজ রাগ |
| সাংস্কৃতিক ভূমিকা | শাক্ত সাহিত্যের বিকাশ ও বাংলা সংগীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার চূড়ান্ত প্রতিফলন |
‘রাঙা জবা’ সংকলনের প্রামাণ্য গানের তালিকা:
১. মাতৃরূপ, মহিমা ও রূপালংকার বিষয়ক গান
- আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলো আলোকময়
- মা আমার সাধ করেছিস কালী হতে
- তোর কালো রূপ লুকিয়ে রাখার জায়গা যে নাই মা রে
- আমার মায়ের রূপ দেখে যা রে
- তোরা দেখে যা রূপসী মা কালীর রূপ
- এলো রে শ্যামা মা এলো রে
- মহাকালের কোলে এসে তোরা দেখে যা রে
- কে সাজালো তোরে মা আজ এমন রক্তজবায়
- দেখেছিস কি তোরা মায়ের অভয় রাঙা চরণে
২. ভক্তির ব্যাকুলতা, আত্মসমর্পণ ও আর্তি
- বল রে জবা বল / তোরা কোন্ সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল
- মা তোর চরণে জবা হয়ে ফুটে থাকি
- মা তোর চরণে ঠাঁই দে আমার সব বিসর্জন দিয়ে
- মা গো তুই কেমন মা রে, সন্তানকে কাঁদিয়ে রাখিস
- তোকে ডেকে ডেকে মা গো দিন তো আমার শেষ হলো
- আমায় নিয়ে আর কত খেলা খেলবি মা
- মা মা বলে আর ডাকব না রে
- তুই কি মা মোর দুঃখ বুঝিস, তুই তো জগতের মা
৩. শাক্ত সাধনা, শ্মশান ও আধ্যাত্মিক চেতনার গান
- শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা
- থাক্ রে থাক্ আমার মন, কালী-পদ্মে লীন হয়ে
- সব ঘুচে যায় মায়াপাশ, শ্যামা মায়ের নাম নিলে
- কালী নাম জপ রে মন
- ঘোর অন্ধকার রাতে মা গো তুই জ্বালিস আলো
- ত্যাগের আগুনে জ্বাল রে প্রদীপ, শ্যামা মায়ের পূজায়
- মন রে তুই দেখলি না রে কালী মায়ের রূপের খেলা
৪. মান-অভিমান ও ঘরোয়া সম্পর্কের রামপ্রসাদী গীতি
- সংসার-কারাগারে আমায় বন্দী করলি কেন মা
- মা তোর চরণে জবা হয়ে কান্দি রে রাতদিন
- আমি তোকে মা বলে আর ডাকব না
- আমায় দে মা উমা, দে মা আমার ভয়ের ঝুলি
- ওরে মন, তুই শ্যামা মায়ের নাম নিয়ে কাজ করে যা
- তোরে মা মা বলে ডাকি, তুই তো মা সাড়া দিস না
৫. আগমনী ও বিজয়া পর্বের শাক্ত গীতি
- ওরে ও নতুন মেঘ, নিয়ে চল্ উমার দেশে
- গিরিরাজ, উমা আমার এসেছে গো ঘরে
- উমা এলো রে আমাদের পাড়ায়
- বিজয়ার দিন এলো মা গো, তোকে কেমনে বিদায় দিই
- মা গো আজ বিদায়ের দিনে তোকে কীভাবে ছাড়ি
গ্রন্থভিত্তিক অতিরিক্ত গানের তথ্য





















