Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের ‘সুরলিপি’: শুদ্ধ সুর সংরক্ষণ ও স্বরলিপির অনন্য আলেখ্য

বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে বাংলা গানের ভুবনে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দী সুরস্রষ্টা। গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি, রেডিও ও মঞ্চে তাঁর রচিত গানগুলো প্রতিদিন লক্ষ মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলছিল। তবে জনপ্রিয়তার এই জোয়ারের পেছনে একটি বড় সংকটও দেখা দিয়েছিল—সংগীতশিল্পীদের যথেচ্ছ গায়কি এবং স্বরলিপির অপ্রতুলতার কারণে মূল সুর, রাগ ও তালের বিশুদ্ধতা ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। নিজের গানের সুরের এই বিকৃতি রোধ করা এবং গানগুলোকে ব্যাকরণগতভাবে স্থায়ী রূপ দেওয়ার তাগিদ থেকে ১৯৩৪ সালে (১৩৪১ বঙ্গাব্দ) নজরুল প্রকাশ করেন তাঁর দ্বিতীয় প্রখ্যাত স্বরলিপি গ্রন্থ ‘সুরলিপি’।

একই বছরে প্রকাশিত ‘সুরমুকুর’-এর পরপরই ডি. এম. লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত এই সংকলনটি বাংলা সংগীতে সুর সংরক্ষণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত।

Table of Contents

প্রকাশনার ইতিহাস ও রচনার নেপথ্য

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে (ভাদ্র ১৩৪১ বঙ্গাব্দ) কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘ডি. এম. লাইব্রেরি’ থেকে ‘সুরলিপি’ প্রথম গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ করে।

স্বরলিপিকারদের ভূমিকা ও যৌথ প্রয়াস

কাজী নজরুল ইসলাম নিজে উচ্চাঙ্গ সংগীতের পণ্ডিত হলেও গানের আকারমাত্রিক স্বরলিপি প্রস্তুত করার কাজে তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও স্বরলিপিকার শীতলকান্ত দাস (এস. কে. দাস) এবং ধীরেন্দ্রনাথ দাস। নজরুল নিজে সুরের কাঠামো ও রাগের প্রয়োগ নির্ধারণ করে দিতেন, আর স্বরলিপিকারগণ প্রতিটি গানের স্পন্দন, কোমল ও তীব্র স্বরের অবস্থান এবং তালের মাত্রা সুনিপুণভাবে কাগজে রূপ দিতেন।

গ্রামোফোন রেকর্ড মারফত জনপ্রিয় হওয়া তাঁর বিশেষ ১৮টি কালজয়ী গানকে নির্বাচন করে সেগুলোর শুদ্ধ স্বরলিপি এই গ্রন্থে একত্রিত করা হয়।

‘সুরলিপি’: নামকরণের তাৎপর্য ও নান্দনিক অর্থ

‘সুর’ এবং ‘লিপি’—এই দুই শব্দের সমন্বয়ে সংকলনটির নামকরণ করা হয়েছে। ‘লিপি’ শব্দের অর্থ লিখিত দলিল বা বর্ণমালা।

অমূর্ত সুরকে মূর্ত রূপদান

সুর একটি অমূর্ত বা অদৃশ্য শিল্প যা বাতাসে ভেসে মিলিয়ে যায়। কিন্তু সেই সুরকে যখন স্বরলিপির (Notation) সুনির্দিষ্ট সংকেতে লিখে রাখা হয়, তখন তা স্থায়ী ও মূর্ত রূপ লাভ করে। নজরুল এই সংকলনের নাম ‘সুরলিপি’ রেখে এটিই স্পষ্ট করেছিলেন যে, এই গ্রন্থে তাঁর সুরের মূল নির্জ্যাস লিখিতভাবে চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত রইল। সংগীত শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের জন্য বইটি যেন ছিল সুরকে হুবহু পাঠ করার এক লিখিত নির্দেশিকা।

স্বরলিপি গঠন ও সংগীতিক বৈচিত্র্য

‘সুরলিপি’ সংকলনটি কেবল একটি স্বরলিপি গ্রন্থ নয়, এটি নজরুলীয় সুররীতির এক প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যবই। এতে সংকলিত গানগুলোর সংগীতবিন্যাসে কয়েকটি প্রধান দিক ফুটে ওঠে:

১. মার্গীয় সংগীত ও রাগের শৃঙ্খলা

এই গ্রন্থে সংকলিত প্রতিটি গানের শুরুতে রাগ ও তালের স্পষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়েছে। রাগ ভৈরবী, পিলু, খাম্বাজ, কাফি, বেহাগ, মেঘমল্লার এবং পাহাড়ি রাগের সংমিশ্রণে তৈরি গানগুলোর স্বরলিপি অত্যন্ত যত্ন সহকারে লিপিবদ্ধ করা হয়।

২. বাণী ও স্বরলিপির নিখুঁত সমন্বয়

বইটিতে গানের প্রতিটি চরণ এবং তার নিচে বা পাশে স্বরলিপি সাজানো হয়েছে। এর ফলে কোন শব্দের কোন অক্ষরে কতটা টান দিতে হবে, কোথায় স্পর্শস্বর (Kan Swara) থাকবে এবং তালের ফাঁক ও সম কোথায় পড়বে—তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

‘সুরলিপি’ (১৯৩৪) সংকলনের গানসমূহের পূর্ণাঙ্গ তালিকা

‘সুরলিপি’ গ্রন্থে মূল সংস্করণে সংকলিত কালজয়ী গানগুলোর প্রামাণ্য তালিকা রাগ, তাল ও মূল ভাববিন্যাসসহ নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
  • সুর ও রাগ: ভৈরবী (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: স্বপ্নের আবেশে প্রিয়তমের আগমন ও বিরহী মনের আকুল আকুতি।
২. শাওন-রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
  • সুর ও রাগ: মেঘমল্লার / কাফি (কাওয়ালি তাল)
  • ভাববস্তু: শ্রাবণের অঝোর ধারায় পুরনো স্মৃতির তোলপাড় ও সুদূর প্রিয়জনের কথা স্মরণ।
৩. আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী
  • সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি-কাফি (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: জীবননদীর বাঁকে কূল হারানোর ব্যাকুলতা ও গভীর আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ।
৪. আসে বসন্ত ফুল-বনে
  • সুর ও রাগ: পিলু-পাহাড়ি (কাহারবা তাল)
  • ভাববস্তু: প্রকৃতির বুকে বসন্তের আগমনে ঋতুরাজের রূপ বন্দনা ও নবীন রূপের আনন্দ।
৫. পরদেশী বঁধু রে
  • সুর ও রাগ: পিলু-গজল (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: প্রবাসে থাকা প্রিয়তমকে ফিরে আসার ব্যাকুল আমন্ত্রণ ও বিরহ বেদনা।
৬. উছল নদী থির হলো
  • সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি (কাহারবা তাল)
  • ভাববস্তু: নদীর বহমানতার রূপকে মানুষের মনের স্তব্ধতা ও ভেতরের আকুলতা।
৭. আধো আধো বল
  • সুর ও রাগ: খাম্বাজ (কাহারবা তাল)
  • ভাববস্তু: রূপসীর আধো-ফোটা কথার মধুরতা ও চঞ্চল প্রণয়ের প্রকাশ।
৮. কে নিবি গো ওজন ক’রে
  • সুর ও রাগ: খাম্বাজ-গজল (কাওয়ালি তাল)
  • ভাববস্তু: ভালোবাসার হাটে হৃদয় বিক্রি করার প্রতীকী ও হাস্যরসাত্মক রূপক।
৯. আমার গহিন জলের নদী
  • সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি / লোকসুর (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: নদী ভাঙার সাথে মন ভাঙার চিরন্তন সমান্তরাল দুঃখের চিত্রায়ন।
১০. আজ শ্রাবণ রজনী শেষে
  • সুর ও রাগ: মেঘ / জয়জয়ন্তী (রূপক তাল)
  • ভাববস্তু: বর্ষার শেষ প্রহরে প্রকৃতির নিঃশব্দতা ও একাকী অনুভূতির গভীরতা।
১১. রিমঝিম রিমঝিম ঝরে ভাদরের ধারা
  • সুর ও রাগ: মেঘমল্লার (কাওয়ালি তাল)
  • ভাববস্তু: ভাদ্রের বৃষ্টিতে প্রকৃতির সজীবতা এবং বিরহী হৃদয়ের ব্যাকুলতা।
১২. আমার শ্যামল বরন বাংলা মায়েরে
  • সুর ও রাগ: পিলু-দেশ (কাহারবা তাল)
  • ভাববস্তু: রূপসী বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জন্মভূমির প্রতি পরম ভক্তি।
১৩. একলা বসে আঁধার রাতে
  • সুর ও রাগ: যোগিয়া / ভৈরবী (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: গভীর রাতের জনশূন্যতায় স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা।
১৪. এমনি ঝড়ের রাতে
  • সুর ও রাগ: কাফি / ছায়ানট (তিতাল)
  • ভাববস্তু: ঝোড়ো হাওয়া ও দুর্যোগের রাতে প্রিয়জনের অনুপস্থিতির ভয় ও আকুলতা।
১৫. ওগো রূপসী তোমার রূপের নদী
  • সুর ও রাগ: বেহাগ / পিলু (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: নারীসৌন্দর্যের অমলিন রূপপ্রভা ও রূপকের কাব্যিক আখ্যান।
১৬. তুমি যে অমূল্য নিধি
  • সুর ও রাগ: খাম্বাজ / ভৈরবী (কাহারবা তাল)
  • ভাববস্তু: প্রিয়তমকে জীবনের পরম রত্ন হিসেবে বরণ করে নেওয়ার সুর।
১৭. বসিয়া নির্জনে কী ভাব একক
  • সুর ও রাগ: বাঘেশ্রী (কাওয়ালি তাল)
  • ভাববস্তু: একাকী নিভৃত কোণে নিজের অন্তরের সাথে কথা বলার নিবিড় মানসিক অবস্থা।
১৮. আমার কালো মেঘের দল
  • সুর ও রাগ: মেঘমল্লার (দাদরা তাল)
  • ভাববস্তু: আষাঢ়ের কালো মেঘের সাথে কবির চঞ্চল মনের ভেলায় ভেসে চলা।

বাংলা সংগীতে ‘সুরলিপি’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব

‘সুরলিপি’ কেবল একটি গানের স্বরলিপি সংকলন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে নি; এটি বাংলা সংগীতে শাস্ত্রীয় মেজাজ অক্ষুণ্ন রাখার এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়েছে।

নজরুল সংগীতের প্রামাণিক রূপদান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেভাবে স্বরলিপি সমিতি গঠন করে ‘স্বরবিতান’ প্রকাশের মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতের সুর অক্ষুণ্ন রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন, নজরুলও ‘সুরমুকুর’ ও ‘সুরলিপি’র মাধ্যমে একই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে নজরুল ইনস্টিটিউট ও সংগীত গবেষকগণ যখন নজরুলের মূল সুর পুনরুদ্ধারের কাজে নামেন, তখন এই ‘সুরলিপি’ গ্রন্থটি সবচেয়ে প্রামাণ্য ও নিরপেক্ষ দলিল হিসেবে কাজ করেছে।

সংকলনটির একনজরে সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
গ্রন্থের নামসুরলিপি (স্বরলিপি গ্রন্থ)
রচয়িতাকাজী নজরুল ইসলাম
প্রকাশকাল১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ (সেপ্টেম্বর / ভাদ্র ১৩৪১ বঙ্গাব্দ)
মূল প্রকাশকডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা
স্বরলিপিকারগণকাজী নজরুল ইসলাম, শীতলকান্ত দাস (এস. কে. দাস), ধীরেন্দ্রনাথ দাস
মোট গান সংখ্যা১৮টি (পূর্ণাঙ্গ আকারমাত্রিক স্বরলিপিসহ)
গ্রন্থের ধরনসুর ও স্বরলিপিসহ রাগাশ্রিত গীতি-সংকলন
প্রধান বৈশিষ্ট্যরাগাশ্রিত গজল, ভাটিয়ালি, বর্ষার গান ও প্রণয়গীতির সঠিক স্বরলিপি সংরক্ষণ
সাংস্কৃতিক ভূমিকানজরুলের মূল গানের স্বর ও সুরের বিকৃতি রোধে প্রামাণ্য স্বরলিপি দলিল
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.