Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের ‘সুরমুকুর’: বাংলা কাব্যসংগীতে বিশুদ্ধ সুর ও স্বরলিপির আলেখ্য

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন উর্বর মস্তিষ্কের প্রলয়ঙ্করী কবি বা সুরস্রষ্টাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সুরের মূল কাঠামো ও তার বিশুদ্ধতা রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এক অভিভাবক। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে যখন গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে তাঁর রচিত গানগুলো দাবানলের মতো সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন একটি গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়—বিভিন্ন শিল্পী ও শিক্ষক গান গাইতে গিয়ে সুর ও তাল নিজেদের মতো বদলে ফেলছিলেন। এই সুর-বিকৃতি রোধ করা এবং নিজ রচিত গানের মূল রাগ-রূপ ও তালকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার তাগিদ থেকে নজরুল উদ্যোগী হন স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশের। এই ঐতিহাসিক প্রয়াসেরই অন্যতম অমর সৃষ্টি হলো ১৯৩৪ সালে (১৩৪১ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত স্বরলিপি ও গীতি-সংকলন ‘সুরমুকুর’।

Table of Contents

গ্রন্থপরিচয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে (আষাঢ় ১৩৪১) কলকাতার বিখ্যাত ‘ডি. এম. লাইব্রেরি’ থেকে ‘সুরমুকুর’ প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটিতে সংকলিত গানগুলোর স্বরলিপি তৈরিতে কবির পাশাপাশি তৎকালীন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও স্বরলিপিকার শীতলকান্ত দাস (এস. কে. দাস) এবং অহীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

গ্রামোফোন যুগ ও সুরের বিকৃতি রোধে নজরুলের পদক্ষেপ

১৯৩০-এর দশকে এইচএমভি, মেগাফোন ও টুইন রেকর্ড কোম্পানির জন্য নজরুলকে প্রতিনিয়ত অসংখ্য গান বাঁধতে হতো। কিন্তু সেসময় আধুনিক রেকর্ডিং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল এবং রেডিও বা রেকর্ডে শুনে গান শেখার কারণে মূল গানের রাগ-রাগিণী ও সুর কাঠামোর বিকৃতি ঘটত। নজরুল অনুধাবন করেছিলেন, বইয়ের পাতায় যদি স্বরলিপি (Notation) লিখে রাখা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর গানের আসল সুর হারিয়ে ফেলবে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় ২১টি সুরারোপিত গানের বিশুদ্ধ স্বরলিপি নিয়ে ‘সুরমুকুর’ সংকলনটি প্রস্তুত করেন।

‘সুরমুকুর’: নামকরণের তাৎপর্য ও দর্পণ-ভাবনা

‘সুরমুকুর’ শব্দটির চমৎকার একটি রূপক অর্থ রয়েছে। ‘মুকুর’ শব্দের অর্থ হলো আয়না বা দর্পণ। অর্থাৎ, ‘সুরমুকুর’ বলতে বোঝায় ‘সুরের আয়না’।

সুরের প্রতিবিম্ব

নজরুল এই সংকলনটির নামকরণ এমনভাবে করেছিলেন যাতে নামের মধ্য দিয়েই বইটির মূল উদ্দেশ্য ফুটে ওঠে। আয়নায় যেমন মানুষের অবয়ব নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়, তেমনি এই স্বরলিপি গ্রন্থের পাতায় পাতায় নজরুলের সৃষ্টি করা গানের প্রকৃত রাগ, তাল, স্পর্শস্বর ও সুরের রূপটি অবিকলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের জন্য বইটি যেন ছিল সুরের আয়নায় মূল গানটিকে দেখে নেওয়ার এক বিশ্বস্ত মাধ্যম।

সংকলনের গীতিশৈলী, রাগসংগীত ও স্বরলিপির বৈশিষ্ট্য

‘সুরমুকুর’ কেবল একটি গানের বই নয়, এটি একটি প্রামাণ্য সংগীত পাঠ্যসূত্র। এর গঠনগত বৈচিত্র্যকে কয়েকটি প্রধান ভাগে অনুধাবন করা যায়:

১. উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় রাগের সহজবোধ্য সংরক্ষণ

এই গ্রন্থে সংকলিত প্রতিটি গানের পূর্বে সংশ্লিষ্ট রাগ ও তালের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ভৈরবী, মিঞাঁ কি মল্লার, বাঘেশ্রী, ছায়ানট, পিলু, যোগিয়া, খাম্বাজ ও কাফি রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত গানগুলোর স্বরলিপি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সাধারণ রেওয়াজ করা সংগীতশিল্পীও তা সহজে আয়ত্ত করতে পারেন।

২. গান ও স্বরলিপির যুগলবন্দি

বইটিতে প্রতিটি গানের বাণীর পাশাপাশি পাশে অথবা নিচে স্বরলিপি প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে স্বরলিপির সাহায্যে গান গাওয়ার সময় শব্দের ওপর স্বরের সঠিক প্রয়োগ (Diction and Accent) কীভাবে হবে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘সুরমুকুর’ (১৯৩৪) সংকলনের ২১টি গানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা

‘সুরমুকুর’ গ্রন্থে মূল সংস্করণে সংকলিত ২১টি কালজয়ী গানের তালিকা নিচে রাগ, তাল ও ভাববিন্যাসসহ তুলে ধরা হলো:
১. অরুণ-কান্তি কে গো যোগী-বর
  • সুর ও রাগ: ভৈরবী / যোগিয়া
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: প্রভাতী আলোর রূপে পরম প্রিয়জনের আগমন ও ভক্তিভাব।
২. আজ নিশীথে কোন পরবাসী
  • সুর ও রাগ: দরবারি কানাড়া / কাফি
  • তাল: কাওয়ালি
  • ভাবমূল: নিঝুম রাতের নিঃসঙ্গতা ও দূর পরবাসীর জন্য বিরহ ব্যাকুলতা।
৩. আজো কাঁদে কাননে কোয়েলিয়া
  • সুর ও রাগ: ঝিঁঝিট / পিলু
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: বসন্তের বনে কোকিলের ডাকে প্রিয়হারানো হৃদয়ের হাহাকার।
৪. আধো আধো বল
  • সুর ও রাগ: খাম্বাজ
  • তাল: কাহারবা
  • ভাবমূল: চপল প্রেম ও প্রিয়তমের মধুর মুখের কথা শোনার আকুলতা।
৫. আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
  • সুর ও রাগ: মিশ্র ভৈরবী
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: অন্তরের গহীনে থাকা পরম প্রিয় ও অধরা সুহৃদকে খোঁজার বেদনা।
৬. আমার কালো মেঘের দল
  • সুর ও রাগ: মেঘ / মেঘমল্লার
  • তাল: রূপক / দাদরা
  • ভাবমূল: বর্ষার কালো মেঘের সাথে মনের উদাস অনুভূতির মেলবন্ধন।
৭. আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী
  • সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি-কাফি
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: জীবন-তরী কূলে পৌঁছানোর রূপকে আত্মানুসন্ধান।
৮. আসে বসন্ত ফুল-বনে
  • সুর ও রাগ: পিলু-পাহাড়ি
  • তাল: কাহারবা
  • ভাবমূল: প্রকৃতিতে বসন্তের আগমন এবং নবীন রূপের আনন্দোচ্ছ্বাস।
৯. উছল নদী থির হলো
  • সুর ও রাগ: ভাটিয়ালি
  • তাল: কাহারবা
  • ভাবমূল: বহমান নদীর স্থির হয়ে যাওয়া ও থমকে দাঁড়ানো মনের ছবি।
১০. এ কোন্ খেয়াল খেলা
  • সুর ও রাগ: মালকোশ / কেদার
  • তাল: ঝাঁপতাল
  • ভাবমূল: স্রষ্টার সৃষ্টিলীলা ও জীবনের বিচিত্র খেয়াল নিয়ে প্রশ্ন।
১১. কে নিবি গো ওজন ক’রে
  • সুর ও রাগ: খাম্বাজ-গজল
  • তাল: কাওয়ালি
  • ভাবমূল: প্রেমের হাটে অমূল্য ভালোবাসা বিক্রি করার চমৎকার রূপক গীতি।
১২. গহীন রাতে কে গো বাজে
  • সুর ও রাগ: বাঘেশ্রী / পিলু
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: গভীর রাতে ভেসে আসা রহস্যময় বংশীধ্বনি ও মনের তোলপাড়।
১৩. জাগে নৈশ নিঃশব্দতা
  • সুর ও রাগ: বাঘেশ্রী
  • তাল: কাওয়ালি
  • ভাবমূল: রাতের নীরবতার মাঝে আত্মমগ্নতা ও প্রিয়জনের স্মৃতি।
১৪. দূর দীপবর্তিকা
  • সুর ও রাগ: ছায়ানট
  • তাল: তিতাল
  • ভাবমূল: দূর দিগন্তে জ্বলে থাকা আশার প্রদীপের প্রতি ব্যাকুল দৃষ্টি।
১৫. নয়ন ভরে দেখব তোরে
  • সুর ও রাগ: কাফি
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: প্রিয়জনকে চোখের সামনে বসিয়ে পরম মমতায় দেখার অনন্ত তৃষ্ণা।
১৬. পরদেশী বঁধু রে
  • সুর ও রাগ: পিলু-গজল
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: প্রবাসী প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসার ব্যাকুল আকুতি।
১৭. পরানো-প্রিয় মোর
  • সুর ও রাগ: যোগিয়া
  • তাল: কাহারবা
  • ভাবমূল: হৃদয়ের গভীরতম স্থানে থাকা ভালোবাসার মানুষের প্রতি সমর্পণ।
১৮. ফিরে ফিরে চায় কে গো
  • সুর ও রাগ: বেহাগ / তিলং
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: যাওয়ার পথে বারবার ফিরে তাকানোর মুগ্ধ রূপ বর্ণনা।
১৯. বোল গো বোল কোয়েলিয়া
  • সুর ও রাগ: পিলু
  • তাল: কাহারবা
  • ভাবমূল: কোকিলের কাছে প্রিয়জনের বারতার জন্য আকুল প্রশ্ন।
২০. মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
  • সুর ও রাগ: ভৈরবী
  • তাল: দাদরা
  • ভাবমূল: স্বপ্নের আবেশে প্রিয়তমের আগমন এবং বাস্তব জেগে ওঠার বেদনা।
২১. শাওন-রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
  • সুর ও রাগ: মেঘমল্লার / কাফি
  • তাল: কাওয়ালি
  • ভাবমূল: বর্ষার রাতে স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠা পুরনো ভালোবাসার সুর।

বাংলা সংগীতে ‘সুরমুকুর’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মূল্যায়ন

কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতজগতে ‘সুরমুকুর’ একটি দিকনির্দেশক গ্রন্থ। এটি কেবল গান গাওয়ার গাইড বই ছিল না, বরং বাংলা কাব্যসংগীতকে ব্যাকরণগত শৃঙ্খলায় বাঁধার একটি বৈজ্ঞানিক প্রয়াস ছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন তাঁর গানগুলোকে সংরক্ষণ করার জন্য স্বরলিপি সমিতি গঠন করেছিলেন এবং স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, নজরুলও ‘সুরমুকুর’-এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে তাঁর গান কেবল তাৎক্ষণিক আবেগের ফসল নয়; তা রাগসংগীতের সঠিক শাস্ত্রীয় কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা স্থায়ী শিল্পকর্ম।

পরবর্তীকালে নজরুল অ্যাকাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট এবং প্রখ্যাত সংগীত গবেষকরা যখন নজরুলের মূল সুর পুনরুদ্ধার ও প্রামাণীকরণ (Authentication) করার কাজ শুরু করেন, তখন এই ‘সুরমুকুর’ গ্রন্থটি তাঁদের সবচেয়ে বড় আইনি ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করেছে।

সংকলনটির একনজরে সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
গ্রন্থের নামসুরমুকুর (স্বরলিপি ও গীতি-সংকলন)
রচয়িতাকাজী নজরুল ইসলাম
প্রকাশকাল১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ (জুন / আষাঢ় ১৩৪১ বঙ্গাব্দ)
মূল প্রকাশকডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা
স্বরলিপিকারগণকাজী নজরুল ইসলাম, শীতলকান্ত দাস (এস. কে. দাস), অহীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
মোট গান সংখ্যা২১টি (পূর্ণাঙ্গ স্বরলিপিসহ)
গ্রন্থের ধরনস্বরলিপিসহ রাগাশ্রিত গীতি-সংকলন
মূল উদ্দেশ্যগানের শুদ্ধ সুর ও রাগ-রূপ সংরক্ষণ এবং সুরের বিকৃতি রোধ করা
নামকরণের অর্থসুরের দর্পণ বা আয়না (যেখানে সুরের অবিকল রূপ দেখা যায়)
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.