বাংলা গীতিসাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘সুর-মঞ্জরী’ (১৯৩৫) নজরুলগীতির সাঙ্গীতিক ব্যাকরণ, সুরের বিশুদ্ধতা এবং নান্দনিক রূপ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি অনন্য প্রামাণ্য গ্রন্থ। ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগে গ্রামোফোন রেকর্ড, বেতার (রেডিও) এবং মঞ্চনাটকের কল্যাণে নজরুলের গান যখন সমগ্র বঙ্গীয় সমাজকে সুরের দোলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এক গুরুতর শৈল্পিক তাগিদ দেখা দেয়। নজরুলের আধুনিক গান, গজল ও ধ্রুপদী রাগভিত্তিক রচনার সূক্ষ্ম তান, ক্ষিপ্র লয় ও অলংকারের সঠিক রূপ নথিবদ্ধ করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস থেকেই ১৯৩৫ সালে এই বিশেষ স্বরলিপি-সংকলনটি প্রকাশিত হয়।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস ও সংকলন পটভূমি
‘সুর-মঞ্জরী’ গ্রন্থটি ১৯৩৫ সালে (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বিখ্যাত ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।
- প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, ৬১ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
- গ্রন্থের ধরণ: স্বরলিপিসহ আধুনিক গান, গজল ও রাগাশ্রয়ী গানের প্রামাণ্য নির্দেশক সংকলন।
- মূল উদ্দেশ্য: রেডিও, স্টু স্টুডিও এবং সাধারণ শিক্ষানবিস গায়কদের জন্য নজরুলের স্বরচিত জটিল সুরের গাণিতিক ও ব্যাকরণগত কাঠামোকে স্থায়ী স্বরলিপিতে রূপ দেওয়া।
নজরুল ছিলেন অপরিসীম সুর-সৃষ্টিশীলতার অধিকারী। তিনি স্টুডিওতে সরাসরি গান রেকর্ড করার সময় কিংবা তাৎক্ষণিক সুর বাঁধার সময় যেসব জটিল তানের কাজ ও সূক্ষ্ম মীন ব্যবহার করতেন, সাধারণ গায়কদের পক্ষে তা স্মৃতির ওপর নির্ভর করে হুবহু পরিবেশন করা কঠিন ছিল। ‘সুর-মঞ্জরী’ প্রকাশের ফলে গানগুলোর প্রতিটি স্বরের নির্ভুল বিন্যাস লিখিত রূপ লাভ করে।
২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও ব্যাকরণগত সুরক্ষা
‘সুর-মঞ্জরী’ গ্রন্থে নজরুলের বহুমুখী গীতি-প্রতিভার তিনটি মূল ধারাকে স্বরলিপিবদ্ধ করা হয়েছিল:
ক) আধুনিক গানের সুরবিন্যাস
১৯৩০-এর দশকে বাংলা ‘আধুনিক গান’-এর যে রূপান্তর ঘটেছিল, তার অগ্রপথিক ছিলেন নজরুল। এই সংকলনে আধুনিক ভাবধারার গানগুলোতে ব্যবহৃত সুরের বৈচিত্র্য, কোমল স্বরের প্রয়োগ এবং নতুন ছন্দের প্রামাণ্য স্বরলিপি প্রদান করা হয়।
খ) গজল ও সুকোমল ফারসি অঙ্গ
নজরুলের বাংলা গজলে পিলু, কাফি, খাম্বাজ, ভৈরবী ও সিন্ধু-ভৈরবী রাগের যে সুকোমল মিশ্রণ থাকত, ‘সুর-মঞ্জরী’তে তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মাত্রা ও তালে বিভক্ত করে দেখানো হয়। এর ফলে গজলের আসল মেজাজটি অপরিবর্তিত থাকে।
গ) ধ্রুপদী রাগভিত্তিক রচনার ব্যাকরণ রক্ষা
নজরুল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য সুরের অবয়বে রূপ দিয়েছিলেন। রাগাশ্রয়ী গানগুলোতে ব্যবহৃত তান, আলংকারিক রূপ এবং দাদরা, কাহারবা, ত্রিতাল ও রূপক তালের সুনির্দিষ্ট স্বরলিপি গায়কদের সুর ও তালভঙ্গ হওয়া থেকে রক্ষা করত।
৩. নজরুল-চর্চায় ‘সুর-মঞ্জরী’-র ঐতিহাসিক গুরুত্ব
‘সুর-মঞ্জরী’ কেবল একটি গানের স্বরলিপি বই ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন উচ্চাঙ্গ ও সুগম সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এক অনিবার্য নির্দেশিকা পুস্তক (Textbook)। রেডিও ও গ্রামোফোন কোম্পানিতে গাইবার পূর্বে শিল্পীরা এই গ্রন্থ থেকেই গানের শুদ্ধ সুর ও তাল অনুশীলন করতেন। পরবর্তীকালে নজরুলগীতির শুদ্ধ সুর প্রামাণীকরণে ‘সুর-মঞ্জরী’ এক ঐতিহাসিক আকর-গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত লাভ করেছে।
‘সুর-মঞ্জরী’ (১৯৩৫) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার সুবিধার জন্য ১৯৩৫ সালের মূল ‘সুর-মঞ্জরী’ গ্রন্থে স্বরলিপিবদ্ধ কালজয়ী গানগুলোর পরিমার্জিত ও নির্ভুল নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
- মোরা আর জনমে হংস-মিথুন
- আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি
- আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়
- প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই
- ঝুম ঝুম ঝুমরা নাচ নেচে কে এল গো
- মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
- আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন
- কথা কও কও কথা
- রুমুঝুমু কে এলে নূপুর পায়
- নিশি-পবন ফুলের দেশে যাও
- নিশি না পোহাতে যেয়ো না যেয়ো না
- অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত দেহা
- গহীন রাতে ঘুম কে এলে ভাঙাতে
- কার निकুঞ্জে রাত কাটায়ে
- শুকনো পাতার নূপুর পায়ে
- বসন্ত মুখর আজি
- আবার ভালোবাসার সাধ জাগে
- পথ চলিতে যদি চকিতে
- তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
- তোমায় কূলে তুলে বন্ধু আমি নামলাম জলে



















