বাংলা গীতিসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘নজরুল গীতিকা’ (১৯৩৮) কেবল একটি সংকলন নয়; এটি বিদ্রোহী কবির সমগ্র সাঙ্গীতিক জীবনের এক অসামান্য, মহাকাব্যিক ও পূর্ণাঙ্গ দলিল। ১৯২০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত নজরুল বাংলা গানকে যে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি, স্বকীয়তা ও সুরের বৈচিত্র্য দান করেছিলেন, তার এক সুবিশাল ও সুবিন্যস্ত মহাসমুদ্র হলো এই গ্রন্থটি। ১৯৪২ সালে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে কবি চিরতরে বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক বছর পূর্বে প্রকাশিত এই সংকলনটি নজরুলগীতির আকর-গ্রন্থ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও গ্রন্থ-কাঠামো
‘নজরুল গীতিকা’র প্রথম অবয়বটি ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (১৮ ভাদ্র, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ) কলকাতার ‘শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী অ্যান্ড সন্স’ থেকে ১২৭টি গান নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে গ্রন্থটিকে নতুন করে পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত এবং বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীতে বিভক্ত করে এক বৃহদাকার রূপ দান করা হয়।
- প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
- গ্রন্থের ধরণ: নজরুলের বহুমুখী সাঙ্গীতিক সৃষ্টির বিষয়ভিত্তিক প্রামাণ্য গীতিসংগ্রহ।
- উৎসর্গ: কবি গ্রন্থটি নজরুলসংগীতের অগণিত অনুরাগী, সুররসিক শ্রোতা ও তৎকালীন নজরুলগীতির নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীদের উদ্দেশ্যে পরম ভালোবাসায় নিবেদন করেছিলেন।
এই গ্রন্থে সংকলিত গানগুলোর বিশালতা ও বৈচিত্র্য তৎকালীন সমগ্র ভারতীয় মহাদেশের গীতিসাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
২. সাঙ্গীতিক শ্রেণীবিন্যাস ও ভাববস্তু
‘নজরুল গীতিকা’র সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিজ্ঞানসম্মত ও শৈল্পিক বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস। কবি এতে তাঁর হাজারো গানকে নির্দিষ্ট ভাব ও রসের ভিত্তিতে কয়েকটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করেছিলেন:
ক) ভক্তিগীতি (শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন ও ভজন)
হিন্দু ভক্তিশাস্ত্রের শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক অনুপম সংমিশ্রণ ঘটেছে এই অংশে। ‘শ্মশান কালীর নাম শুনে রে’, ‘তোরা দেখে যা রুদ্রাণী মা’, ‘আজি নন্দ দুলালের সাথে’, কিংবা ‘আমার নয়নে কৃষ্ণ’—গানগুলোতে শ্যামার প্রতি সন্তানের আকুলতা এবং ব্রজধামের ভক্তিরস নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
খ) ইসলামী সঙ্গীত (হামদ, না’ত ও কাওয়ালি)
বাংলা গানে ইসলামী ভাবধারার যে যুগান্তকারী প্রবর্তন নজরুল করেছিলেন, তার শ্রেষ্ঠ গানগুলো এতে সংকলিত হয়। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’, ‘আল্লাহ আমার প্রভু’, এবং ‘কারবালার ঐ প্রান্তর’ গানগুলোর মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সত্তা নতুন প্রাণ পেয়েছিল।
গ) গজল ও সুকোমল প্রেমগীতি
ফারসি গজলের সুর-কাঠামো ও অলংকারকে বাংলা ভাষার সাথে মিলিয়ে নজরুল যে জাদুকরী গজল সৃষ্টি করেছিলেন, তার অসামান্য সম্ভার রয়েছে এই বিভাগে। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘কে বিদেশী বন উদাসী’, ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না’, এবং ‘আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে’ গানগুলোতে প্রেমিক হৃদয়ের বিরহ ও অনুরাগের করুণ সুর বেজে উঠেছে।
ঘ) প্রকৃতি, ঋতু ও লোকজ সুর
বাংলার মেঠোপথ, নদী-নালা, বর্ষা ও বসন্তের রূপক নিয়ে রচিত ভাটিয়ালি, বাউল ও কাজরী অঙ্গের গানগুলো এই গ্রন্থে বিশেষ স্থান পায়। ‘পদ্মার ঢেউ রে’, ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’, এবং ‘বাদলা মেঘের বাদল তালে ময়ূর নাচে’ গানগুলো প্রকৃতির চিরন্তন রূপকে ধারণ করে আছে।
ঙ) স্বদেশী, অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী গান
পরাধীন ভারতে মুক্তির সংগ্রাম, ছাত্র ও যুবসমাজের জাগরণ এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে এই গানগুলোতে। ‘জননী মোর জন্মভূমি’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, এবং ‘জাতের বজ্জাতি’ গানগুলো দেশাত্মবোধের আগুনে উদ্ভাসিত।
চ) হাসির ও ব্যঙ্গাত্মক গান (রম্যগীতি)
রাজনৈতিক ভণ্ডামি, সমাজ-সংস্কারের নামে অসংগতি এবং চটুল হাস্যরস নিয়ে রচিত নজরুলের বিখ্যাত হাসির গানগুলোও এই গ্রন্থে স্থান পায়।
৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও নজরুল-চর্চায় স্থান
‘নজরুল গীতিকা (১৯৩৮)’ কেবল একটি বই নয়; এটি নজরুলগীতির শুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা রক্ষার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক স্তম্ভ। পরবর্তীতে কলকাতায় ‘হরফ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত ‘অখণ্ড নজরুলগীতি’ এবং বাংলাদেশে ‘নজরুল একাডেমি’ ও ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ কর্তৃক নজরুলগীতির প্রামাণিক সংগ্রহের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে, তার মূল ভিত্তিফলক ছিল ১৯৩৮ সালের এই ‘নজরুল গীতিকা’।
‘নজরুল গীতিকা’ (১৯৩৮) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার কাঠামোগত সুবিধার্থে ‘নজরুল গীতিকা’ গ্রন্থে বিষয়ভিত্তিক প্রধান প্রধান ধারায় সংকলিত কালজয়ী গানগুলোর পরিমার্জিত ও নির্ভুল নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
[১] গজল ও প্রেমগীতি
- বাগিচায় বুলবুলি তুই
- কে বিদেশী বন উদাসী
- পরদেশী বঁধুয়া এলে কি এতদিনে
- বসিয়া বিজনে কেন একা মনে
- চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না
- এত জল ও কাজল চোখে
- করুণ কেন অরুণ আঁখি
- আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়
- আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন
- মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
- তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা
- আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে
- ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি
- প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই
[২] ভক্তিগীতি (শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন)
- শ্মশান কালীর নাম শুনে রে
- মহাকালের কোলে এসে গৌরী
- দেখে যা রে রুদ্রাণী মা
- দশ হাতে ঐ দশ দিকে মা
- মা এসেছে মা এসেছে
- চির কিশোর মুরলীধর
- আজি নন্দ দুলালের সাথে
- আমার নয়নে কৃষ্ণ
- মোর মাধব শূন্য মাধবী কুঞ্জে
- তোমারে কি দিয়া পূজি
[৩] ইসলামী গান (হামদ ও না’ত)
- আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
- ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
- তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
- ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ
- কারবালার ঐ প্রান্তর কাঁদাতে এলো আবার
- নাম মোহাম্মদ বোল রে মন
- হে মদিনার বুলবুলি তোর সুর শুনে আজ
- আয় মরু-পারের হাওয়া, নিয়ে যা রে মদিনায়
[৪] প্রকৃতি, ঋতু ও লোকসঙ্গীত
- শুকনো পাতার নূপুর পায়ে
- পলাশ ফুলের মউ পিয়ে
- এস বসন্তের রাজা হে আমার
- পদ্মার ঢেউ রে
- নদীর স্রোতে মালার কুসুম ভাসিয়ে দিলাম
- ও কালো বউ
- বাদলা মেঘের বাদল তালে ময়ূর নাচে
- রাঙা মাটির পথে লো মাদল বাজে
[৫] স্বদেশী, জাগরণী ও ব্যঙ্গসঙ্গীত
- জননী মোর জন্মভূমি
- বীরদল আগে চল্
- চল্ রে চপল তরুণ দল বাঁধন হারা
- শঙ্কাশূন্য লক্ষকণ্ঠে বাজিছে শঙ্খ ঐ
- রাজভক্তের গোলটেবিল
- সাইমন কমিশনের রিপোর্ট
- জাতের বজ্জাতি
- রাজনৈতিক ডুগডুগি
















![সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ‘মানুষ’ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ কবিতা [ কবিতা, সারসংক্ষেপ ও টিকা ] সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ | কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/মানুষ-কবিতা-1024x655.jpg)

