বাংলা গীতিসাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’ [১৯৫৯] কেবল একটি সাধারণ গানের বই নয়; এটি প্রেম, সান্নিধ্য এবং এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত কবির অবিনাশী সুর-সম্পদকে চিরকালের জন্য বাঁচিয়ে রাখার এক অমলিন মানবিক দলিল। ১৯৪২ সালে কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতায় চলে যাওয়ার প্রায় দেড় দশক পর এই গ্রন্থটি আত্মপ্রকাশ করে। কবির জীবন যখন নিভৃত আঁধারে আচ্ছন্ন, তখন কবি-পত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলাম পরম মমতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সাথে স্বামীর হারিয়ে যেতে বসা দুর্লভ ও অপ্রকাশিত গানগুলোকে সংকলিত করে এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও প্রমীলা দেবীর ঐতিহাসিক ভূমিকা
‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’ সংকলনটি ১৯৫৯ সালের মে মাসে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬২ বঙ্গাব্দ—কবির ৬০তম জন্মজয়ন্তীতে) কলকাতার প্রখ্যাত ‘ডি এম লাইব্রেরি’র পরিবেশনায় প্রকাশিত হয়।
- পরিবেশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
- সংকলক ও উদ্যোক্তা: কবি-পত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলাম।
- গান সংখ্যা: সংকলনটিতে মোট ১০১টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়।
- বিশেষত্ব: এতে স্থান পায় কবির বহু অপ্রকাশিত, দুর্লভ, পাণ্ডুলিপিতে পড়ে থাকা এবং রেকর্ড না-হওয়া আধুনিক গান ও গজল।
কবির অসুস্থতার পর তাঁর অসংখ্য মূল্যবান গানের পাণ্ডুলিপি, খাতা ও রেখাচিত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল। শারীরিক অসুস্থতা ও পক্ষাঘাত সত্ত্বেও প্রমীলা দেবী পরম যত্নে সেই সমস্ত দুর্লভ পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও সংকলন করার ব্রত গ্রহণ করেন। বাংলা গীতি-সাহিত্যে স্বামীর নাম ও অনন্য সৃষ্টিকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে প্রমীলা দেবীর এই একক প্রচেষ্টা নজরুল-চর্চার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় মাইলফলক হয়ে আছে।
২. সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য
১৯২৮ সালে প্রকাশিত প্রথম ‘বুলবুল’-এর ধারাবাহিকতায় এই দ্বিতীয় খণ্ডটিতেও প্রধানত স্থান পেয়েছিল সুকোমল প্রেম, বিরহ এবং আধুনিক গানের রাগাশ্রয়ী কারুকাজ:
ক) দুর্লভ ও অপ্রকাশিত আধুনিক গান
‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’-এর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর দুর্লভ গানগুলো। কবির সুস্থতার শেষ দিনগুলোতে আকাশবাণী রেডিও, এইচএমভি ও অন্যান্য গ্রামোফোন কোম্পানির স্টুডিওর জন্য তিনি যেসব গান তাৎক্ষণিকভাবে লিখেছিলেন কিন্তু বই আকারে সংকলিত করতে পারেননি, সেগুলোর একটি বড় অংশ এই গ্রন্থে স্থান পায়।
খ) বিরহ, অনুরাগ ও গীতিময়তা
সংকলনের গানগুলোতে প্রেমাস্পদের অনুপস্থিতি, বিরহী হৃদয়ের হাহাকার এবং অনুরাগের গভীরতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। ফারসি গজলের সুকোমল সুরকাঠামো এবং ভারতীয় ধ্রুপদী রাগের (যেমন—পিলু, কাফি, সিন্ধু-ভৈরবী, দেশ ও খাম্বাজ) অনবদ্য ব্যবহার এতে লক্ষণীয়।
গ) প্রকৃতির রূপক ও আত্মনিবেদন
প্রেম ও বিরহের পাশাপাশি প্রকৃতির বিচিত্র রূপ—শ্রাবণের রিমঝিম ধারা, বসন্তের আগমন এবং প্রকৃতির সাথে মানবমনের নিভৃত সংলাপে রচিত বেশ কিছু অনন্য গান এই গ্রন্থে সংকলিত হয়।
৩. নজরুল-চর্চায় ‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’-এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য
কাজী নজরুলের নীরব হয়ে যাওয়ার পর বহু গান চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’ প্রকাশের মাধ্যমে সেই আশঙ্কার অবসান ঘটে এবং নজরুল-সঙ্গীতের পরিধি নতুন করে প্রসারিত হয়। পরবর্তীতে আকাশবাণী ও বাংলাদেশে নজরুল একাডেমী কর্তৃক বহু বিলুপ্ত গান পুনরুদ্ধারে প্রমীলা দেবী সংকলিত এই বইটিকে প্রামাণ্য আকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি কেবল সাঙ্গীতিক সংকলনই নয়, বরং এক মহীয়সী নারী ও স্ত্রীর স্বীয় পত্নীপ্রেমের এক অনন্য সাঙ্গীতিক স্মারক।
‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’ (১৯৫৯) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার সুবিধার জন্য ১৯৫৯ সালে প্রমীলা দেবী কর্তৃক সংকলিত ‘বুলবুল (২য় খণ্ড)’ গ্রন্থের গানগুলোর নির্ভুল ও পরিমার্জিত নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
- তুমি রূপসী তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
- আমার গান শুনিয়া মন ভুলাইলে
- কেন দিলে এ কাঁটা যদি গো ফুল দিলে
- ভুলি কেমনে আজো যে মনে পড়ে
- পরদেশী বঁধুয়া এলে কি এতদিনে
- আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে
- বিরহ-বিধুর মন কাঁদে মোর
- মোর প্রিয় হবে এসো রানী
- ওগো বঁধু মনে রেখো এ মিলন রাতের কথা
- নিশি পবন ফুলের দেশে যাও
- গহীন রাতে ঘুম কে এলে ভাঙাতে
- তোমার তরে জীবন আমার
- তুমি নন্দন পথ ভোলা
- আবার ভালোবাসার সাধ জাগে
- শুকনো পাতার নূপুর পায়ে
- আঁখি বারি আঁখিতে থাক
- ভালোবেসে অবশেষে
- মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
- আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন
- আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়
- চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না
- এত জল ও কাজল চোখে
- করুণ কেন অরুণ আঁখি
- বাগিচায় বুলবুলি তুই
- কে বিদেশী বন উদাসী
- আসিয়া বিজনে কেন একা মনে
- কথা কও কও কথা
- তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা
- দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি
- নদীর স্রোতে মালার কুসুম ভাসিয়ে দিলাম
- পদ্মার ঢেউ রে
- শ্যামল ধানের শিষের দোলায়
- কেন কাঁদে পরান কী বেদনায়
- আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
- রেশমি চূড়ির তালে
- গোধূলির রং ছড়ালে
- জাগো জাগো নব আলোকে
- ভালোবেসে অবশেষে
- বিজন গোঠে কে রাখাল
- নাচে ঐ আনন্দে
- আমার নয়নে কৃষ্ণ
- মোর মাধব শূন্য মাধবী কুঞ্জে
- তোমারে কি দিয়া পূজি
- সাগর আমায় ডাক দিয়েছে
- ও তুই যাস্নে রাই কিশোরী


















