বাংলা গীতিসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাঙ্গা জবা’ (১৯৬৬) কেবল একটি ভক্তিমূলক সংকলন নয়; এটি কবি নজরুলের যোগসাধনা, মাতৃভাবনা এবং অবিনাশী সাধক-সত্তার এক সর্বোচ্চ চূড়া। বাংলা কাব্যে রামপ্রসাদ সেন ও সাধক কমলাকান্তের পর দেবী শ্যামা বা মা কালীকে কেন্দ্র করে এমন অসামান্য, করুণ, গভীর ও আত্মনিবেদিত পদাবলী আর কেউ রচনা করতে পারেননি। কবির অসুস্থতাকালীন নীরবতার যুগে, ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত এই সংকলনটি নজরুলকে বাংলা শ্যামাসঙ্গীতের ইতিহাসে চিরন্তন ধ্রুবতারার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস, সাধনা ও পটভূমি
‘রাঙ্গা জবা’ সংকলনটি ১৯৬৬ সালে (১৩৭৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার প্রখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়।
- প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
- বিষয়বস্তু: শ্যামাসঙ্গীত, উমা-সঙ্গীত (আগমনী ও বিজয়া), এবং শাক্ত পদাবলী।
- সাধন-প্রেক্ষাপট: ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগে, বিশেষ করে কনিষ্ঠ পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যুর পর, নজরুল তীব্র আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন। এ সময় তিনি তন্ত্রসাধনা, যোগ সাধনা এবং দেবী আদ্যাশক্তির আরাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেন। ওস্তাদ গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, বরদাপ্রসন্ন মজুমদার এবং দিলীপকুমার রায়ের সাঙ্গীতিক সান্নিধ্যের পাশাপাশি কবির নিভৃত সাধনার ফলশ্রুতি হিসেবে রচিত হয় এই অজস্র শ্যামাসঙ্গীত।
কবির অসুস্থতার পর বহু বছর ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এবং পাণ্ডুলিপিতে সযত্নে রক্ষিত এই শ্যামাসঙ্গীতগুলোকে একত্র করে ‘রাঙ্গা জবা’ নামে গ্রন্থিত করা হয়। ‘রাঙ্গা জবা’ কেবল দেবীর চরণের পুষ্পার্ঘ্য নয়, এটি কবির নিজের রক্তরাঙা হৃদয়-পদ্মকে মায়ের চরণে সঁপে দেওয়ার প্রতীক।
২. সাঙ্গীতিক ও ভাবগত বৈচিত্র্য
‘রাঙ্গা জবা’ গ্রন্থে সংকলিত পদাবলীগুলোতে শাক্ত সাধনার গূঢ় তত্ত্ব এবং এক পরম ব্যাকুল সন্তানের আকুতি অপূর্ব সুর ও বাণীতে রূপ পেয়েছে:
ক) মাতৃভাব ও সন্তানের আকুল অভিযোগ
নজরুলের শ্যামাসঙ্গীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে দেবীকে কোনো দূরবর্তী বা ভয়াল সত্তা হিসেবে দেখা হয়নি; বরং মা কালী এখানে পরম স্নেহময়ী জননী। সন্তানের মতো কবি মায়ের কাছে অভিমান করেছেন, অভিযোগ করেছেন, আবার পরক্ষণেই মায়ের কোলে আশ্রয় চেয়েছেন। ‘বল রে জবা বল’, ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’, কিংবা ‘আমার কালো মায়ের চরণতলে’ গানগুলোতে এই অপত্য স্নেহের এক অমর সুর ধ্বনিত হয়েছে।
খ) ধ্রুপদী রাগ ও রামপ্রসাদী সুরের অনবদ্য সংমিশ্রণ
নজরুল ঐতিহ্যবাহী ঐতিহ্যিক ‘রামপ্রসাদী’ সুরের সীমানা বিস্তৃত করে তাতে ভারতীয় ধ্রুপদী রাগের গাঢ় গভীরতা যুক্ত করেছিলেন। ভৈরবী, রামকেলী, মালকোষ, টোড়ি, কাফি এবং ভৈরব রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত তাঁর শ্যামাসঙ্গীতগুলো বাংলা ভক্তিগীতিকে এক নতুন রাজকীয় মর্যাদা দান করে।
গ) উমা-সঙ্গীত: আগমনী ও বিজয়ার করুণ রসমাধুর্য
শ্যামাসঙ্গীতের পাশাপাশি এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত উমা বা পার্বতীর আগমনী ও বিজয়ার গানগুলো বাঙালি পারিবারিক আবেগের এক অমর দলিল। কন্যা উমার পিতৃগৃহে আগমন এবং বিজয়ার দিনে তাঁর কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের বিরহবেদনা কবির সুরের ছোঁয়ায় নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
৩. সাঙ্গীতিক অঙ্গনে প্রভাব ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
‘রাঙ্গা জবা’ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা ভক্তিগীতির ধারায় এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। পন্নালল ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মৃণাল কান্তি ঘোষ এবং পরবর্তীতে কে জি মুস্তফা ও আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গীত নজরুলের শ্যামাসঙ্গীতগুলো কোটি কোটি বাঙালি হৃদয়কে ভক্তিরসে আপ্লুত করে। বিশেষ করে পান্নালাল ভট্টাচার্যের কণ্ঠে নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত বাংলা ঘরে ঘরে পরম শ্রদ্ধার সাথে সমাদৃত হয়।
নজরুল প্রমাণ করেছিলেন যে, অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনা এবং গভীর ধর্মীয় ভক্তিভাবনা একদেহে কীভাবে সহ অবস্থান করতে পারে। ‘রাঙ্গা জবা’ বাংলা শাক্ত গীতিসাহিত্যে রামপ্রসাদের পদাবলীর পাশাপাশি চিরকালের জন্য অমলিন হয়ে থাকবে।
‘রাঙ্গা জবা’ (১৯৬৬) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার সুবিধার জন্য ১৯৬৬ সালের মূল ‘রাঙ্গা জবা’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত কালজয়ী শ্যামাসঙ্গীত ও ভক্তিমূলক গানের পরিমার্জিত ও নির্ভুল নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
- বল রে জবা বল
- কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন
- মা গো আমি তোমায় কি দিয়ে পূজিব
- আমার কালো মায়ের চরণতলে
- শ্মশান কালীর নাম শুনে রে
- আমার মা আছে রে শ্যামা রূপ ধরে
- মা তোর কত রূপ
- আমার সকল দুখ-সুখের তারা
- এমনি করে ঘুরবি কত
- তুমি তো মা জানো গো সব
- তারা কালী শ্যামা নাম রে তোর
- শ্যামা নামের লাগলে ছোঁয়া
- রাঙ্গা জবা কে দিল তোর চরণে
- মা তোর চরণ পাওয়ার আশে
- জবা রাঙ্গা রাঙ্গা জবা
- মাগো তোর চরণতল
- তোর রাঙ্গা পায়ে মাগো
- তোর বিচারে মাগো
- জগজ্জননী সর্বমঙ্গলে
- মাগো আমায় রাখবি কত
- খেলবি খেলা আয় মা উমা
- আসবে মা কি আর ফিরে
- মা তুই আমারে দিবি কত দুঃখ
- মা তোর কোলে ঠাঁই দে আমায়
- ভোর হলো জাগো মা কালী
- শ্যামা মা মোর চিরকালের রূপসী
- মাতৃরূপে এলে মাগো
- আমার শ্যামা মায়ের করুণা
- মা আমার সাধের জবা
- মায়ের পায়ে জবা হয়ে
- মাগো আমি মাটির প্রদীপ
- তোরা দেখে যা রুদ্রাণী মা
- মহাকালের কোলে এসে গৌরী হলো এলোথেলো







![ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম 2 ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/ডায়ারের-স্মৃতিস্তম্ভ-150x150.jpg)












