কাজী নজরুল ইসলামের রাজদ্রোহের অভিযোগে বাজেয়াপ্ত অগ্নিগর্ভ কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪)-এ সংকলিত ‘জাগৃহি’ কবিতাটি পরাধীন ভারতের সুপ্ত, অবসাদগ্রস্ত ও আত্মবিস্মৃত তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার এক বজ্রকণ্ঠ আহ্বান। ‘জাগৃহি’ শব্দের আক্ষরিক অর্থই হলো ‘জেগে ওঠো’—আর এই কবিতায় কবি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা বাঙালি তথা সমগ্র পরাধীন জাতির দীর্ঘদিনের অলসতা, ভীরুতা ও দাসত্বের নিদ্রা ভাঙতে তীব্র বাণীর আঘাত হেনেছেন। কবি বিশ্বাস করতেন যে, পরাধীনতার শৃঙ্খল কেবল বাইরের শত্রু কাটবে না, বরং ভেতরের জড়তা ও অন্যায়ের সামনে নতজানু মানসিকতাকে চূর্ণ করে আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটাতে হবে। তরুণের রক্তে বিপ্লবের দাহিকা শক্তি সঞ্চার করে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সংগ্রামের অগ্নিনির্ঝরে ঝাঁপিয়ে পড়ার এই দীপ্ত আবাহন ‘জাগৃহি’ কবিতাটিকে নজরুলীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা ও বৈপ্লবিক উদ্দীপনার এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত করেছে।
বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থের ‘জাগৃহি’ কবিতা
[তোটক ছন্দ]
‘হর
হর হর শংকর হর হর ব্যোম’ –
একী
ঘন রণ-রোল ছায়া চরাচর ব্যোম!
হানে
ক্ষিপ্ত মহেশ্বর রুদ্র পিনাক,
ঘন
প্রণব-নিনাদ হাঁকে ভৈরব-হাঁক
ধু ধু
দাউ দাউ জ্বলে কোটি নর-মেধ-যাগ,
হানে
কাল-বিষ বিশ্বে রে মহাকাল-নাগ!
আজ
ধূর্জটি ব্যোমকেশ নৃত্য-পাগল,
ওই
ভাঙল আগল ওরে ভাঙল আগল!
বোলে
অম্বুদ-ডম্বুর কম্বু বিষাণ,
নাচে
থই-তাতা থই-তাতা পাগলা ঈশান!
দোলে
হিন্দোলে ভীম-তালে সৃষ্টি ধাতার,
বুকে
বিশ্বপাতার বহে রক্ত-পাথার!
ঘোর
নির্ঘোষে ‘মার মার’ দৈত্য, অসুর,
প্রেত,
রক্ত-পিশাচ, রণ-দুর্মদ সুর।
করে
ক্রন্দসী-ক্রন্দন অম্বর রোধ –
ত্রাহি
ত্রাহি মহেশ হে সম্বরো ক্রোধ!
সুত
মৃত্যু-কাতর, হাহা অট্টহাসি
হাসে
চণ্ডী চামুণ্ডা মা সর্বনাশী।
কাল-
বৈশাখী ঝঞ্ঝারে সঙ্গে করি –
রণ-
উন্মাদিনী নাচে রঙ্গে মরি!
উর-
হার দোলে নরমুণ্ড-মালা,
করে
খড়্গ ভয়াল, আঁখে বহ্নি-জ্বালা!
নিয়া
রক্তপানের কী অগস্ত্য-তৃষা
নাচে
ছিন্ন সে মস্তা মা, নাইকো দিশা!
‘দে রে
রক্ত দে রক্ত দে’ রণে ক্রন্দন,
বুঝি
থেমে যায় সৃষ্টির হৃৎ-স্পন্দন!
জ্বলে
বৈশ্বানরের ধু ধু লক্ষ শিখা,
আজ
বিষ্ণু-ভালে লাল রক্ত-টিকা!
শুধু
অগ্নি-শিখা ধু ধু অগ্নি-শিখা,
শোভে
করুণার ভালে লাল রক্ত-টিকা!
রণ-
শ্রান্ত অসুর-সুর-যোদ্ধৃ-সেনা,
শুধু
রক্ত-পাথার, শুধু রক্ত-ফেনা!
একী
বিশ্ব-বিধ্বংস নৃশংস খেলা,
কিছু
নাই কিছু নাই প্রেত-পিশাচে মেলা।
আজ
ঘরে ঘরে জ্বলে ধু ধু শ্মশান মশান –
হোক
রোষ অবসান, ত্রাহি ত্রাহি ভগবান!
আজি
বন্ধ সবার পূতি-গন্ধে নিশাস,
বিষে
বিশ্ব-নিসাড়, বহে জোর নাভিশ্বাস!
দেহো
ক্ষান্ত রণে, ফেলো রঙ্গিণী বেশ,
খোলো
রক্তাম্বর মাতা সম্বরো কেশ!
এ তো
নয় মাতা রক্তোন্মত্তা ভীমা!
আজ
জাগৃহি মা, আজ জাগৃহি মা।
তব
চরণাবলুণ্ঠিত মহিষ-অসুর,
হল
ধ্বংস অসুর, লীন শক্তি পশুর।
তবে
সম্বরো রণ, হোক ক্ষান্ত রোদন–
হোক
সত্য-বোধন আজ মুক্তি-বোধন!
এসো
শুদ্ধা মাতা এই কাল-শ্মশানে
আজ
প্রলয়-শেষে এই রণাবসানে!
জাগো
জাগো মানব-মাতা দেবী নারী!
আনো
হৈম ঝারি, আনো শান্তি-বারি!
এসো
কৈলাস হতে মা গো মানস-সরে,
নীল
উৎপল-দলে রাঙা আঁচল-ভরে।
এসো
কন্যা উমা, এসো গৌরী রূপে,–
বাজো
শঙ্খ শুভ, জ্বালো গন্ধ ধূপে!
আজ
মুক্ত-বেণি মেয়ে একাকী চলে,
ওই
শেফালি-তলে হেরো শেফালি-তলে।
ওড়ে
এলোমেলো অঞ্চল আশ্বিন-বায়,
হানে
চঞ্চল নীল চাওয়া আকাশের গায়!
ঘোষে
হিমালয় তার মহা হর্ষ-বাণী, –
এল
হৈমবতী, এল গৌরী রানি।
বাজো
মঙ্গল শাঁখ, হোক শুভ-আরতি,
এল
লক্ষ্মী-কমলা, এল বাণী-ভারতী।
এল
সুন্দর সৈনিক সুর কার্তিক,
এল
সিদ্ধি-দাতা, হেরো হাসে চারিদিক!
ভরা
ফুল-খুকি ফুল-হাসি শিউলির তল,
আজ
চোখে আসে জল, শুধু চোখে আসে জল!
নিয়া
মাতৃ-হিয়া নিয়া কল্যাণী-রূপ
এল
শক্তি স্বাহা, বাজো শাঁখ, জ্বালো ধূপ!
ভাঁজো
মোহিনী সানাই, বাজো আগমনি-সুর,
বড়ো
কেঁদে ওঠে আজ হিয়া মাতৃ-বিধুর।
ওঠে
কণ্ঠ ছাপি বাণী সত্য পরম –
বন্-
দে মাতরম্। বন্দে মাতরম্!

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।




![উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/উপেক্ষিত-শক্তির-উদ্বোধন-1-1024x655.jpg)














