বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২)-এর একটি অত্যন্ত নাটকীয়, মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সৃষ্টি হলো ‘আনোয়ার’। এই কবিতায় কনস্টান্টিনোপলের একটি অন্ধকার কারাগৃহে অমাবস্যার নিশীথ রাতে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়ার পূর্বমুহূর্তে এক তরুণ সেনানীর বন্দীজীবন, মাতৃভূমির পরাধীনতা ও বিশ্বাসঘাতকতার গ্লানি এবং যুদ্ধগুরু আনোয়ারের প্রতি আকুল আহ্বানের একটি সুগভীর রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
বিষয়
বিবরণ
কবিতার নাম
আনোয়ার
কবির নাম
কাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থ
অগ্নিবীণা
প্রকাশের বছর
১৯২২ (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরন
ঐতিহাসিক ও নাটকীয় বিপ্লবী লিরিক কবিতা (Historical / Dramatic Revolutionary Lyric)
কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:
১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘অগ্নিবীণা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘আনোয়ার’ কবিতায় কবি তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ঐতিহাসিক চরিত্র আনোয়ার পাশার আদর্শকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কারাগারের নিস্তব্ধতায় বন্দীর আত্মকথন, মাতৃহারার বেদনা, এবং নিজের বাহু নিজে দংশন করার মধ্য দিয়ে পরাধীনতার তীব্র ক্ষোভ এই কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসার ব্যাকুলতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রহরীর আঘাতে বন্দীর আর্তনাদের মধ্য দিয়ে ত্যাগের এক করুণ ও অদম্য চিত্র এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আনোয়ার ! আনোয়ার !
জনহীন এ বিয়াবানে মিছে পস্তানো আর !
আজো যারা বেঁচে আছে তারা খ্যাপা জানোয়ার !
আনোয়ার ! –কেউ নাই !
হাথিয়ার? –সেও নাই !
দরিয়াও থম্থম্ নাই তাতে ঢেউ, ছাই !
জিঞ্জির গলে আজ বেদুঈন-দে’ও ভাই !
আনোয়ার ! কেউ নাই !
আনোয়ার ! আনোয়ার !
যে বলে সে মুস্লিম– জিভ্ ধরে টানো তার !
বেইমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো সার !
আনোয়ার ! ধিক্কার !
কাঁধে ঝুলি ভিক্ষার–
তল্ওয়ারে শুরু যার স্বধীনতা শিক্ষার!
যারা ছিল দুর্দম আজ তারা দিক্দার!
আনোয়ার! ধিক্কার!
[সহসা তাহার ক্লান্ত আঁখির চাওয়ায় তুরস্কের বন্দিনী মাতৃ-মূর্তি ভাসিয়া উঠিল। ঐ মাতৃমূর্তির পার্শ্বেই তাহার মায়েরও শৃঙ্খলিত ভিখারিনি বেশ। তাঁদের দুইজনেরই চোখের কোণে দুই বিন্দু করিয়া করুণ অশ্রু। অভিমানী পুত্র অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া লইয়া কাঁদিয়া উঠিল–]
ও কে? ও কে ছল আর?
না-মা, মরা জানকে এ মিছে তর্সানো আর!
আনোয়ার ! আনোয়ার!!
[কাপুরুষ প্রহরীর ভীম প্রহরণ বিনিদ্র বন্দী তরুণ সেনানীর পৃষ্ঠের উপর পড়িল। অন্ধ কারাগারের বন্ধ রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাহারই আর্ত প্রতিধ্বনি গুমরিয়া ফিরিতে লাগিল-‘আঃ-আঃ-আঃ!’
আজ নিখিল বন্দী-গৃহে গৃহে ঐ মাতৃমুক্তিকামী তরুণেরই অতৃপ্ত কাঁদন ফরিয়াদ করিয়া ফিরিতেছে। যেদিন এ ক্রন্দন থামিবে, সেদিন সে-কোন্ অচিন্ দেশে থাকিয়া গভীর তৃপ্তির হাসি হাসিব জানি না! তখন হয়তো হারা-মা-আমার আমায় ‘তারার পানে চেয়ে চেয়ে’ ডাকবেন। আমিও হয়তো আবার আসিব। মা কি আমায় তখন নূতন নামে ডাকিবেন? আমার প্রিয়জন কি আমায় নূতন বাহুর ডোরে বাঁধিবে? আমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছে, আর কেন যেন মনে হইতেছে, ‘আসিবে সেদিন আসিবে!’]
Aj nikhil bondi-grihe grihe oi matri-muktikami toruner-i otripto kãdon foriyad koriya phiritechhe. Jedin e krondon thamibe, sedin she-kon ochin deshe thakiya gobhir triptir hashi hashbe jani na! Tokhon hoyto hara-ma-amar amay ‘tarar pane cheye cheye’ dakben. Amio hoyto abar ashibo. Ma ki amay tokhon notun name dakiben? Amar priyojon ki amay notun bahur dore bãdh ibe? Amar chokh jole bhoriya uthitechhe, ar keno jeno mone hoitechhe, ‘Ashibe shedin ashibe!’]
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
বন্দীশালায় বিদ্রোহী চেতনা: ঘড়ির কাঁটায় মৃত্যুর দিন গণনার মুহূর্তেও তরুণ সেনানীর অন্তরে দেশের মুক্তি ও আনোয়ারের আদর্শের প্রতি অগাধ বিশ্বস্ততা।
বিক্ষোভ ও আত্মোৎসর্গ: শৃঙ্খলিত জীবনের যন্ত্রণার মাঝেও পরাধীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অবদম্য বিদ্রোহী স্পৃহা—এই কবিতার মূল প্রাণ।
উৎস:
কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২২) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।
Tags :
অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থ
কবিতা
কাজী নজরুল ইসলাম
নজরুল
কাজী নজরুল ইসলাম
<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite">
<div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div>
</div>