কাজী নজরুল ইসলামের ষোড়শ কাব্যগ্রন্থ ‘প্রলয়শিখা’ (১৯৩১) বাংলা সাহিত্য ও ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য অগ্নিঝরা দলিল। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের গোড়ায়, যখন পরাধীন ভারতের সশস্ত্র বিপ্লব ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চূড়ান্তে পৌঁছায়, তখন নজরুলের এই কাব্যগ্রন্থটি আগ্নেয়গিরির তীব্র উদগিরণের মতো আত্মপ্রকাশ করেছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের শাসন-শোষণ চূর্ণ করার উদাত্ত আহ্বান এবং বিপ্লবীদের মহীয়ান আত্মত্যাগের স্তুতিতে রচিত এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথেই শাসকশ্রেণীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। যার ফলশ্রুতিতে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’ কিংবা ‘ভাঙার গান’-এর মতো এটিও ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
Table of Contents
Toggle১. ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
‘প্রলয়শিখা’ প্রকাশের সময়কালটি ছিল ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম সংক্ষুব্ধ অধ্যায়। একদিকে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা, ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীদের ফাঁসি, আর অন্যদিকে লাহোর জেলে দীর্ঘ ৬৩ দিন ঐতিহাসিক অনশন করে বিপ্লবী যতীন দাসের আত্মবলিদান—এসব ঘটনা সমগ্র ভারতের তরুণাভিমানী হৃদয়কে আলোড়িত করেছিল।
কাব্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের আগস্টে (শ্রাবণ ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থাকারে চিহ্নিত) কলকাতার ৫০/২এ মসজিদবাড়ি স্ট্রিট থেকে এবং মুদ্রিত হয়েছিল ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের ‘মহামায়া প্রেস’ থেকে। এই গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলোর মূল কাজ ছিল নিপীড়িত জনতাকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে বের করে এনে শৃঙ্খলভাঙার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করা।
২. পুত্রশোকের হাহাকার ও বুকেও বিপ্লবের অনল
‘প্রলয়শিখা’ রচনার অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে কবির এক গভীর ব্যক্তিগত হাহাকার ও ট্র্যাজেডি। ১৯৩০ সালের মে মাসে নজরুলের প্রাণাধিক প্রিয় চার বছরের পুত্র সন্তান অৰিন্দম খালেদ (বুলবুল) বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। পুত্রশোকে কবি ভেঙে পড়েছিলেন, চোখের জলে বুক ভেসেছিল; কিন্তু পরাধীন দেশের অত্যাচারিত জনতার কান্না তাঁর সেই ব্যক্তিগত বেদনাকে ছাপিয়ে জাতীয় বেদনায় রূপ নেয়।
কবির চোখে জল থাকলেও বুকে জ্বলছিল বিপ্লবের দাহন। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও সংহারী তেজ স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল ‘প্রলয়শিখা’র প্রতিটি ছত্রে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে কীভাবে প্রলয়ের গান গাইতে হয়, এই কাব্যগ্রন্থটি তার এক মূর্ত প্রতীক।
৩. ব্রিটিশ সরকারের রোষানল, নিষেধাজ্ঞা ও বিচার
- সরকারি নিষেধাজ্ঞা: ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১২৪-এ (রাজদ্রোহ) এবং ১৫৩-এ (ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের মিথ্যা অভিযোগ) ধারায় ১৯৩১ সালে ‘প্রলয়শিখা’ কাব্যগ্রন্থটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়।
- কবির দণ্ড ও জামিন: কেবল বইটি বাজেয়াপ্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি শাসকদল; এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘প্রলয়শিখা’, ‘যতীন দাস’, ‘পূজা-অভিনয়’, ‘হবে জয়’, ‘জাগরণ’ এবং ‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ কবিতাগুলোর জন্য নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং হাইকোর্ট থেকে তাঁকে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পরবর্তীতে ৫০০ টাকার মুচলেকায় কবি জামিনে মুক্ত হন।
৪. মূল ভাবাদর্শ ও বিশ্বদর্শনের স্তম্ভ
- মহাকালের প্রলয়-নাচন: কাব্যের শিরোনাম কবিতা ‘প্রলয়শিখা’-য় কবি হিন্দু পৌরাণিক রূপক ‘কাল-ভৈরব’ ও ‘রুদ্রদেব’-কে আবাহন জানিয়েছেন। পুরানো জরা, দাসত্ব ও পরাধীনতাকে ধ্বংস করে নতুন ভোর আনতে মহাকালের তাণ্ডব নৃত্য অপরিহার্য—এই বার্তাই এতে প্রস্ফুটিত।
- শহীদের রক্তে স্বাধীনতার বন্দনা: লাহোর জেলে আত্মাহুতি দেওয়া অমর বিপ্লবী যতীন দাসকে উৎসর্গ করে রচিত ‘যতীন দাস’ কবিতায় কবি বিপ্লবীদের রক্তদানকে দেবতার অর্ঘ্য হিসেবে সম্মান জানিয়েছেন।
- ছদ্ম-ধর্ম ও ধনতান্ত্রিক ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন: ‘পূজা-অভিনয়’ কবিতায় নজরুল দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ মাটির দেবী গড়ে স্বর্গ খোঁজে, কিন্তু রক্ত মাংসের জীবন্ত মানুষকে শৃঙ্খলে পিষে মারে। ধনকুবেরদের মেকি ধর্মীয় সাজ ও শোষণের বিরুদ্ধে কবি সোচ্চার হয়েছেন।
- যৌবনের প্রতি সংকল্প-আবাহন: ‘যৌবন’, ‘জাগরণ’ ও ‘হবে জয়’ কবিতাগুলোতে কবি স্পষ্ট করেছেন যে ইতিহাস রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি তরুণ সমাজ। পেছনের ভয় ও অন্যায়ের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে জয়ের পতাকা উড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার বৈপ্লবিক নির্দেশনা রয়েছে এতে।
৫. সাহিত্যিক শৈলী ও নান্দনিকতা
‘প্রলয়শিখা’য় ব্যবহৃত শব্দাবলি যেন এক একটি জ্বলন্ত অঙ্গার। কবি তৎসম সংস্কৃত শব্দের সাথে ওজস্বী দেশীয় ও আরবি-ফারসি ক্রিয়াপদ যুক্ত করে এক প্রলয়ঙ্করী ছন্দ ও লয় তৈরি করেছেন। দ্রুত তাল ও বীররসের অলংকার কবিতাগুলোকে আবৃত্তির উপযোগী এবং সরাসরি জনসভায় কণ্ঠে তোলার মতো সাঙ্গীতিক শক্তি প্রদান করেছে।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়শিখা’ পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল মোচনের এক ঐতিহাসিক দীপশিখা হয়ে আজও বাংলা সাহিত্যে অমলিন হয়ে রয়েছে।
‘প্রলয়শিখা’ কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র
- প্রলয়শিখা
- নমস্কার
- হবে জয়
- পূজা-অভিনয়
- যৌবন
- ভারতী-আরতি (গান)
- খেয়ালি
- রঙিন পেয়ালা
- বহ্নি-শিখা
- জাগরণ
- যতীন দাস
- নব-ভারতের হলদিঘাট
- বিংশ শতাব্দী
- শূদ্রের জাগরণ



![‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ!’ [ যুগবাণী, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম গেছে দেশ দুঃখ নাই, এবার তোরা মানুষ হ!, যুগবাণী প্রবন্ধ, কাজী নজরুল ইসলাম](https://amarnazrul.com/wp-content/uploads/2024/08/গেছে-দেশ-দুঃখ-নাই-এবার-তোরা-মানুষ-হ-যুগবাণী-প্রবন্ধ-কাজী-নজরুল-ইসলাম-1024x536.jpg)














