বাংলা কাব্যসংগীতের ইতিহাসে ১৯৩২ সালটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংগীতসাধনার এক মহাসাধনার বছর। এই একই বছরে একদিকে যেমন প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর আধ্যাত্মিক তেজস্বিতায় ভরা ইসলামি গীতি-সংকলন ‘জুলফিকার’ এবং প্রকৃতি ও প্রেমের গানভিত্তিক ‘বনগীতি’, ঠিক অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশ করেন তাঁর গীতিজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও রোমান্টিক সংকলন ‘সুর-সাকী’ (১৯৩২)। মধ্যপ্রাচ্যের সুফি দর্শন, ফার্সি গজলের মাদকতা, সাকী ও সুরার রূপক এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগসংগীতের অপূর্ব মেলবন্ধনে রচিত এই গ্রন্থটি বাংলা গীতিসাহিত্যের দরবারে গজলের ভাবরসকে চিরস্থায়ী আসন এনে দিয়েছিল।
Table of Contents
Toggleঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রকাশনা ইতিহাস
গ্রামোফোন যুগ ও গীতি-বিপ্লব
‘সুর-সাকী’: নামকরণের ফার্সি রূপক ও কাব্যদর্শন
সুরের সুরা ও ভাবের সাকী
ভাববস্তু ও সংগীতিক বৈচিত্র্য
১. ফার্সি গজলের অনবদ্য প্রভাব
২. ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগের রূপায়ন
৩. প্রেম, বিরহ ও সুফি আধ্যাত্মিকতা
‘সুর-সাকী’ সংকলনের প্রখ্যাত গানসমূহের তালিকা
১. প্রখ্যাত গজল ও চঞ্চল প্রণয়গীতি:
- বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিস নে আজি দোল: (পিলু-বারোঁয়া / দাদরা) — বাংলা গজলের ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও রূপকভিত্তিক প্রেমগীতি।
- লাইলী তোমার এসেছে ভুলিয়া মজনুর গান শুনে: (খাম্বাজ / কাওয়ালি) — কায়েস ও লাইলীর ঐতিহাসিক প্রণয়গাথার সুরময় পরিবেশনা।
- বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে: (ভৈরবী / কাওয়ালি) — বিরহ ও সুফি মেজাজের এক অনবদ্য গজল।
- কে বিদেশী মন-উদাসী বাঁশী বাজাও বনে: (পিলু / দাদরা) — দূর বাঁশির সুরে উদাস হয়ে যাওয়া মনের আকুলতা।
- কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে এলে অনুরাগী: (খাম্বাজ / দাদরা) — মান-অভিমান ও মিষ্টি অনুযোগের গজল।
২. বিরহ, বেদনা ও ব্যাকুলতার সুর:
- মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর: (ভৈরবী / দাদরা) — স্বপ্নে প্রিয়তমের আগমন ও জাগরণের বিরহ।
- তুমি শুনিতে চেয়ো না মোর কথা: (মিশ্র ভৈরবী / কাহারবা) — নিজের বুকের জমাট বাঁধা দুঃখ গোপন রাখার সুকোমল আকুতি।
- কেন মিছে আশা জাগায়ে গেলে: (জৌনপুরী / দাদরা) — অপ্রাপ্তি ও স্মৃতির ভারে পীড়িত হৃদয়ের প্রশ্ন।
- আজ নিশীথে কোন পরবাসী: (দরবারি কানাড়া / কাওয়ালি) — নির্জন রাতের অন্ধকারে দূর প্রবাসীর জন্য কান্না।
- কেন কাঁদে পরান কি বেদনায়: (কাফি / দাদরা) — অকারণ মন খারাপ ও অজানা বিরহের সুর।
৩. প্রকৃতি, অরণ্য ও চঞ্চল সুরের গান:
- আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে কে: (পিলু / দাদরা) — প্রকৃতির মাঝে চঞ্চল প্রেমের স্পর্শ।
- চমকে চমকে ধীর পায়ে (বন-হরিণী আসে): (পাহাড়ি-পিলু / কাহারবা) — অরণ্যের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও হরিণীর চলার গতিময় চিত্ররূপ।
- আসে বসন্ত ফুল-বনে: (পিলু-পাহাড়ি / কাহারবা) — প্রকৃতিতে বসন্তের আগমনে রূপের মেলা।
- পিয়াপিয়া পপিহা বোলে: (পিলু / দাদরা) — পপিহা পাখির ডাকে প্রিয়হারানো মনের ব্যাকুলতা।
- বোল গো বোল কোয়েলিয়া: (পিলু / কাহারবা) — কোকিলের বারতায় প্রিয়জনের খোঁজ নেওয়ার আকুল চেষ্টা।
৪. রূপক, নদীর সুর ও আত্মানুসন্ধান:
- আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী: (ভাটিয়ালি-কাফি / দাদরা) — জীবননদীর বাঁকে কূল হারানোর রূপকে আত্মানুসন্ধান।
- উছল নদী থির হলো: (ভাটিয়ালি / কাহারবা) — বহমান নদীর থমকে দাঁড়ানোর মাধ্যমে থমকে যাওয়া মনের ছবি।
- নয়ন ভরে দেখব তোরে: (কাফি / দাদরা) — প্রিয়জনকে কাছে বসিয়ে তৃষ্ণার্ত চোখে দেখার চিরন্তন ইচ্ছা।
- দূর দীপবর্তিকা: (ছায়ানট / তিতাল) — দূর দিগন্তে জ্বলে থাকা আশার আলোর প্রতি আকুলতা।
- অরুণ-কান্তি কে গো যোগী-বর: (ভৈরবী / দাদরা) — প্রভাতের আলোর রূপে পরম পুরুষের আগমনী।
ভাষা, শব্দশৈলী ও রূপকল্প
“বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিস নে আজি দোল,আজো তার অলস চোখ ঘুম-জাগানো রিমঝিমিকির গান শোনেনি…”
বাংলা সংগীতে ‘সুর-সাকী’-এর কালজয়ী স্থান
‘সুর-সাকী’ গ্রন্থটি প্রকাশের পর তৎকালীন বাংলা সংগীত জগতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আঙুরবালা, ইন্দুবালা, কে মল্লিক, শচীন দেব বর্মন এবং কে. এল. সাইগলের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠে এই সংকলনের গানগুলো রেকর্ড হয়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা গানকে কথা ও ভাবের যে সূক্ষ্মতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, নজরুল ‘সুর-সাকী’-র মাধ্যমে তাতে যুক্ত করেছিলেন ফার্সি গজলের উথাল-পাথাল আবেগ এবং রাগের উন্মাদনা। এই সংকলনটি প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা ফার্সি গজলের মেজাজকে কতটা স্বাভাবিকভাবে আপন করে নিতে পারে।
সংকলনটির একনজরে রূপরেখা
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| গ্রন্থের নাম | সুর-সাকী |
| রচয়িতা | কাজী নজরুল ইসলাম |
| প্রকাশকাল | ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| মূল প্রকাশক | ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা |
| গ্রন্থের ধরন | ফার্সি গজল, রাগাশ্রিত ও রোমান্টিক গীতি-সংকলন |
| নামকরণের তাৎপর্য | সুরকে ‘সুরা’ (মদ্য) ও পরিবেশককে ‘সাকী’ রূপকে উপস্থাপন |
| প্রধান বৈশিষ্ট্য | ফার্সি গজলের অঙ্গ, রাগাশ্রিত সুর, প্রেম-বিরহের সর্বজনীন রূপ |
| সাংস্কৃতিক অবদান | বাংলা সুশীল সংগীতে গজলের স্থায়ী ও সম্মানজনক আসন প্রতিষ্ঠা |




















