ইউরোপীয় রেনেসাঁস বা নবজাগরণের ইতিহাসে ‘বৈশ্বিক মানুষ’ বা Homo Universalis (Universal Man/Citizen of the World)-এর ধারণাটি মানবসভ্যতার চিন্তাজগতে এক নতুন আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিল। জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় সীমানা, ভাষা ও ভূগোলের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ সেদিন নিজেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে চিনতে শিখেছিল। ‘ডেসাইডেরিয়াস এরাসমাস’ (১৪৬৯–১৫৩৬)—যাঁকে ‘প্রিন্স অব হিউম্যানিস্টস’ বলা হয়—তাঁর সম্পর্কে সমকালীন পণ্ডিতেরা বলতেন: “He belonged to no nation” (তিনি কোনো একক জাতির নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের)। ইউরোপের এই মানবতাবাদী দর্শন মানুষকে ধর্মের বাহ্যিক সংজ্ঞার বাইরে এনে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

Table of Contents
Toggleরামমোহন-রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল: ‘বিশ্বমানব’ ভাবনার রূপান্তর
ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে বাংলায় যে আধুনিক আলোকপ্রাপ্তির সূচনা হয়েছিল, তা রামমোহন রায়ের সর্বধর্মীয় তুলনা ও মুক্তচিন্তার মাধ্যমে সংহত রূপ পেতে শুরু করে। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাব্যে ও চিন্তায় ‘বিশ্বমানব’ (Universal Man)-এর এক অমল ও আধ্যাত্মিক রূপকল্প নির্মাণ করেন।
কিন্তু নজরুলের বিশ্বমানবতা কেবল কোনো উচ্চমার্গীয় দার্শনিক তত্ত্ব বা তত্ত্বীয় সৌন্দর্য ছিল না; তা ছিল মাটি ও মানুষের সাথে মেশা এক বৈপ্লবিক বাস্তবতা। রেনেসাঁস-পূর্ব ইউরোপে ‘মানুষ’ বলতে মূলত একজন ‘খ্রিস্টান’ কিংবা মধ্যযুগীয় ভারতে একজন ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলিম’-কে বোঝানো হতো। মানবতাবাদ সেই সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছিল। নজরুল রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে এসে সেই চিন্তাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে সাম্যবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারের সাথে যুক্ত করলেন। নজরুলের ‘বিশ্বমানব’ কেবল উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধি নয়; সেই বৈশ্বিক ক্যানভাসে স্থান পেয়েছে কুলি, মজুর, বারাঙ্গনা, কবি, চাষি এবং পৃথিবীর সমস্ত অত্যাচারিত মানুষ।
১৯২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে তিনি উচ্চকণ্ঠে আবাহন করেছিলেন সেই অখণ্ড মানবতাকে:
“যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান।”— (সাম্যবাদী, ১৯২৫)
মধ্যযুগীয় মিশ্র-সংস্কৃতি বনাম নজরুলের মৌলিক অখণ্ড মানবতাবাদ
“দেও পূজা ক্ষমা দেহ ঝুঁটি মালা ছাড়,এক ভাবে নবীর কলেমা মুখে পড়।”
নজরুল কিন্তু এই ধরনের আপসমূলক বা আচারসর্বস্ব সমন্বয়বাদের পথ হাঁটেননি। তিনি ধর্মীয় প্রথা বা আচারকে সাময়িক মেলাতে চাননি, বরং তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ওপর মানুষের মৌলিক অস্তিত্ব ও প্রজ্ঞাকে স্থান দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, পৃথিবীর প্রধান ধর্মপ্রবর্তক ও মহামানবদের আগমন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য হয়নি; বরং তাঁদের বার্তা ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য।
তাঁর প্রখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ রুদ্র-মঙ্গল (১৯২৭)-এর ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি ক্ষুরধার ভাষায় লিখেছিলেন:
“অবতার, পয়গম্বর কেউ বলেননি—আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি বিশ্বমানব বা খ্রিস্টানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন—আমি মানুষের জন্য এসেছি, আলোর মত, সকলের জন্য।”
হৃদয়-তীর্থ ও বিশ্বনাগরিকত্বের সর্বোত্তম প্রকাশ
নজরুলের চিন্তায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা প্যাগোডা মানুষের শেষ পরিচয় নয়। মানবহৃদয়ই হলো জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ উপাসনালয়। ১৯২৬ সালে কলকাতায় যখন রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তুঙ্গে, তখন ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতায় তিনি জাতি-ধর্মের উর্ধ্বে উঠে প্রশ্ন তুলেছিলেন— “হিন্দু না তারা মুসলিম? ঐ জিজ্ঞেস কোন জন হে! / কাণ্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!”
যেখানে একজন ডুবে যাওয়া মানুষকে তিনি কোনো ধর্মের অনুসারী হিসেবে না দেখে কেবল ‘মানুষ’ ও ‘নিজের সন্তান’ হিসেবে দেখেছেন, সেখানেই তাঁর বিশ্বনাগরিক চেতনার পরম পরাকাষ্ঠা।
“হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।”কিংবা—“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”

সমকালীন বিশ্বে ‘বৈশ্বিক নজরুল’-এর মহীয়সী প্রাসঙ্গিকতা
কাজী নজরুল ইসলামকে কেবল একটি বিশেষ ভূখণ্ড, ভাষা বা ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখা তাঁর বৈশ্বিক চেতনার প্রতি অন্যায়। তিনি বিশ্বময় ঘুরে বেড়ানো এক মুক্তিকামী আত্মা (Free Soul)। তিনি একাধারে পারস্যের সুফি কবিদের প্রেমানুভূতি, ইউরোপের রেনেসাঁসের যুক্তিবাদ, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের শোষিত শ্রেণির সাম্যবাদ এবং ভারতবর্ষের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের সুষমাকে একসুতোয় গেঁথেছিলেন।
আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যখন বিশ্বজুড়ে অতি-জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় উগ্রতা ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে—তখন ‘বৈশ্বিক মানুষ’ হিসেবে নজরুলের আহ্বান আরও বেশি জরুরি ও দিকনির্দেশক হয়ে উঠেছে। নজরুল আমাদের শেখান:
- মানবতাই মানুষের একমাত্র মূলগত পরিচয়।
- প্রেম ও সহমর্মিতাই বিশ্বজুড়ে দেওয়াল না তুলে সেতু গড়ার একমাত্র শক্তি।
- সত্যিকারের প্রজ্ঞা ও কবিসত্তা কোনো সীমানায় বন্দী থাকে না; তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে বিশ্বময় প্রতিধ্বনিত হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম তাই কেবল বাংলাদেশের জাতীয় কবি বা বাঙালি জাতির কবি নন; তিনি বিশ্বসাহিত্যের দরবারে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সেই চিরন্তন ‘বিশ্বমানব’—যিনি সমস্ত বিভেদ মুছে মানুষকে কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন প্রবিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, শিক্ষা ও আইসিটি উদ্যোক্তা, লেখক, সমাজসেবক এবং অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার অনুরাগী। জাতীয় পর্যায়ে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা প্রসারে অবদানের পাশাপাশি তিনি আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ভাবধারাকে দেশ ও দেশের বাইরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসে এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি একটি শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠানের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিআইও) হিসেবে দীর্ঘ সময় কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গুরুকুল নেটওয়ার্ক’। এর অধীনে ‘গুরুকুল অনলাইন লার্নিং নেটওয়ার্ক’, ‘গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক’, ‘গুরুকুল আইটি এনাবলড সার্ভিসেস’ ও ‘গুরুকুল কমার্শিয়াল’-এর মতো বহুমুখী কারিগরি ও প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষানীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অবদানের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে তিনি ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ (বাপেক্স)-এর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ছিলেন।
গণমাধ্যম ও চিন্তা-সাহিত্যের অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা সুদীর্ঘ। তিনি ‘দৈনিক আজকের আলো’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক এবং জাতীয় অনলাইন পোর্টাল ‘জিলাইভ’ ও ‘দৈনিক খবরওয়ালা’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে সংবাদমাধ্যমের পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ গঠন এবং বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক পরিচয়কে একসূত্রে গেঁথে তিনি একাধিক গ্রন্থ ও নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভাবনাকেন্দ্রিক তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী ও নিবন্ধগুলো নীতি-নির্ধারণী মহলে সমাদৃত। একই সাথে, বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় ও ঐতিহ্যকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে তাঁর রচিত ‘আমার সংস্কৃতি’ গবেষণা সিরিজ সাহিত্যপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; যারই প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণের জন্য এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘সুফি ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করা, যুবসমাজকে প্রযুক্তিদক্ষ করে গড়ে তোলা এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রদানে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে তিনি নিজ জন্মভূমি কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) অঞ্চলের শিক্ষা, প্রযুক্তি, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় সক্রিয় অবদান রেখে চলেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষা ও জাতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একটি স্বাবলম্বী ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য।























