Editor's Choice

মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে, চন্দ্রবিন্দু | নজরুল সঙ্গীত

প্রকৃতির স্নিগ্ধ শোভা, ঋতুরাজ বসন্তের শুভাগমন এবং হংসমিথুনের লীলায়িত নৃত্যমাধুর্যের এক অনন্য চিত্ররূপময় সৃষ্টি “মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে”। কাজী নজরুল ইসলামের বিশিষ্ট গীতিসংকলন ‘চন্দ্রবিন্দু’-র (১৯৩১) অন্তর্ভুক্ত এই প্রকৃতি ও নৃত্যগীতিতে ধ্রুপদী সংস্কৃত কাব্যের ধ্বনিমাধুর্যের সাথে বাংলার শ্যামল রূপের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। পিলু-খাম্বাজ রাগের চঞ্চল-মধুর সুরবিন্যাস এবং কাহারবা তালের গতিশীল ছন্দে কবি এখানে জলাশয়ে রাজহাঁসের আলস্যভরা নৃত্য, পদ্মের দোলন এবং অন্ধকারের বুক চিরে ভোরের নবীন সূর্যের জাগরণকে এক অপরূপ আনন্দযজ্ঞে রূপায়িত করেছেন।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামমৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে
পর্যায়প্রকৃতি পর্যায় (বসন্ত ও ঋতুগীতি / নৃত্যগীত)
সংগীত সংকলনচন্দ্রবিন্দু (আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ / সেপ্টেম্বর ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ)
উৎসর্গশ্রীমদ্দাঠাকুর শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত মহাশয়ের শ্রীচরণকমলে
গীতিকার ও সুরকারকাজী নজরুল ইসলাম
সংগীতধারানজরুল সঙ্গীত (নৃত্যনাট্যধর্মী রাগপ্রধান গান)
রাগপিলু-খাম্বাজ
তালকাহারবা (আট মাত্রা: ৪+৪)
মূল উপজীব্যবসন্তের পদধ্বনি, রাজহাঁসের আনন্দনৃত্য, অন্ধকারের অবসান, প্রকৃতির নবজাগরণ ও মিলনের উল্লাস
প্রধান চিত্রকল্পমরাল (রাজহাঁস), তরঙ্গ-হিন্দোল, শতদল, শিশু অরুণ, অমা-যামিনী, বকুল গন্ধ, নন্দন-উপহার, শঙ্খধ্বনি, কুহু-কেকা
আবেগীয় আবহস্নিগ্ধ আনন্দ, রূপময় রোমাঞ্চ, মাধুর্য ও নবজীবনের উল্লাস

মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে গানের কথা:

মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে
মরাল মদালস নাচে আনন্দে।।
তরঙ্গ হিন্দোলে শতদল দোলে
শিশু অরুণে জাগায় অমা-যামিনীর কোলে
শুষ্ক কানন ভরে বকুল গন্ধে।।
নন্দন-উপহার ধরণীর ক’রে
শুভ্র পাখায় শুভ আশিস ঝরে।
মিলন, বসন্তের দূত আগমনী
কণ্ঠে সুমঙ্গল শঙ্খের ধ্বনি
কুহু কেকা গাহে মধুর ছন্দে।।

Mridul Monde Monjul Chhonde Gaaner Kotha:

Mridul monde monjul chhonde
Moral modalosh nache anonde.
Torongo hindole shotodol dole
Shishu orune jagay oma-yaminir kole
Shushko kanon bhore bokul gondhe.
Nondon-upohar dhoronir kore
Shubhro pakhay shubho ashish jhore.
Milon, boshonter dut agomoni
Konthe shumongol shonkher dhwoni
Kuhu keka gahe modhur chhonde.

গানের মূল ভাব

“মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে” গানটির মূল নির্যাস হলো প্রকৃতির রূপময় গতিশীলতা এবং শীতের জরা কাটিয়ে জীবনের নবজন্মকে উদযাপন করা। ধ্রুপদী ভারতীয় সাহিত্যের রাজহাঁস (মরাল) কেবল একটি পাখি নয়, তা পবিত্রতা, শুভ্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। হংসের মদালস বা আলস্যময় মৃদু পদচারণা ও ডানা মেলার ভঙ্গি সমগ্র প্রকৃতিকে এক মোহময় নৃত্যের রূপ দান করে।
গানটিতে আঁধারের বিনাশ এবং আলোর জয়ের এক মহাজাগতিক রূপ ফুটে উঠেছে। অমাবস্যার নিকষ অন্ধকারের বুক চিরে যেমন নবীন শিশু সূর্যের (অরুণ) জন্ম হয়, তেমনি শীতের রুক্ষতায় শুকিয়ে যাওয়া অরণ্য হঠাৎ বকুল ফুলের মাতাল সুবাসে ভরে ওঠে। স্বর্গীয় নন্দনকাননের আশীর্বাদ হয়ে মর্ত্যভূমিতে আবির্ভূত হয় বসন্তের দূত। কোকিলের কুহুতান এবং ময়ূরের কেকাধ্বনির যুগলবন্দিতে বিশ্বচরাচরে মিলনের যে শঙ্খধ্বনি বেজে ওঠে, গানটি সেই অবিনাশী সৌন্দর্যকেই বন্দনা করে।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. হংসের নৃত্য ও ধ্বনিময় সঞ্চালন

  • “মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে, মরাল মদালস নাচে আনন্দে…”
    গানটির সূচনাই হয় অত্যন্ত মনোহর এক অনুপ্রাসসমৃদ্ধ ধ্বনিঝংকারের মাধ্যমে। মৃদুমন্দ ও মনোরম ছন্দে রাজহাঁস তার স্বাভাবিক আলস্য ও রূপের আবেশ নিয়ে জলাশয়ের বুকে নৃত্য করছে। শব্দের চলনেই হাঁসের ডানার গতি ও জলের আলোড়ন জীবন্ত হয়ে ওঠে।

২. পদ্মের হিন্দোল ও নবীন আলোর জাগরণ

  • “তরঙ্গ হিন্দোলে শতদল দোলে, শিশু অরুণে জাগায় অমা-যামিনীর কোলে / শুষ্ক কানন ভরে বকুল গন্ধে…”
    প্রকৃতির নবজাগরণের এক অসাধারণ চিত্রকল্প। ঢেউয়ের মৃদু দোলনায় প্রস্ফুটিত পদ্মফুল নাচছে। দীর্ঘ অন্ধকারের কোলে সদ্যোজাত সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পৃথিবীর ঘুম ভাঙাচ্ছে এবং রুক্ষ, শুষ্ক বনভূমি বকুলের সতেজ ঘ্রাণে নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

৩. নন্দন-আশীর্বাদ ও শুভ্র ডানার প্রসার

  • “নন্দন-উপহার ধরণীর ক’রে, শুভ্র পাখায় শুভ আশিস ঝরে…”
    স্বর্গের সাথে মর্ত্যের সংযোগ। শুভ্র রাজহাঁসের ডানা মেলা যেন ধরণীর বুকে স্বর্গের পবিত্র আশীর্বাদ ঝরে পড়ার মতো। তার প্রতিটি সঞ্চালনে পার্থিব জরা দূর হয়ে কল্যাণময় বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।

৪. বসন্তের আগমনী ও কুহু-কেকার সংগীত

  • “মিলন, বসন্তের দূত আগমনী, কণ্ঠে সুমঙ্গল শঙ্খের ধ্বনি / কুহু কেকা গাহে মধুর ছন্দে…”
    ঋতুরাজ বসন্তের পূর্ণ অভিষেক। প্রকৃতিতে যেন এক পরম মিলনের সানাই বাজছে। হংসের কণ্ঠধ্বনি রূপ নিয়েছে মাঙ্গলিক শঙ্খের রবে; আর সেই সুরে সুর মিলিয়ে কোকিল ও ময়ূর পঞ্চমে তান তুলে চরাচরকে উৎসবমুখর করে তুলছে।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

গানটিতে বসন্তের প্রাণচাঞ্চল্যের পটভূমিতে বিগত শীতের রুক্ষতা ও অন্ধকার অমা-যামিনীর অবসানের এক নীরব রূপক রয়েছে। দীর্ঘ শীতের রিক্ততায় শুষ্ক কানন যখন পত্রপুষ্পহীন হয়ে পড়েছিল এবং চারপাশের প্রকৃতিতে প্রাণের কোনো আশা ছিল না, তখন সেই আশাহীন নয়ন কেবল এক ধূসর শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। অতীতের সেই রিক্ততা ও স্থবিরতার কাছ থেকে চিরতরে বিদায় নেওয়ার আঘাত অতিক্রম করেই নতুন কচি পাতার জন্ম হয়। আশাহীন চোখে দীর্ঘ অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে যখন শিশু অরুণ ও বকুলের সুবাস এসে ধরা দেয়, তখন বিদায়ের সেই পুরনো ক্ষতই নবজীবনের অপার আনন্দে রূপান্তরিত হয়।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • কালিদাসীয় ধ্রুপদী বাতাবরণ: কালিদাসের ‘ঋতুসংহার’ বা ‘মেঘদূত’-এর মতো সংস্কৃত সাহিত্যের মার্জিত রূপকল্প (মরাল, শতদল, মদালস, অরুণ, কেকা) ব্যবহার করে নজরুল বাংলা কাব্যে এক রাজকীয় ও অভিজাত আবহ সৃষ্টি করেছেন।
  • অনুপম অনুপ্রাস ও ধ্বনিঝংকার: ‘মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে’—’ম’ ও ‘ন’-এর সুষম পুনরাবৃত্তি এবং প্রতিটি চরণে অভ্যন্তরীণ মিল পুরো গানটিতে এক নৃত্যময় আবহ তৈরি করেছে।
  • ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপক (Sensory Imagery): জলের তরঙ্গ ও পদ্মের দোলা (দৃষ্টি), বকুলের গন্ধ (ঘ্রাণ), এবং শঙ্খ ও কুহু-কেকার ধ্বনি (শ্রবণ)—সব মিলিয়ে গানটি পঞ্চইন্দ্রিয়কে একযোগে তৃপ্ত করে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • পিলু-খাম্বাজের মাধুর্য ও চপলতা: হালকা শাস্ত্রীয় রাগ ‘পিলু’ এবং ‘খাম্বাজ’-এর মিশ্রণে গানটির সুর নির্মিত। পিলুর বিষাদমাখা মিষ্টি টান এবং খাম্বাজের উজ্জ্বল চঞ্চলতা মিলে বসন্তের রূপ ও নৃত্যের আনন্দকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে।
  • কাহারবা তালের গতিশীল লয়: আট মাত্রার কাহারবা তালের চটুল ও ছন্দময় চলন গানের ‘মদালস নাচে আনন্দে’-র ভাবকে মূর্ত করে তোলে। নাচের তাল ও পায়ের নূপুরের ছন্দের সাথে এই তালের সাযুজ্য অসাধারণ।
  • স্বরবিন্যাসের নমনীয়তা: সুরের কোমল ও শুদ্ধ স্বরের ওঠানামা এমনভাবে বিন্যস্ত যাতে বাণীর ললিত রূপ কোনোভাবেই মার্গ সংগীতের ভারী চাপে ম্লান না হয়।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি ও বহুবিধ সুরের জাদুকর। নজরুলের সৃষ্টির এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে নিসর্গ ও ঋতুভিত্তিক গান। প্রকৃতিকে কেবল বিমূর্তভাবে না দেখে ইন্দ্রিয়ঘন রঙ ও তালের সমারোহে উপস্থাপন করায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
  • চন্দ্রবিন্দু গীতিগ্রন্থের বৈচিত্র্য: ১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থে পুত্রশোক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের পাশাপাশি এই ধরণের উচ্চমানের ধ্রুপদী নৃত্যগীতের উপস্থিতি প্রমাণ করে নজরুলের মানসিক শক্তি ও সংগীতের দিগন্ত কতটা বিস্তৃত ছিল।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“মৃদুল মন্দে মঞ্জুল ছন্দে” গানটি বাংলা ধ্রুপদী ও কত্থক-মণিপুরি নৃত্যের অঙ্গনে এক অপরিহার্য নৃত্যগীত হিসেবে বহুল পরিচিত। বসন্তোৎসব, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী এবং ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনাগুলোতে নৃত্যশিল্পীরা এই গানের ছন্দময় গতি ও রূপকল্পকে মঞ্চে রূপায়িত করতে অত্যন্ত আনন্দ বোধ করেন। সুর, কাব্য ও নৃত্যের এক অপূর্ব ত্রিবেনী সংগম হিসেবে গানটি নজরুলগীতির এক চিরকালীন সম্পদ।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. চন্দ্রবিন্দু (প্রথম সংস্করণ, আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ / ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ), কাজী নজরুল ইসলাম, ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা।
  2. নজরুল রচনাবলী (ঋতু ও নৃত্যগীত সংকলন), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
  3. নজরুল সুরলিপি ও রাগকোষ, সুফি জুলফিকার হায়দার।
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত