Editor's Choice

বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থের ‘উৎসর্গ’ – কাজী নজরুল ইসলাম

উৎসর্গ

বাংলার অগ্নি-নাগিনি মেয়ে মুসলিম-মহিলা-কুল-গৌরব

আমার জগজ্জননী-স্বরূপা মা

মিসেস এম. রহমান সাহেবার

পবিত্র চরণারবিন্দে –

  

এমনই প্লাবন-দুন্দুভি-বাজা ব্যাকুল শ্রাবণ মাস –

সর্বনাশের ঝান্ডা দুলায়ে বিদ্রোহ-রাঙা-বাস

ছুটিতে আছিনু মাভৈঃ-মন্ত্র ঘোষি অভয়কর,

রণ-বিপ্লব-রক্ত-অশ্ব কশাঘাত-জর্জর!

সহসা থমকি দাঁড়ানু আমার সর্পিল-পথ-বাঁকে,

ওগো নাগমাতা, বিষ-জর্জর তব গরজন-ডাকে!

কোথা সে অন্ধ অতল পাতাল-বন্ধ গুহার তলে,

নির্জিত তব ফণা-নিঙড়ানো গরলের ধারা গলে;

পাতাল-প্রাচীর চিরিয়া তোমার জ্বালা-ক্রন্দন-চূর

আলোর জগতে এসে বাজে যেন বিষ-মদ-চিক্কুর!

আঁধার-পীড়িত রোষ-দোদুল সে তব ফণা-ছায়া-দোল

হানিছে গৃহীরে অশুভ শঙ্কা, কাঁপে ভয়ে সুখ-কোল।

ধূমকেতু-ধ্বজ বিপ্লব-রথ সম্ভ্রমে অচপল,

নোয়াইল শির শ্রদ্ধা-প্রণত রথের অশ্বদল!

ধূমকেতু-ধূম-গহ্বরে যত সাগ্নিক শিশু-ফণী

উল্লাসে ‘জয় জয় নাগমাতা’ হাঁকিল জয়-ধ্বনি!

বন্দিল, উর নাগ-নন্দিনী ভেদিয়া পাতাল-তল!

দুলিল গগনে অশুভ-অগ্নি পতাকা জ্বালা-উজল!

তারপর মা গো কোথা গেলে তুমি, আমি কোথা হনু হারা,

জাগিয়া দেখিনু, আমারে গ্রাসিয়া রাহু রাক্ষস-কারা!

শৃঙ্খলিতা সে জননীর ব্যথা বাজিয়া এ ক্ষীণ বুকে

অগ্নি হয়ে মা জ্বলেছিল খুন, বিষ উঠেছিল মুখে,

শৃঙ্খল-হানা অত্যাচারীর বুকে বাজপাখি সম

পড়িয়া তাহারে ছিঁড়িতে চেয়েছি হিংসা-নখরে মম, –

সে আক্রমণ ব্যর্থ কখন করেছে কারার ফাঁদ,

বন্দিনী দেশ-জননীর সাথে বেঁধেছে আমারে বাঁধ।

 

হাতে পায়ে কটি-গর্দানে মোর বাজে শত শৃঙ্খল,

অনাহারে তনু ক্ষুধা-বিশীর্ণ, তৃষায় মেলে না জল,

কত যুগ যেন এক অঞ্জলি পাইনিকো আলো বায়ু,

তারই মাঝে আসি রক্ষী-দানব বিদ্যুতে বেঁধে স্নায়ু –

এত যন্ত্রণা তবু সব যেন বুকে ক্ষীর হয়ে ওঠে,

শত্রুর হানা কণ্টক-ক্ষত প্রাণে ফুল হয়ে ফোটে!–

এরই মাঝে তুমি এলে নাগমাতা পাতাল-বন্ধ টুটি

অচেতন মম ক্ষত তনু পড়ে তব ফণা-তলে লুটি!

তোমার মমতা-মানিক-আলোকে চিনিনু তোমারে মাতা,

তুমি লাঞ্ছিতা বিশ্বজননী! তোমার আঁচল পাতা

নিখিল দুঃখী নিপীড়িত তরে; বিষ শুধু তোমা দহে

ফণা তব মা গো পীড়িত নিখিল ধরণির ভার বহে ! –

আমারে যে তুমি বাসিয়াছ ভালো ধরেছ অভয়-ক্রোড়ে,

সপ্ত রাজার রাজৈশ্বর্য মানিক দিয়াছ মোরে,

নহে তার তরে, – সব সন্তানে তুমি যে বেসেছ ভালো,

তোমার মানিক সকলের মুখে দেয় যে সমান আলো,

শুধু মাতা নহ, জগন্মাতার আসনে বসেছ তুমি, –

সেই গৌরবে জননী আমার, তোমার চরণ চুমি!

  

তোমার নাগ-শিশু

নজরুল ইসলাম

হুগলি

১৬ শ্রাবণ, ১৩৩১

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.