Editor's Choice

বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থের ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’ – কাজী নজরুল ইসলাম

অন্যায্য পরাধীনতা, সামাজিক কুসংস্কার ও শোষণের ঘোর অমানিশার বিরুদ্ধে সাম্যের দীপশিখা হাতে মহাকালের মঞ্চে কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব যেমন ছিল এক দীপ্ত অগ্নিকাণ্ড, তেমনই তাঁর নীরব প্রস্থান ও তিরোভাব বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে রেখে গেছে এক চিরন্তন ও অবিস্মরণীয় শূন্যতা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল ভাঙার তীব্র বিদ্রোহে কবি যখন বাজাচ্ছিলেন অগ্নিবীণা ও বিষের বাঁশি, ঠিক তখনই ১৯২৪ সালে প্রকাশিত তাঁর রাজনৈতিকভাবে বাজেয়াপ্ত কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশি’-তে সংকলিত হয় অবিনাশী কবিতা ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’।
পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল—বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আগমন ও প্রয়াণ অর্থাৎ আবির্ভাব ও তিরোভাবের পুণ্য স্মৃতিতে নিবেদিত এই কবিতাটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় স্তোত্র ছিল না; তা ছিল আত্মবিস্মৃত, সুপ্ত সমাজকে শৃঙ্খলমুক্ত করার এক বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান। নজরুল বিশ্বনবীর আবির্ভাবের সেই কালজয়ী জ্যোতিকে সমকালীন নিপীড়িত মানুষের মুক্তি, সাম্যবাদ ও সত্য প্রতিষ্ঠার অগ্নিমন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন। কবির নিজের জীবনের আবির্ভাব ও তিরোভাব স্মরণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে ‘বিষের বাঁশি’-র ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’ কবিতার সেই বিপ্লব ও চেতনার সুর আমাদের আত্মানুসন্ধান ও মানবমুক্তির পথে নতুন করে আলোকপাত করে।

বিষের বাঁশি [ ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ ]

[আবির্ভাব]

১
নাই তা জ
তাই লা জ?
ওরে
মুসলিম, খর্জুর-শিষে তোরা সাজ!
করে
তসলিম হর কুর্নিশে শোর আওয়াজ
শোন
কোন মুজ্‌দা সে উচ্চারে হেরা আজ
ধরা-মাঝ!
উরজ-য়্যামেন নজ্‌দ হেজাজ তাহামা ইরাক শাম
মেশের ওমান তিহারান স্মরি কাহার বিরাট নাম।
পড়ে
‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম।
চলে আঞ্জাম
দোলে তাঞ্জাম
খোলে
হুর-পরি মরি ফিরদৌসের হাম্মাম !
টলে
কাঁখের কলসে কওসর ভর , হাতে আব-জমজম জাম ।
শোন
দামাম কামান তামাম সামান নির্ঘোষি কার নাম
পড়ে
‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লানম।’
২
মস্ তান !
ব্যস থাম্!
দেখ
মশ্‌গুল আজি শিস্তান-বোস্তান ,
তেগ
গর্দানে ধরি দারোয়ান রোস্তাম ।
বাজে
কাহারবা বাজা, গুলজার গুলশান
গুলফাম !
দক্ষিণে দোলে আরবি দরিয়া খুশিতে সে বাগে-বাগ ,
পশ্চিমে নীলা ‘লোহিতে’র খুন-জোশিতে রে লাগে আগ,
মরু
সাহারা গোবিতে সব্‌জার জাগে দাগ!
নূরে কুর্শির
পুরে ‘তূর’ -শির,
দূরে
ঘূর্ণির তালে সুর বুনে হুরি ফুর্তির,
ঝুরে
সুর্খির ঘন লালি উষ্ণীষে ইরানি দূরানি তুর্কির!
আজ
বেদুইন তার ছেড়ে দিয়ে ঘোড়া ছুড়ে ফেলে বল্লম
পড়ে
‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাললাম।’
৩
‘সাবে ঈন’
তাবে ঈন
হয়ে
চিল্লায় জোর ‘ওই ওই নাবে দীন !
ভয়ে
ভূমি চুমে ‘লাত্ মানাত’ -এর ওয়ারেশিন ।
রোয়ে
ওয্‌যা-হোবল ইবলিস খারেজিন , –
কাঁপে জীন্ !
জেদ্দার পূবে মক্কা মদিনা চৌদিকে পর্বত,
তারই মাঝে ‘কাবা’ আল্লার ঘর দুলে আজ হর ওক্ত্ ,
ঘন
উথলে অদূরে ‘জম-জম’ শরবৎ!
পানি কওসর,
মণি জওহর
আনি
‘জিবরাইল’ আজ হরদম দানে গওহর ,
টানি
মালিক-উল-মৌত জিঞ্জির – বাঁধে মৃত্যুর দ্বার লৌহর।
হানি
বরষা সহসা ‘মিকাইল’ করে ঊষর আরবে ভিঙা ,
বাজে
নব সৃষ্টির উল্লাসে ঘন ‘ইসরাফিল’ -এর শিঙা!

৪

  
      জন্   জাল
  
      কঙ্   কাল
ভেদি,
ঘন জাল মেকি গণ্ডির পঞ্জার
ছেদি,
মরুভূতে একী শক্তির সঞ্চার!
বেদি
পঞ্জরে রণে সত্যের ডঙ্কার
  
              ওংকার!
  
শঙ্কারে করি লঙ্কার পার কার ধনু-টংকার
  
হুংকারে ওরে সাচ্চা-সরোদে শাশ্বত ঝংকার?
ভূমা-
নন্দে রে সব টুটেছে অহংকার!

  

  
      মর-  মর্মরে
  
      নর-  ধর্ম রে
বড়ো
কর্মরে দিল ইমানের জোর বর্ম রে,
ভর্
দিল্ জান্ – পেয়ে শান্তি নিখিল ফিরদৌসের হর্ম্য রে!
রণে
তাই তো বিশ্ব-বয়তুল্লাতে মন্ত্র ও জয়নাদ –
‘ওয়ে
মার্‌হাবা ওয়ে মার্‌হাবা এয়্ সর্‌ওয়ারে কায়েনাত !’

  

৫

  

  
      শর- ওয়ান
  
      দর্- ওয়ান
আজি
বান্দা যে ফেরউন শাদ্দাদ নমরুদ মারোয়ান ;
তাজি
বোর্‌রাক্ হাঁকে আশমানে পর্‌ওয়ান, –
ও যে
বিশ্বের চির সাচ্‌চারই বোর্‌হান –
  
              ‘কোর-আন’!
  
‘কোন্ জাদুমণি এলি ওরে’ – বলি রোয়ে মাতা আমিনায়
  
খোদার হবিবে বুকে চাপি, আহা, বেঁচে আজ স্বামী নাই!
দূরে
আব্‌দুল্লার রুহ্ কাঁদে, “ওরে আমিনারে গমি নাই –

  

দেখো
সতী তব কোলে কোন্ চাঁদ, সব ভর-পুর ‘কমি’ নাই।’
  
      ‘এয়্  ফর্ জন্দ’ –
  
       হায়   হর্‌দম্
ধায়
দাদা মোত্‌লেব কাঁদি, – গায়ে ধুলা কর্দম!
‘ভাই।
কোথা তুই?’ বলি বাচ্চারে কোলে কাঁদিছে হাম্‌জা দুর্দম!
ওই
দিক্‌হারা দিক্‌পার হতে জোর-শোর আসে, ভাসে ‘কালাম’ –
‘এয়
‘শাম্‌সোজ্জোহা বদরোদ্দোজা কামারোজ্জমাঁ’ সালাম!’

[তিরোভাব]

এ কী বিস্ময়! আজরাইলেরও জলে ভর-ভর চোখ!

বে-দরদ দিল্ কাঁপে থর-থর যেন জ্বর-জ্বর শোক।

জান-মরা তার পাষাণ-পাঞ্জা বিলকুল ঢিলা আজ,

কব্‌জা নিসাড়, কলিজা সুরাখ , খাক চুমে নীলা তাজ ।

জিব্‌রাইলের আতশি পাখা সে ভেঙে যেন খান খান,

দুনিয়ার দেনা মিটে যায় আজ তবু জান আন্-চান!

মিকাইল অবিরল

লোনা দরিয়ার সবই জল

ঢালে কুল মুল্লুকে , ভীম বাতে খায় অবিরল ঝাউ দোল।

এ কি দ্বাদশীর চাঁদ আজ সেই? সেই রবিয়ল আউওল ?

২

ঈশানে কাঁপিছে কৃষ্ণ নিশান, ইস্‌রাফিলের ও প্রলয়-বিষাণ আজ

কাতরায় শুধু! গুমরিয়া কাঁদে কলিজা-পিষানো বাজ!

রসুলের দ্বারে দাঁড়ায়ে কেন রে আজাজিল শয়তান?

তারও বুক বেয়ে আঁশু ঝরে, ভাসে মদিনার ময়দান!

জমিন্-আশমান জোড়া শির পাঁও তুলি তাজি বোর্‌রাক্ ,

চিখ্ মেরে কাঁদে ‘আরশে’ র পানে চেয়ে, মারে জোর হাঁক!

হুরপরি শোকে হায়

জল- ছলছল চোখে চায়।

আজ জাহান্নমের বহ্নি-সিন্ধু নিবে গেছে ক্ষরি জল,

যত ফিরদৌসের নার্গিস-লালা ফেলে আঁশু-পরিমল।

৩

মৃত্তিকা-মাতা কেঁদে মাটি হল বুকে চেপে মরা লাশ,

বেটার জানাজা কাঁদে যেন – তাই বহে ঘন নাভি-শ্বাস!

পাতাল-গহ্বরে কাঁদে জিন, পুন মলো কি রে সোলেমান ?

বাচ্চারে মৃগী দুধ নাহি দেয়, বিহগীরা ভোলে গান!

ফুল পাতা যত খসে পড়ে, বহে উত্তর-চিরা বায়ু,

ধরণির আজ শেষ যেন আয়ু, ছিঁড়ে গেছে শিরা স্নায়ু!

মক্কা ও মদিনায়

আজ শোকের অবধি নাই!

যেন রোজ-হাশরের ময়দান, সব উন্মাদসম ছুটে।

কাঁপে ঘন ঘন কাবা , গেল গেল বুঝি সৃষ্টির দম টুটে।

 

 

 

৪

নকিবের তূরী ফুৎকারি আজ বারোয়াঁর সুরে কাঁদে,

কার তরবারি খান খান করে চোট মারে দূরে চাঁদে?

আবুবকরের দর দর আঁশু দরিয়ার পারা ঝরে,

মাতা আয়েষার কাঁদনে মুরছে আশমানে তারা ডরে!

শোকে উন্মাদ ঘুরায় উমর ঘূর্ণির বেগে ছোরা,

বলে ‘আল্লার আজ ছাল তুলে নেব মেরে তেগ্ , দেগে কোঁড়া ।’

হাঁকে ঘন ঘন বীর –

‘হবে, জুদা তার তন শির,

আজ যে বলিবে নাই বেঁচে হজরত – যে নেবে রে তাঁরে গোরে।’

আজ দারাজ দস্তে তেজ হাতিয়ার বোঁও বোঁও করে ঘোরে!

৫

গুম্বজে কে রে গুমরিয়া কাঁদে মসজিদে মস্‌জিদে?

মুয়াজ্জিনের হোশ্ নাই, নাই জোশ চিতে, শোষ হৃদে!

বেলালেরও আজ কণ্ঠে আজান ভেঙে যায় কেঁপে কেঁপে,

নাড়ি-ছেঁড়া এ কী জানাজার ডাক হেঁকে চলে ব্যেপে ব্যেপে!

উস্‌মানের আর হুঁশ নাই কেঁদে কেঁদে ফেনা উঠে মুখে,

আলি হাইদর ঘায়েল আজি রে বেদনার চোটে ধুঁকে!

আজ ভোঁতা সে দুধারি ধার

ওই আলির জুলফিকার !

আহা রসুল-দুলালি আদরিণী মেয়ে মা ফাতেমা ওই কাঁদে,

‘কোথা বাবাজান।’ বলি মাথা কুটে কুটে এলোকেশ নাহি বাঁধে!

৬

হাসান-হুসেন তড়পায় যেন জবে-করা কবুতর,

‘নানাজান কই!’ বলি খুঁজে ফেরে কভু বার কভু ঘর।

নিবে গেছে আজ দিনের দীপালি, খসেছে চন্দ্র-তারা,

আঁধিয়ারা হয়ে গেছে দশ দিশি, ঝরে মুখে খুন-ঝারা!

সাগর-সলিল ফোঁপায়ে উঠে সে আকাশ ডুবাতে চায়,

শুধু লোনা জল তার আঁশু ছাড়া কিছু রাখিবে না দুনিয়ায়।

খোদ খোদা সে নির্বিকার,

আজ টুটেছে আসনও তাঁর!

আজ সখা মহ্‍বুবে বুকে পেতে দুখে কেন যেন কাঁটা বেঁধে,

তারে ছিনিবে কেমনে যার তরে মরে নিখিল সৃষ্টি কেঁদে!

 

৭

  

বেহেশ্‌ত     সব আরাস্তা আজ, সেথা মহা ধুম-ধাম,

গাহে        হুরপরি যত, ‘সাল্লালাহু আলায়হি সাল্‌লাম।’

কাতারে কাতারে করজোড়ে সবে দাঁড়ায়ে গাহিছে জয়, –

ধরিতে না পেরে ধরা-মা-র চোখে দর দর ধারা বয়।

এসেছে আমিনা আবদুল্লা কি, এসেছে খদিজা সতী?

আজ        জননীর মুখে হারামণি-পাওয়া-হাসা হাসে জগপতি!

‘খোদা,    একী তব অবিচার!’

বলে    কাঁদে সুত ধরা-মা-র।

আজ        অমরার আলো আরও ঝলমল, সেথা ফোটে আরও হাসি,

শুধু         মাটির মায়ের দীপ নিভে গেল, নেমে এল অমা-রাশি

  

                  *    *    *    *    *

  

আজ        স্বরগের হাসি ধরার অশ্রু ছাপায়ে অবিশ্রাম

ওঠে        একী ঘন রোল – ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম।’

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

    Join Us!

    Hey there! Here’s a neat way to recieve our latest posts & updates – just subscribe to our newsletter.

    Error: Contact form not found.

    Zero spam, Unsubscribe at any time.