কাজী নজরুল ইসলামের রাজদ্রোহের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত অগ্নিগর্ভ কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪)-এ সংকলিত ‘বন্দি-বন্দনা’ কবিতাটি মূলত পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী অকুতোভয় রাজনৈতিক বন্দিদের মহিমান্বিত ত্যাগ, অদম্য সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতি এক সশ্রদ্ধ বাচিক অর্ঘ্য। কবিতায় কবি ঔপনিবেশিক শাসনের শিকলে বন্দি বিপ্লবীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে দেখিয়েছেন যে, শোষকের অন্ধকার কারাগার ও লোহার গরাদ কখনোই মুক্তিকামী বীরদের আত্মার স্বাধীনতা ও সত্যের অগ্নিশিখাকে রুদ্ধ করতে পারে না। অত্যাচারী ব্রিটিশ রাজ ভেবেছিল রাজবন্দিদের কারারুদ্ধ করে বিপ্লবের আগুন নেভানো যাবে, কিন্তু কবি দৃপ্ত কণ্ঠে ব্যক্ত করেছেন যে, এই কারারুদ্ধ বীররাই জাতির অহংকার এবং তাঁদের ত্যাগ ও নির্যাতন ভোগই ঔপনিবেশিক শাসনের পতন ও স্বাধীনতার সূর্যকে ত্বরান্বিত করবে। ভীতিহীন সংগ্রাম, রাজবন্দিদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা ও মুক্তিচেতনার এই শাশ্বত জয়গান ‘বন্দি-বন্দনা’ কবিতাটিকে নজরুলের বৈপ্লবিক কাব্যচেতনার এক অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও অনুপ্রেরণাদায়ী সংগীতে পরিণত করেছে।
বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থের ‘বন্দি-বন্দনা’ কবিতা
[গান]
আজি
রক্ত-নিশি-ভোরে
একী এ শুনি ওরে,
মুক্তি-কোলাহল বন্দি-শৃঙ্খলে,
ওই
কাহারা কারাবাসে
মুক্তি-হাসি হাসে,
টুটেছে ভয়-বাধা স্বাধীন হিয়া-তলে॥
ললাটে লাঞ্ছনা-রক্ত-চন্দন,
বক্ষে গুরু শিলা, হস্তে বন্ধন,
নয়নে ভাস্বর সত্য-জ্যোতি-শিখা,
স্বাধীন দেশ-বাণী কণ্ঠে ঘন বোলে,
সে ধ্বনি ওঠে রণি ত্রিংশ কোটি ওই
মানব-কল্লোলে॥
ওরা
দু-পায়ে দলে গেল মরণ-শঙ্কারে,
সবারে ডেকে গেল শিকল-ঝংকারে,
বাজিল নভ-তলে স্বাধীন ডঙ্কারে,
বিজয়-সংগীত বন্দি গেয়ে চলে,
বন্দিশালা মাঝে ঝঞ্ঝা পশেছে রে
উতল কলরোলে॥
আজি
কারার সারা দেহে মুক্তি-ক্রন্দন,
ধ্বনিছে হাহা স্বরে ছিঁড়িতে বন্ধন,
নিখিল গেহ যথা বন্দি-কারা, সেথা
কেন রে কারা-ত্রাসে মরিবে বীর-দলে।
‘জয় হে বন্ধন’ গাহিল তাই তারা
মুক্ত নভ-তলে॥
আজি
ধ্বনিছে দিগ্বধূ শঙ্খ দিকে দিকে,
আজি
গগনে কারা যেন চাহিয়া অনিমিখে,
ধু ধু ধু হোম-শিখা জ্বলিল ভারতে রে,
ললাটে জয়টিকা, প্রসূন-হার-গলে
চলে রে বীর চলে;
সে নহে নহে কারা, যেখানে ভৈরব-
রুদ্র-শিখা জ্বলে॥
কোরাস :
জয় হে বন্ধন-মৃত্যু-ভয়-হর! মুক্তিকামী জয়।
স্বাধীন-চিত জয়। জয় হে
জয় হে! জয় হে! জয় হে!

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।





![অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত দেহা [ Oye chonchol lilayit deha ] | গানের মালা | নজরুল সঙ্গীত | কাজী নজরুল ইসলাম অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত দেহা [ Oye chonchol lilayit deha ] | গানের মালা | নজরুল সঙ্গীত | কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/অয়ি-চঞ্চল-লীলায়িত-দেহা-1024x655.jpg)













