Editor's Choice

ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থের ‘সব্যসাচী’ কবিতা — কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলামের ‘ফণি-মনসা’ (১৯২৭) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম তেজোদ্দীপ্ত, পৌরাণিক রূপকনির্ভর ও কালজয়ী বিদ্রোহী কবিতা হলো ‘সব্যসাচী’। এই কবিতায় কবি পরাধীন ভারতবর্ষের ঘুমন্ত তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য মহাভারতের মহাবীর অর্জুন (যাঁর আরেক নাম সব্যসাচী, যিনি দুই হাতেই সমান দক্ষতায় বাণ ছুঁড়তে পারতেন) এবং হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন অনুষঙ্গ ব্যবহার করে এক সশস্ত্র বিপ্লবের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামসব্যসাচী
কবির নামকাজী নজরুল ইসলাম
মূল কাব্যগ্রন্থফণি-মনসা
প্রকাশের বছর১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাস)
কবিতার ধরনবিদ্রোহী, পৌরাণিক রূপকনির্ভর ও দেশপ্রেমের কবিতা (Mythological Allegory / Rebellious Patriotic Poem)

 

সব্যসাচী কবিতা (সম্পূর্ণ কবিতা)

ওরে   ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাপা প্রাচী,

       গৌরশিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী!
দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া
জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া,
মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি।’
নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী!

বিরাট কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে,
গান্ডীব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে!
বাজিছে বিষাণ পাঞ্চজন্য,
সাথে রথাশ্ব, হাঁকিছে সৈন্য,
ঝড়ের ফুঁ দিয়া নাচে অরণ্য, রসাতলে দোলা লাগে,
দোলায় বসিয়া হাসিছে জীবন মৃত্যুর অনুরাগে!

যুগে যুগে ম’রে বাঁচে পুনঃ পাপ দুর্মতি কুরুসেনা,
দুর্যোধনের পদলেহী ওরা, দুঃশাসনের কেনা!
লঙ্কাকান্ডে কুরুক্ষেত্রে,
লোভ-দানবের ক্ষুধিত নেত্রে,
ফাঁসির মঞ্চে কারার বেত্রে ইহারা যে চির-চেনা!
ভাবিয়াছ, কেহ শুধিবে না এই উৎপীড়নের দেনা?

কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,
আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।
আজি সম্রাট্‌ কালি সে বন্দী,
কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দী!
কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,
তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ যারে করে পদাহত!

আজ যার শিরে হানিছে পাদুকা কাল তারে বলে পিতা,
চির-বন্দিনী হতেছে সহসা দেশ-দেশ-নন্দিতা।
দিকে দিকে ঐ বাজিছে ডঙ্কা,
জাগে শঙ্কর বিগত-শঙ্কা!
লঙ্কা সায়রে কাঁদে বন্দিনী ভারত-লক্ষ্মী সীতা,
জ্বলিবে তাঁহারি আঁখির সুমুখে কাল রাবণের চিতা!

যুগে যুগে সে যে নব নব রূপে আসে মহাসেনাপতি,
যুগে যুগে হ’ন শ্রীভগবান্‌ যে তাঁহারই রথ-সারথি!
যুগে যুগে আসে গীতা-উদ্‌গাতা
ন্যায়-পান্ডব-সৈন্যের ত্রাতা।
অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী,
শিবের খড়গে তখনই মুন্ড হারায়েছে প্রজাপতি!

নবীন মন্ত্রে দানিতে দীক্ষা আসিতেছে ফাল্গুনী,
জাগো রে জোয়ান! ঘুমায়ো না ভূয়ো শান্তির বাণী শুনি-
অনেক দধীচি হাড় দিল ভাই,
দানব দৈত্য তবু মরে নাই,
সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, ব’সে ব’সে কাল গুণি!
জাগো রে জোয়ান! বাত ধ’রে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!

দক্ষিণ করে ছিঁড়িয়া শিকল, বাম করে বাণ হানি’
এস নিরস্ত্র বন্দীর দেশে হে যুগ-শস্ত্রপাণি!
পূজা ক’রে শুধু পেয়েছি কদলী,
এইবার তুমি এস মহাবলী।
রথের সুমুখে বসায়ো চক্রী চত্রুধারীরে টানি’,
আর সত্য সেবিয়া দেখিতে পারি না সত্যের প্রাণহানি।

মশা মেরে ঐ গরজে কামান-‘বিপ্লব মারিয়াছি।
আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি!’
মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,
টিকি দাড়ি নিয়ে আজো বেঁচে আছি!
বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,
যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার ম’রে বাঁচি!

 

Sabyasachi Kobita (Shompurno Kobita) Romanized Version

Ore bhoy nai ar, duliya uthechhe Himaloy-chapa prachi,
Gourshikhore tuhin bhediya jagichhe Sabyasachi!
Dwapor juger mrityu theliya
Jage mahajogi noyon meliya,
Mahabharoter mahavir jage, bole ‘Ami asiyachhi.’
Nobo-joubon-joltoronge nache re prachin prachi!
Birat kalar agyatobash bhediya Partho jage,
Gandib dhonu rangiye uthilo lokkho lokkharage!
Bajichhe bishan Panchajonno,
Shathe rothashwo, hankichhe shoinno,
Jhorer phu diya nache oronno, rosatole dola lage,
Dolay boshiya hashichhe jibon mrityur onurage!
Juge juge m’ore bache punoh pap durmoti Kurusena,
Duryodhaner podolehi ora, Dushashoner kena!
Lonkakande Kurukshetre,
Lobh-danober khudhito netre,
Fashir monche karar betre ihara je chiro-chena!
Bhabiyachho, keho shudh ib e na ei utpironer dena?
Kaler chokro bokrogotite ghuritechhe obiroto,
Aaj dekhi jara kalar shir she, kal tara podanoto.
Aji somrat, kali se bondi,
Kutire rajar protidwondi!
Kongsho-karay Kongsho-honta jonmichhe onagoto,
Tari buk phete ashe Nris ingho jare kore podahoto!
Aaj jar shire hanichhe paduka kal tare bole pita,
Chiro-bondini hotchhe shohosha desh-desh-nondita.
Dike dike oi bajichhe donka,
Jage Shonkor bigoto-shonka!
Lonka sayore kande bondini Bharat-Lokkhi Sita,
Jolibe tahari ank hir sumukhe kal Raboner chita!
Juge juge se je nob nob rupe ashe mahasenapati,
Juge juge hon Shree Bhagoban je tahar i roth-sarothi!
Juge juge ashe Gita-udgata
Nyay-Pandob-soinyer trata.
Ashib-dokkhojogge jokhoni more swadhinota-Soti,
Shiber khorg e tokhoni mund harayechhe Projapati!
Nobin montre danite diksha asitechhe Fal guni,
Jago re jowan! Ghumayo na bhuya shantir bani shuni—
Onek Dadhichi har dilo bhai,
Danob doitto tobu more nai,
Suta diye mora swadhinota chai, bose bose kal guni!
Jago re jowan! Bat dhore gelo mithyar tant buni!
Dokkh in kore chhiriya shikol, bam kore ban hani’
Eso nirastro bondir deshe he jugo-shostropani!
Puja kore shudhu peyechhi kodoli,
Eibar tumi eso mahaboli.
Rother sumukhe bosayo chokri choturdharire tani’,
Ar shotto shebiya dekhite pari na shotter pranohani.
Mosha mere oi gorje kam an—‘Biplob mariyachhi.
Amader dan hate hatkora, bam hate mari machhi!’
Mene shot badha tiktiki hanchi,
Tiki dari niye ajo beche achhi!
Banchite banchite pray moriyachhi, ebar Sabyasachi,
Ja hok ekta dao kichhu hate, ekbar m’ore banchi!

 

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • পুরাণের রূপকে জাগরণের আহ্বান:
    “বিরাট কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে, / গান্ডীব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে!”
    — মহাভারতে কৌরবদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পাণ্ডব বীর অর্জুন যেমন অজ্ঞাতবাস শেষে অস্ত্র হাতে জেগে উঠেছিলেন, কবি এখানে পরাধীন ভারতবর্ষের ঘুমন্ত যুবসমাজকে সেই মহাবীর ‘সব্যসাচী’র রূপে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। কংস-কারা, কুরুক্ষেত্র, রাবণের চিতা ইত্যাদি পৌরাণিক অনুষঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতন অনিবার্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
  • অহিংস নীতির সমালোচনা ও সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক:
    “সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, ব’সে ব’সে কাল গুণি! / জাগো রে জোয়ান! বাত ধ’রে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!”
    — কবি তৎকালীন চরকায় সুতো কেটে স্বাধীনতা আদায়ের অহিংস বা আপসকামী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, কেবল শান্তির বাণী শুনে বা মিথ্যার তাঁত বুনে স্বাধীনতা আসবে না। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে হলে ‘যুগ-শস্ত্রপাণি’ অর্থাৎ সশস্ত্র বিপ্লবীদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
  • পরাধীনতার গ্লানি ও মৃত্যুর মাধ্যমে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা:
    “বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী, / যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার ম’রে বাঁচি!”
    — হাতকড়া পরা অবস্থায় দাসত্বের জীবন যাপন করাকে কবি বেঁচে থেকে মরার সমতুল্য মনে করেছেন। তাই চরম অপমানের এই জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অস্ত্র হাতে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করাকেও তিনি অনেক বেশি মর্যাদার বলে মনে করেছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত