বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে ১৯২০-এর দশকের শেষার্ধ থেকে ১৯৪০-এর দশকের প্রথমাক্রম পর্যন্ত সময়কালকে নির্দ্বিধায় ‘নজরুল যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আর এই সোনালী যুগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কলকাতার ‘গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়া’ (যা পরবর্তীতে এইচএমভি বা হিস মাস্টার্স ভয়েস নামে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পায়)। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং গ্রামোফোন কোম্পানির মেলবন্ধন কেবল একজন স্রষ্টা ও একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না; এটি ছিল বাংলা গানকে আধুনিকতায় রূপান্তরের এক নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। গ্রামোফোন কোম্পানির দমদম স্টুডিও এবং ৬ নম্বর চিত্পুর রোডের অফিস কক্ষটি পরিণত হয়েছিল নজরুলের স্বকীয় সুরের গবেষণাগারে। সেখানে বসে তিনি হাজার হাজার গান রচনা করেছেন, সুরারোপ করেছেন এবং একঝাঁক কিংবদন্তি শিল্পীকে নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন।

Table of Contents
Toggle১. গ্রামোফোন কোম্পানিতে নজরুলের আগমন ও প্রাথমিক সংযোগ (১৯২৮–১৯৩১)
কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এক ধূমকেতুর মতো—কবিতা, গল্প, উপন্যাস আর শৃঙ্খলভাঙার অগ্নিগর্ভ বার্তা নিয়ে। কিন্তু ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তাঁর ভেতরের সঙ্গীতসাধক সত্তাটি ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সেই সময় বাংলায় ৭৮ আরপিএম (RPM) গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে গান শোনার জোয়ার এসেছে।
১৯২৮ সালে কবি প্রথম মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী জীতেন্দ্রনাথ দত্ত (জিতু বাবু)-র আমন্ত্রণে রেকর্ডের জন্য গান লিখতে শুরু করেন। তবে নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভার প্রকৃত ব্যাপ্তি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সবচেয়ে আগে অনুধাবন করেছিল দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড।
১৯২৮-২৯ সাল নাগাদ গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট সঙ্গীতানুরাগী ভগবতীচরণ দাশগুপ্ত এবং সাহিত্যিক হেমেন্দ্রকুমার রায় নজরুলকে গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন। সেই সময় নজরুল তাঁর কালজয়ী গজলগুলো রচনা করতে শুরু করেছেন। কে মল্লিক (কাসেম মল্লিক), ইন্দুবালা দেবী, আঙুরবালা দেবী ও আশ্চর্যময়ী দেবীর কণ্ঠে নজরুলের সুরের প্রথমদিকের গানগুলো গ্রামোফোন রেকর্ড হিসেবে বাজারে আসতেই তৎকালীন সঙ্গীত বাজারে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
রেকর্ডের গায়ে লেখা থাকত—”কথা ও সুর: কাজী নজরুল ইসলাম”। এই একটি বাক্যই রেকর্ড বিক্রির জন্য গ্যারান্টি পেপারে পরিণত হয়েছিল।
২. অফিশিয়াল নিযুক্তি: চিফ ট্রেইনার ও মিউজিক ডিরেক্টর
নজরুলের অভাবনীয় জনপ্রিয়তার মুখে ১৯৩২ সালের দিকে গ্রামোফোন কোম্পানি কবিকে তাদের স্থায়ী ‘চিফ ট্রেইনার’ (প্রধান সঙ্গীত প্রশিক্ষক) ও ‘গীতিকার-সুরকার’ হিসেবে মাসে নির্ধারিত বেতনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে ‘টুইন’ (Twin) রেকর্ড কোম্পানির দায়িত্বও তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়, যা ছিল গ্রামোফোন কোম্পানিরই একটি সুলভ মূল্যমানের সাবসিডিয়ারি বা সহকারী লেবেল।
গ্রামোফোন কোম্পানিতে কবির প্রধান দায়িত্বগুলো ছিল:
- কোম্পানির স্থায়ী ও আমন্ত্রিত শিল্পীদের জন্য নতুন গান রচনা করা।
- গানগুলোতে সুরারোপ করা ও স্বরলিপি তৈরি করা।
- স্টুডিওতে রিহার্সাল দিয়ে শিল্পীদের কণ্ঠ তৈরি করা।
- রেকর্ডিংয়ের সময় অর্কেস্ট্রা ও আবহ সঙ্গীত পরিচালনা করা।
- নতুন নতুন প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী আবিষ্কার করা ও তাঁদের ট্রেইনিং দেওয়া।
এই চুক্তির পর গ্রামোফোন কোম্পানির দমদম স্টুডিও এবং ৬ নম্বর চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের অফিস ঘরটিই হয়ে উঠেছিল নজরুলের প্রধান কর্মক্ষেত্র ও দ্বিতীয় ঘর।
৩. দমদম স্টুডিওর আবহ ও নজরুলের অলৌকিক সৃষ্টিবেগ
গ্রামোফোন কোম্পানিতে নজরুলের কাজের ধরণ ছিল সাহিত্য ও সঙ্গীত ইতিহাসের এক পরম বিস্ময়। তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শী ও সুরকার-শিল্পীদের স্মৃতিকথা (যেমন—হেমেন্দ্রকুমার রায়, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের ভদ্র, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, শচীন দেববর্মন) থেকে জানা যায়, কবি স্টুডিওতে কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে আসতেন না। তিনি আসতেন এক উদ্দাম ঝড়ের মতো, আর পুরো স্টুডিও প্রাঙ্গণ নিমেষেই মুখরিত হয়ে উঠত এক আনন্দ উৎসবে।
নজরুল স্টুডিওর ঘরে পাপোশ বা ফরাশের ওপর আসন পিঁড়ি হয়ে বসতেন। পাশে থাকত পানের বাটা, ক্রমাগত চা-এর কাপ, সিগারেটের ধোঁয়া এবং হারমোনিয়াম। তাঁর চারপাশে ঘিরে বসে থাকতেন দেশের সেরা সেরা কণ্ঠশিল্পীরা—কেউ ভজন গাইতে চান, কেউ গজল, কেউবা ইসলামী গান বা বাউল।
কবির অলৌকিক সৃষ্টিবেগের কিছু চোখজোড়ানো দৃশ্য যা গ্রামোফোন কোম্পানির ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে:
১. অন দ্য স্পট গান লেখা ও সুর দেওয়া: বহু সময় রেকর্ডিংয়ের ঠিক আধঘণ্টা আগে জানা যেত শিল্পীর জন্য নতুন গান নেই। কবি চা খেতে খেতে সিগারেটের প্যাকেটের উল্টো পিঠে বা মোড়কের কাগজে সঙ্গে সঙ্গে লিরিক লিখে ফেলতেন। লেখা শেষ হতে না হতেই হারমোনিয়ামে আঙুল চালিয়ে সুর বেঁধে ফেলতেন এবং শিল্পীকে ধরিয়ে দিতেন।
২. একসাথে একাধিক গানে কাজ করা: একই ঘরে হয়তো বাঁদিকে বসে আছেন আঙুরবালা, ডানদিকে শচীন দেববর্মন আর সামনে আব্বাসউদ্দীন। কবি আঙুরবালাকে একটি শ্যামাসঙ্গীত শিখিয়ে দিয়ে বলছেন “তুমি এটা ভাজো”, তার মাঝেই ঘুরে শচীন কর্তাকে দিচ্ছেন একটি উদাসী ভাটিয়ালি, আর পরক্ষণেই আব্বাসউদ্দীনের জন্য লিখছেন একটি মারফতি বা গজল।
৩. বিরামহীন রেকর্ডিং স্প্রি: গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড ক্যাটালগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো কোনো মাসে নজরুল একাই ২০ থেকে ৩০টি নতুন গানের রেকর্ড বের করেছেন—যার কথা, সুর ও ট্রেইনিং সবই তাঁর নিজের।
৪. সাঙ্গীতিক বিপ্লব ও ধারার বৈচিত্র্য
ক) বাংলা গজলের জন্ম ও প্রসার
খ) ইসলামী গানের উন্মেষ ও আব্বাসউদ্দীনের ঐতিহাসিক ভূমিকা
গ্রামোফোন কোম্পানিতে নজরুলের অন্যতম সেরা অবদান হলো বাংলা ইসলামী গান ও গজল সৃষ্টি। এর পেছনে রয়েছে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের সাথে কবির এক কালজয়ী ঘটনা।
১৯৩১-৩২ সাল নাগাদ আব্বাসউদ্দীন কবিকে গিয়ে অনুরোধ করেন, “কাজীদা, পীর-পয়গম্বর ও এআইয়ের কাওয়ালি-গজল উর্দুতে তো গ্রামোফোন ভরপুর, বাংলায় কেন ইসলামী গান হবে না?” কিন্তু গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তারা (বিশেষ করে ভগবতীবাবু) প্রথমে দ্বিধান্বিত ছিলেন—ইসলামী গান বাঙালি মুসলিম সমাজ কিনবে কিনা, বা অন্য ক্রেতারা কীভাবে নেবে।
আব্বাসউদ্দীন ও নজরুলের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত ‘টুইন’ লেবেলে একটি পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। কবি এক বসাতেই লিখে ও সুর দিয়ে ফেললেন দুটি গান: ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর’।
আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে রেকর্ডটি ঈদুল ফিতরের ঠিক আগে বাজারে আসতেই ইতিহাস তৈরি হয়। গ্রামোফোন কোম্পানির সমস্ত রেকর্ড বিক্রির রেকর্ড ভেঙে যায়। দোকানে দোকানে কাঁচের আলমারি ভেঙে মানুষ রেকর্ড কিনতে ভিড় জমায়। গ্রামোফোন কোম্পানি বাধ্য হয়ে রাতে মেশিন চালিয়ে নতুন কপি তৈরি করতে থাকে। এরপর থেকে প্রতি ঈদ ও মহররমে গ্রামোফোন কোম্পানি নজরুলের লেখা হাজার হাজার ইসলামী গানের রেকর্ড প্রকাশ করতে শুরু করে।
গ) শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন ও ভক্তিগীতি
যে কবি ‘রমজানের রোজা’র গান লিখে পুরো মুসলিম সমাজকে দোলা দিয়েছিলেন, সেই একই কবি গ্রামোফোন কোম্পানির ঘরে বসে তৈরি করেছেন বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম সেরা শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন।
মা কালী ও উমাকে নিয়ে নজরুলের গভীর অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছিল ‘মাতা চিন্ময়ী’, ‘বল রে জবা বল’, ‘তোর কালো রূপ লুকিয়ে রাখা’ কিংবা ‘মা গো আমি তারা হয়ে’ গানগুলোতে। ইন্দুবালা, আঙুরবালা ও ভবানী দাসের কণ্ঠে নজরুলের এই গানগুলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘরে ঘরে পৌঁছায়। গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তারা কবির এই অসাম্প্রদায়িক ও অভিন্ন সত্তা দেখে তাজ্জব হয়ে যেতেন।
ঘ) রাগপ্রধান গান ও বিরল রাগের মেলবন্ধন
৫. নজরুলের স্নেহচ্ছায়ায় তৈরি কিংবদন্তি শিল্পীমহল
┌──────────────────────────────────────────────────────────┐
│ কাজী নজরুল ইসলাম (প্রধান সঙ্গীত প্রশিক্ষক) │
└────────────────────────────┬─────────────────────────────┘
│
┌───────────────────────────┼───────────────────────────┐
│ │ │
┌────────┴────────┐ ┌────────┴────────┐ ┌────────┴────────┐
│ লোকজ ও ইসলামী │ │ গজল ও আধুনিক │ │ উচ্চাঙ্গ ও ভক্তি │
├─────────────────┤ ├─────────────────┤ ├─────────────────┤
│ • আব্বাসউদ্দীন │ │ • শচীন দেববর্মন │ │ • কে মল্লিক │
│ আহমদ │ │ • জগন্ময় মিত্র │ │ • ইন্দুবালা দেবী│
│ • সোলেমান খাঁন │ │ • তালাত মাহমুদ │ │ • আঙুরবালা দেবী │
└─────────────────┘ └─────────────────┘ └─────────────────┘
- আব্বাসউদ্দীন আহমদ: নজরুল-আব্বাসউদ্দীন জুটি গ্রামোফোন কোম্পানির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক জুটি। লোকসংগীত এবং ইসলামী গানকে গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে মূলধারায় আনার মূল কারিগর ছিলেন তাঁরা।
- শচীন দেববর্মন (এস ডি বর্মন): শচীন কর্তা যখন ত্রিপুরা থেকে এসে কলকাতায় সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য লড়ছেন, নজরুল তাঁকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে নিয়ে আসেন। নজরুলের সুর করা ও লেখা বহু গান (যেমন—’পদ্মার ঢেউ রে’, ‘কুহু কুহু কোয়েলিয়া’) শচীন কর্তার কণ্ঠে রেকর্ড হয়ে তুমুল সাফল্য পায়। শচীন কর্তা আজীবন নজরুলকে তাঁর প্রধান সঙ্গীতগুরু হিসেবে মেনেছেন।
- ইন্দুবালা ও আঙুরবালা: থিয়েটার ও মাহফিলের প্রখ্যাত গায়িকা এই দুজনকে গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে স্বনামধন্য করে তুলেছিলেন নজরুল। তাঁদের দিয়ে গজল, শ্যামাসঙ্গীত ও বিরহী আধুনিক গান গাওয়ানো হতো।
- কমলা ঝরিয়া ও যোধপুরের রাজকুমারী (উমা বসাক): উত্তর ভারতীয় তান ও থুমরি গায়িকাদের বাংলা গানে দীক্ষিত করেছিলেন নজরুল।
- তালাত মাহমুদ (তপন কুমার হিসেবে): একদম তরুণ বয়সে তালাত মাহমুদ যখন ‘তপন কুমার’ নামে বাংলা গান গাইতেন, গ্রামোফোন কোম্পানিতে নজরুলের কাছে তিনি সুরের তালিম পেয়েছিলেন।
৬. বাণিজ্যিক সাফল্য, টুইন লেবেল ও আর্থিক বাস্তবতা
টুইন (Twin) এবং এইচএমভি (HMV)-র দ্বৈত রাজত্ব
এইচএমভি ছিল তাদের প্রিমিয়াম রেড লেবেল বা ব্ল্যাক লেবেল রেকর্ড (যার দাম ছিল বেশি, সাধারণত ৩ টাকা থেকে ৩ টাকা ৫০ আনা)। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগাল পাওয়ার জন্য গ্রামোফোন কোম্পানি চালু করে ‘টুইন রেকর্ড’ (সবুজ লেবেল), যার দাম রাখা হয়েছিল মাত্র ১ টাকা চার আনা বা দেড় টাকা।
নজরুল এইচএমভি এবং টুইন—দুই কোম্পানির জন্যই সমান তালে গান লিখেছেন। বড় বড় শিল্পীদের গান এইচএমভিতে এবং তরুণ নতুন শিল্পীদের গান টুইন লেবেলে প্রকাশ করা হতো। নজরুল ও আব্বাসউদ্দীনের ইসলামী গানের দরুন টুইন রেকর্ডের বিক্রি তৎকালীন সময়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল।
নজরুলের প্রাপ্য ও বাণিজ্যিক শোষণের অন্ধকার দিক
নজরুল গ্রামোফোন কোম্পানিকে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা উপহার দিয়েছিলেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি নিজে কতটুকু পেয়েছিলেন? এটি বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত ইতিহাসের এক করুণ ট্র্যাজেডি।
গ্রামোফোন কোম্পানি নজরুলকে মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন দিত (যা বিভিন্ন সময়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বা তার কিছু বেশি ছিল)। চুক্তি অনুযায়ী, তিনি যা লিখবেন ও সুর করবেন তার সমস্ত স্বত্ব (Copyright) কোম্পানির হয়ে যেত। নজরুল ছিলেন খেয়ালী, উদার এবং স্বভাবজাত বোহেমিয়ান। তিনি হিসেব-নিকেশ বুঝতেন না। পকেটে টাকা এলে বন্ধুদের খাওয়ানো, অভাবীদের দান করা বা সংসারের ঋণ মেটাতে শেষ হয়ে যেত।
কোম্পানি নজরুলের গানের রয়্যালটি থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও, কবিকে প্রায়শই চরম আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। অসুস্থ স্ত্রী প্রমীলা দেবীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচের জন্য নজরুলকে মাঝে মাঝেই অগ্রিম বেতনের জন্য কোম্পানি কর্তাদের কাছে হাত পাততে হতো।
৭. ১৯৪১-১৯৪২: শেষ দিনগুলি ও করুণ নীরবতা
গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে নজরুলের এই স্বর্ণালী পথচলা হুট করেই এক বেদনার মহাসাগরে গিয়ে আছড়ে পড়ে ১৯৪২ সালে।
১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে (শ্রাবণ ১৩৪৮) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ ঘটে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবর শোনামাত্রই নজরুল গ্রামোফোন কোম্পানির স্টুডিওতে ছোটেন। বুকফাটা শোকে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি রচনা ও সুর করেন অমর শোকগাথা: ‘রবিহারা’ এবং ‘সালাম আস্তাগ্ফীর’। স্টুডিওর ভেতরেই নিজের কণ্ঠে সেই কবিতা ও গান আবৃত্তি করে রেকর্ড করেন কবি। সেদিন স্টুডিওতে উপস্থিত প্রত্যেকে অশ্রুসজল হয়ে পড়েছিলেন।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর থেকেই নজরুলের নিজের স্বাস্থ্যও দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। অত্যধিক খাটুনি, আর্থিক মানসিক চাপ এবং পিক্স ডিজিজ (Pick’s Disease) নামে এক মারণ নিউরোলজিক্যাল ব্যাধি ভেতরে ভেতরে কবিকে গ্রাস করছিল।
১৯৪২ সালের ৯ জুলাই, অল ইন্ডিয়া রেডিওতে শিশুদের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় নজরুল হঠাৎ বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তার কিছু দিন আগেই গ্রামোফোন স্টুডিওতে কাজ করার সময় সহকর্মীরা লক্ষ্য করেছিলেন কবি গান শেখাতে শেখাতে খেই হারিয়ে ফেলছেন, মাঝে মাঝে চুপ হয়ে যাচ্ছেন।
৯ জুলাইয়ের পর কবি আর কোনোদিন নতুন করে গান লিখতে বা সুর দিতে পারেননি। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে বাংলা গানের এই প্রলয়ঙ্করী সুরস্রষ্টা চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে যান। এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে গ্রামোফোন কোম্পানি ও নজরুলের সেই ঐতিহাসিক স্বর্ণযুগের।
৮. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিরিখে নজরুল-গ্রামোফোন সম্পর্ক
কাজী নজরুল ইসলাম এবং গ্রামোফোন কোম্পানির সম্পর্ককে শুধু একটি ক্যাসেট বা রেকর্ড কোম্পানির সাথে শিল্পীর যোগাযোগের চশমায় দেখলে ভুল হবে। এই সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও প্রযুক্তিগত গুরুত্ব অপরিসীম:
১. রেকর্ডিং প্রযুক্তিতে বাংলা গানের স্থায়ী সংরক্ষণ: নজরুলের মতো ক্ষণজন্মা সৃষ্টিশীল মানুষের সৃষ্টি যদি তৎকালীন গ্রামোফোন টেকনোলজির সান্নিধ্য না পেত, তবে তাঁর হাজার হাজার গানের একটা বিশাল অংশ হয়তো হারিয়ে যেত। ৭৮ আরপিএম শোল্যাক ডিস্কের সুবাদেই নজরুলের সুর ও বাণীর মৌলিক রূপটি আজও সংরক্ষিত আছে।
২. শ্রোতার আধুনিকীকরণ: গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে নজরুল বাংলা গানকে থিয়েটার হল ও ধনীদের বৈঠকখানা থেকে বের করে এনে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের বৈঠকখানায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
৩. শিল্পীর পেশাদারিত্ব: গ্রামোফোন কোম্পানিতে চিফ ট্রেইনার হিসেবে কাজ করে নজরুল দেখিয়েছেন যে সাহিত্য ও সঙ্গীত কেবল শখ নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট সম্মানজনক পেশা হতে পারে।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক ধূপশিখা, যা গ্রামোফোন কোম্পানির স্টুডিওতে বসে নিজেকে নিঃশেষ করে জ্বালিয়ে রেখেছিল। সেই আগুনের উত্তাপ ও আলো বাংলা সঙ্গীতের আকাশকে চিরকালের জন্য আলোকিত করে রেখে গেছে। গ্রামোফোন কোম্পানি ও নজরুলের সেই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন আজও বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে অমর হয়ে আছে।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন প্রবিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, শিক্ষা ও আইসিটি উদ্যোক্তা, লেখক, সমাজসেবক এবং অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার অনুরাগী। জাতীয় পর্যায়ে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা প্রসারে অবদানের পাশাপাশি তিনি আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ভাবধারাকে দেশ ও দেশের বাইরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসে এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি একটি শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠানের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিআইও) হিসেবে দীর্ঘ সময় কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গুরুকুল নেটওয়ার্ক’। এর অধীনে ‘গুরুকুল অনলাইন লার্নিং নেটওয়ার্ক’, ‘গুরুকুল ক্যাম্পাস লার্নিং নেটওয়ার্ক’, ‘গুরুকুল আইটি এনাবলড সার্ভিসেস’ ও ‘গুরুকুল কমার্শিয়াল’-এর মতো বহুমুখী কারিগরি ও প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষানীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অবদানের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে তিনি ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ (বাপেক্স)-এর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ছিলেন।
গণমাধ্যম ও চিন্তা-সাহিত্যের অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা সুদীর্ঘ। তিনি ‘দৈনিক আজকের আলো’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক এবং জাতীয় অনলাইন পোর্টাল ‘জিলাইভ’ ও ‘দৈনিক খবরওয়ালা’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে সংবাদমাধ্যমের পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ গঠন এবং বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক পরিচয়কে একসূত্রে গেঁথে তিনি একাধিক গ্রন্থ ও নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভাবনাকেন্দ্রিক তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী ও নিবন্ধগুলো নীতি-নির্ধারণী মহলে সমাদৃত। একই সাথে, বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় ও ঐতিহ্যকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে তাঁর রচিত ‘আমার সংস্কৃতি’ গবেষণা সিরিজ সাহিত্যপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; যারই প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণের জন্য এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘সুফি ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করা, যুবসমাজকে প্রযুক্তিদক্ষ করে গড়ে তোলা এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রদানে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সাথে তিনি নিজ জন্মভূমি কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) অঞ্চলের শিক্ষা, প্রযুক্তি, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় সক্রিয় অবদান রেখে চলেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চমানসম্পন্ন শিক্ষা ও জাতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একটি স্বাবলম্বী ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য।


![ধূমকেতুর পথ [ রুদ্র-মঙ্গল, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম ধূমকেতুর পথ [ রুদ্র-মঙ্গল, প্রবন্ধ ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/ধূমকেতুর-পথ-1024x655.jpg)




















