Editor's Choice

বাংলা সঙ্গীতচর্চার ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘নজরুল স্বরলিপি’ (১৯৩১) একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক দলিল। ১৯২০-এর দশকের শেষার্ধে গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেডিওর কল্যাণে নজরুলের গান যখন সমগ্র বাংলাজুড়ে তুঙ্গীয় জনপ্রিয়তা লাভ করে, ঠিক তখনই একটি গুরুতর প্রশাসনিক ও শৈল্পিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিভিন্ন শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিবেশনায় নজরুলের গজল ও রাগপ্রধান গানের সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, লয় ও তালের মূল রূপটি বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। নজরুলের সৃষ্টি করা অবিনাশী সুরের বিশুদ্ধতা, স্বকীয়তা এবং রাগের শুদ্ধতা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় এই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বরলিপি-গ্রন্থ।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পটভূমি

‘নজরুল স্বরলিপি’ গ্রন্থটি ১৯৩১ সালে (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বিখ্যাত ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।
  • প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
  • উদ্দেশ্য: গ্রামোফোন রেকর্ডের বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখে নজরুলের গানের সঠিক সুরলিপি ও স্বরলিপি নথিবদ্ধ করা, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও শিক্ষানবিস শিল্পীরা কোনো প্রকার সুরবিকৃতি ছাড়াই গানগুলো চর্চা করতে পারেন।
নজরুল ছিলেন অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত সুরস্রষ্টা। তিনি অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে সুর বেঁধে গান গাইতেন। স্টুডিওর বাইরে বা অন্যান্য শিল্পীদের কণ্ঠে সেই সুর যাতে মূল রূপ থেকে বিচ্যুত না হয়, সেজন্যই কবি স্বয়ং নজর রেখে বিশেষজ্ঞ স্বরলিপিকারদের সহযোগিতায় এই গ্রন্থে স্বরলিপিগুলো চূড়ান্ত করেন।

২. সুরের বিশুদ্ধতা রক্ষা ও সাঙ্গীতিক গুরুত্ব

‘নজরুল স্বরলিপি’ প্রকাশের ফলে বাংলা সুগম ও ধ্রুপদী সঙ্গীতচর্চায় এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়:

ক) সুরবিকৃতি প্রতিরোধ

তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের গায়কেরা নজরুলের জনপ্রিয় গানগুলো গাইবার সময় নিজস্ব খেয়ালখুশিমতো তান ও আলংকারিক পরিবর্তন আনতেন। ‘নজরুল স্বরলিপি’ প্রকাশের মাধ্যমে গানের মূল রাগ, স্বরগ্রাম (Swaragram), এবং তাল-লয়ের নির্দিষ্ট কাঠামো বেঁধে দেওয়া সম্ভব হয়।

খ) রাগ ও তালের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা

নজরুল তাঁর গজলে যেসব রাগ (যেমন—পিলু, কাফি, ভৈরবী, খাম্বাজ, সিন্ধু-ভৈরবী) এবং তাল (যেমন—দাদরা, কাহারবা, রূপক, ত্রিতাল) ব্যবহার করেছিলেন, তার নিখুঁত ও সহজবোধ্য স্বরলিপি এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়। এটি তৎকালীন রেডিও ও রেকর্ড স্টুডিওর সঙ্গীত প্রশিক্ষকদের জন্য এক অপরিহার্য নির্দেশিকা বই হিসেবে কাজ করেছিল।

গ) স্বরলিপিকারদের ভূমিকা

নজরুলের নির্দেশনায় তৎকালীন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও স্বরলিপিকারেরা (যাঁদের মধ্যে সুরথনাথ মজুমদার এবং পরবর্তীকালের শীর্ষস্থানীয় স্বরলিপিকারগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) খুব যত্ন সহকারে প্রতিটি সুর ও মাত্রার হিসেব অক্ষুণ্ণ রেখে এর স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন।

৩. নজরুল-চর্চায় ‘নজরুল স্বরলিপি’-র অবদান

পরবর্তীকালে নজরুল একাডেমী ও বিভিন্ন নজরুল গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব আধুনিক স্বরলিপি-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তার মূল অনুপ্রেরণা ও ভিত্তি ছিল ১৯৩১ সালের এই ‘নজরুল স্বরলিপি’। এটি কেবল একটি বই ছিল না; এটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের সুর-সম্পদকে চিরকালের জন্য নথিবদ্ধ ও নিরাপদ করার প্রথম ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

‘নজরুল স্বরলিপি’ (১৯৩১) গ্রন্থে সংকলিত কালজয়ী গানসমূহের নির্ঘণ্ট

(সংগ্রহশালার সুবিধার্থে ১৯৩১ সালের ‘নজরুল স্বরলিপি’ প্রথম খণ্ডে যেসব মূল গজল ও রাগাশ্রয়ী গানের স্বরলিপি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তার নিখুঁত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:)
  1. বাগিচায় বুলবুলি তুই
  2. কে বিদেশী বন উদাসী
  3. পরদেশী বঁধুয়া এলে কি এতদিনে
  4. আসিয়া বিজনে কেন একা মনে
  5. কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে
  6. চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না
  7. এত জল ও কাজল চোখে
  8. করুণ কেন অরুণ আঁখি
  9. আসে বসন্ত ফুলবনে
  10. দূরন্ত বায়ু পুরবইয়াঁ
  11. রুমুঝুমু কে এলে নূপুর পায়
  12. নিশি না পোহাতে যেয়ো না যেয়ো না
  13. আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়
  14. আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন
  15. মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
  16. তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত