কাজী নজরুল ইসলামের রাজদ্রোহের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত অগ্নিগর্ভ কাব্যগ্রন্থ ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪)-এ সংকলিত ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতাটি মূলত হিন্দুধর্ম ও সমাজের প্রথাগত গোঁড়ামি, ছোঁয়াছুঁইয়ের নামে অমানবিক বৈষম্য, অন্ধ জাতপাত এবং ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক প্রলয়ঙ্করী ও সোচ্চার প্রতিবাদ। কবিতায় কবি অত্যন্ত তীব্র বাণীর চাবুক মেরে তথাকথিত সমাজপতি ও “জাত-জালিয়াৎ” শোষকদের কঠোর সমালোচনা করে ঘোষণা করেছেন যে, মানুষের চেয়ে কোনো জাত, ধর্ম বা বাহ্যিক আচার বড় হতে পারে না। “জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া!”—এই কালজয়ী পংক্তির মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে জাতপাতের নামে মানুষকে বিভক্ত ও অস্পৃশ্য করে রাখা হয়েছে, যা কেবল অমানবিকই নয়, বরং পরাধীন ভারতবাসীর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীদের প্রথার শিকল চূর্ণ করে অখণ্ড মানবতাবাদ, সামাজিক সাম্য ও শুভবুদ্ধির জয়গান গাওয়ার এই তেজস্বী আহ্বান ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতাটিকে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী ও বিদ্রোহী কাব্যচেতনার এক যুগান্তকারী ও অমলিন নিদর্শনে পরিণত করেছে।
বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থের ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতা
[গান]
জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছে জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া॥
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান,
তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশো-খান!
এখন দেখিস ভারত-জোড়া
পচে আছিস বাসি মড়া,
মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া॥
জানিস না কি ধর্ম সে যে বর্মসম সহনশীল,
তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল।
যে জাত-ধর্ম ঠুনকো এত,
আজ নয় কাল ভাঙবে সে তো,
যাক না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥
দিন-কানা সব দেখতে পাসনে দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে
কেমন করে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতাকলে।
(তোরা) জাতের চাপে মারলি জাতি,
সূর্য ত্যজি নিলি বাতি,
তোদের
জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত-বিজাতের জুতো-ধোয়া॥
মনু ঋষি অণুসমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির,
বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস শির।
ওরে মূর্খ ওরে জড়,
শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো,
(তোরা)
চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এই বিশ্ব মায়ের বিশ্ব-ঘর,
মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্ম-পর।
(তোরা) সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা করে
স্রষ্টায় পূজিস জীবন ভরে
ভস্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভি দোওয়া॥
বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত?
কোন ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁয়া অশুচি হন জগন্নাথ?
নারায়ণের জাত যদি নাই,
তোদের কেন জাতের বালাই?
(তোরা)
ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া॥
ভগবানের ফৌজদারি-কোর্ট নাই সেখানে জাতবিচার,
(তোর)
পইতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার।
জাত সে শিকেয় তোলা রবে,
কর্ম নিয়ে বিচার হবে,
(তা-পর)
বামুন চাঁড়াল এক গোয়ালে, নরক কিংবা স্বর্গে থোয়া॥
(এই)
আচার-বিচার বড়ো করে প্রাণ দেবতায় ক্ষুদ্র ভাবা,
(বাবা)
এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গি-মামার খাচ্ছ থাবা।
তাই নাইকো অন্ন নাইকো বস্ত্র,
নাইকো সম্মান, নাইকো অস্ত্র,
(এই)
জাত-জুয়াড়ির ভাগ্যে আছে আরও অশেষ দুঃখ-সওয়া॥

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।




![মোরা সবাই স্বাধীন, মোরা সবাই রাজা প্রবন্ধ [ দুর্দিনের যাত্রী ] কাজী নজরুল ইসলাম মোরা সবাই স্বাধীন, মোরা সবাই রাজা প্রবন্ধ [ দুর্দিনের যাত্রী ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/মোরা-সবাই-স্বাধীন-মোরা-সবাই-রাজা-1024x655.jpg)














