বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ (১৯২৫) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, যুগান্তকারী ও মানবতাবাদী কবিতা হলো ‘কুলিমজুর’। এই কবিতায় কবি সমাজের শোষিত, নিগৃহীত ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। সভ্যতার চাকাকে যারা নিজেদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে সচল রেখেছে, সেই কুলি-মজুরদের প্রতি সমাজের বিত্তবান শ্রেণির অমানবিক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ ও তাদের নব-উত্থানের এক অমোঘ বাণী এই কবিতায় অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | কুলিমজুর |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সাম্যবাদী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (পৌষ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী লিরিক কবিতা (Communist / Humanist Lyric) |
কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:
১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে (পৌষ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। এই গ্রন্থে কবি মানুষের অধিকার, সাম্য, শোষণহীন সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান গেয়েছেন। ‘কুলিমজুর’ কবিতাটি সেই সাম্যবাদী চেতনার এক প্রদীপ্ত শিখা। রেলগাড়িতে এক বাবু সাহেব কর্তৃক একজন কুলিকে নিচে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে কবির হৃদয় ব্যথিত হয় এবং তিনি কলম ধরেন শোষকদের বিরুদ্ধে। তিনি মনে করিয়ে দেন, দধীচির মতো শ্রমজীবী মানুষের হাড়ের বিনিময়েই গড়ে উঠেছে আজকের আধুনিক সভ্যতা। তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং শোষণের অবসান ঘটিয়ে সাম্যের গান গাওয়াই নজরুলের এই অম্লান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য।
কুলিমজুর কবিতা (সম্পূর্ণ)
দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এ-সব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা? -ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লিখা।
তুমি জান নাকো, কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে রবে তেতালার পরে, আমরা রহিব নিচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে-ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি মাথায় লইব তুলি,
সকলের সাথে পথে চলি যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি খুন,
লালে লাল হয়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়ুক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র-সূর্য তারারা পড়ুক ঝরে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!
Kuli Majur Kobita romanized version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- শ্রমের মর্যাদা ও বঞ্চনা: মানব সভ্যতার প্রতিটি ইট, রাস্তা, মোটর ও বাষ্প-শকট কুলি-মজুরদের ঘাম ও রক্তের ফসল, অথচ শোষক শ্রেণি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে উল্টো নিপীড়ন করছে—এর তীব্র প্রতিবাদ।
- সাম্য ও জাগরণ: কুলি-মজুররাই মানুষ এবং তারাই দেবতা; তাদের ব্যথিত বুকের ওপর ভর করেই একদিন নতুন পৃথিবীর উত্থান ঘটবে এবং শোষণের অবসান হয়ে মানবতার জয় হবে—এই সাম্যবাদী চেতনা এই কবিতার মূল প্রাণ।




![স্বাগত প্রবন্ধ [ দুর্দিনের যাত্রী ] কাজী নজরুল ইসলাম স্বাগত প্রবন্ধ [ দুর্দিনের যাত্রী ] কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/স্বাগত-প্রবন্ধ--1024x655.jpg)

















![সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ‘মানুষ’ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ কবিতা [ কবিতা, সারসংক্ষেপ ও টিকা ] সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ | কাজী নজরুল ইসলাম](/wp-content/uploads/2024/08/মানুষ-কবিতা-1024x655.jpg)
