স্বদেশপ্রেম, জন্মভূমির শাশ্বত মহিমা এবং মাতৃভূমির ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের এক অনন্য বন্দনাগীতি “আমার দেশের মাটি”। কাজী নজরুল ইসলামের বিশিষ্ট সংগীতগ্রন্থ ‘গুল বাগিচা’-র (১৯৩৩) অন্তর্ভুক্ত এই স্বদেশী গানটিতে ভারতবর্ষ তথা বাংলার মাটির অকৃত্রিম রূপ ও আত্মিক ঐশ্বর্যকে খাঁটি সোনার চেয়েও মূল্যবান ঘোষণা করা হয়েছে। দেশকে কেবল একটি ভূখণ্ড হিসেবে না দেখে কবি তাকে অন্নদাত্রী জননী এবং একই সাথে সমস্ত মোহমুক্ত এক ত্যাগী ‘সন্ন্যাসিনী’ রূপে কল্পনা করেছেন। যে দেশ এককালে জ্ঞান ও সভ্যতার আলোকবর্তিকা জ্বেলে বিশ্বের ঘুম ভাঙিয়েছিল, পরাধীনতার ঘোর অমানিশায় আজ সেই মা-ই নিঃসঙ্গ শ্মশান আগলে জেগে আছেন—গানটি জাতির সুপ্ত আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমকে পুনরুজ্জীবিত করার এক অমর সুরময় দলিল।
Table of Contents
Toggleগানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | আমার দেশের মাটি (ও ভাই, খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি) |
| পর্যায় | দেশাত্মবোধক পর্যায় / স্বদেশী গান |
| সংগীত সংকলন | গুল বাগিচা (প্রথম সংস্করণ: ২৭ জুন ১৯৩৩ / ১৩৪০ বঙ্গাব্দ) |
| প্রকাশক | গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি (মূল্য: এক টাকা) |
| রেকর্ডিং সংস্থা | স্বদেশী মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানী |
| উৎসর্গ | জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ (স্বদেশী মেগাফোন-রেকর্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী) |
| গীতিকার ও সুরকার | কাজী নজরুল ইসলাম |
| সংগীতধারা | নজরুল সঙ্গীত (স্বদেশী লোকসুর-আশ্রিত দেশাত্মবোধক গান) |
| সুর ও ছন্দ | বাংলার আবহমান লোকজ সুর / দ্রুত প্রবহমান দাদরা-কাহারবা |
| মূল উপজীব্য | মাতৃভূমির চিরন্তন শ্রেষ্ঠত্ব, বিশ্বসভ্যতায় ভারতের অবদান, শোষণের বিরুদ্ধে জাগরণ ও সন্ন্যাসিনী মায়ের নিঃসঙ্গ রূপ |
| প্রধান চিত্রকল্প | খাঁটি সোনা, দুধের বাটি, মন্দিরের প্রসাদ, জিয়ন-কাঠি, সন্ন্যাসিনী মা, শ্মশান-ঘাঁটি |
| আবেগীয় আবহ | গভীর মাতৃভক্তি, জাতীয় আত্মগৌরব, বেদনাসিক্ত সংকল্প ও বীররস |
আমার দেশের মাটি গানের কথা:
আমার দেশের মাটি
ও ভাই, খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি॥
এই দেশের মাটি-জলে
এই দেশেরই ফুলে ফলে
তৃষ্ণা মিটাই, মিটাই ক্ষুধা
পিয়ে এরই দুধের বাটি॥
এই মায়েরই প্রসাদ পেতে,
মন্দিরে এর এঁটো খেতে
তীর্থ করে ধন্য হতে আসে কত জাতি॥
এই দেশেরই ধুলায় পড়ি
মানিক যায় রে গড়াগড়ি,
বিশ্বে সবার ঘুম ভাঙাল
এই দেশেরই জিয়ন-কাঠি॥
এই মাটি এই কাদা মেখে,
এই দেশেরই আচার দেখে,
সভ্য হল নিখিল ভুবন দিব্য পরিপাটি॥
এই সন্ন্যাসিনী সকল দেশে,
জ্বালল আলো ভালোবেসে
মা আঁধার রাতে একলা জাগে
আগলে রে এই শ্মশান-ঘাঁটি॥
Amar Desher Mati Gaaner Kotha:
O bhai, khanti sonar cheye khanti.
Ei desher mati-jole
Ei desheri phule phole
Trishna mitai, mitai khudha
Piye eri dudher bati.
Ei mayeri prosad pete,
Mondire er ento khete
Tirtho kore dhonno hote ashe koto jati.
Ei desheri dhulay pori
Manik jay re goragori,
Bishwe shobar ghum bhanal
Ei desheri jiyon-kathi.
Ei mati ei kada mekhe,
Ei desheri achar dekhe,
Shobbhyo holo nikhil bhubon dibyo poripati.
Ei shonnashini shokol deshe,
Jwalal alo bhalobeshe
Ma andhar rate ekla jage
Agle re ei shmoshan-ghati.
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. মৃত্তিকার খাঁটি রূপ ও মায়ের অন্নধারা
- “আমার দেশের মাটি ও ভাই, খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি / এই দেশের মাটি-জলে এই দেশেরই ফুলে ফলে তৃষ্ণা মিটাই, মিটাই ক্ষুধা পিয়ে এরই দুধের বাটি…”গানটির সূচনাই হয় দেশপ্রেমের এক চরম আত্মমর্যাদাপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে। দেশের মৃত্তিকা সোনা অপেক্ষা খাঁটি। ফুল, ফল, মাটি ও জলের মধ্য দিয়ে দেশমাতা যেভাবে সন্তানদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা দূর করেন, তা সন্তানের প্রতি মায়ের নিঃস্বার্থ স্নেহের প্রতীক।
২. বিশ্বতীর্থ ও ঐতিহাসিক মিলনক্ষেত্র
- “এই মায়েরই প্রসাদ পেতে, মন্দিরে এর এঁটো খেতে তীর্থ করে ধন্য হতে আসে কত জাতি…”ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও মহিমার স্বীকৃতি। বিশ্ব ইতিহাসের বুকে এই ভূখণ্ড এমন এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, যেখানে বিশ্বের বহু ধর্ম ও সভ্যতার মানুষ আত্মিক প্রশান্তি ও মুক্তির সন্ধানে ছুটে এসেছে এবং ধন্য হয়েছে।
৩. সভ্যতার আলোকবর্তিকা ও জিয়ন-কাঠি
- “এই দেশেরই ধুলায় পড়ি মানিক যায় রে গড়াগড়ি, বিশ্বে সবার ঘুম ভাঙাল এই দেশেরই জিয়ন-কাঠি / এই মাটি এই কাদা মেখে… সভ্য হল নিখিল ভুবন…”রূপকথার রূপক ব্যবহার। রূপকথার রাজপুত্রকে যেমন জিয়ন-কাঠির ছোঁয়ায় ঘুম থেকে তোলা হয়, তেমনি এই দেশের জ্ঞান ও দর্শন সমগ্র পৃথিবীর অচেতন মানবজাতিকে জাগিয়ে সভ্যতার পাঠ শিখিয়েছিল।
৪. শ্মশান-ঘাঁটির প্রহরী ও সন্ন্যাসিনী মা
- “এই সন্ন্যাসিনী সকল দেশে জ্বালল আলো ভালোবেসে / মা আঁধার রাতে একলা জাগে আগলে রে এই শ্মশান-ঘাঁটি…”গানটির সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও গভীর রূপক। যে দেশমাতা সারা পৃথিবীতে প্রেমের আলো জ্বালিয়েছিলেন, তিনি কোনো রাজরানী নন—তিনি ত্যাগের প্রতীক ‘সন্ন্যাসিনী’। ঔপনিবেশিক শোষণ ও দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে দেশ আজ পরিণত হয়েছে শ্মশানে। সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত শ্মশান-ঘাঁটিতে মা কাউকে দোষারোপ না করে একা আঁধার রাতে নির্ঘুম চোখে জেগে থেকে সন্তানদের রক্ষা করছেন।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- মাতৃরূপের রূপান্তর: অন্নদাত্রী রূপ থেকে জ্ঞানদায়িনী এবং সবশেষে নিঃস্বার্থ ‘সন্ন্যাসিনী’ বেশে মায়ের রূপায়ণ নজরুলের কাব্যের এক অনন্য সৃষ্টি।
- লোকজ ও পৌরাণিক রূপক: ‘দুধের বাটি’, ‘জিয়ন-কাঠি’, ‘শ্মশান-ঘাঁটি’—বাংলার আবহমান লোকসংস্কৃতির উপাদান দিয়ে জটিল রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বক্তব্যকে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
- সহজিয়া ছন্দ ও মেলবন্ধন: অন্ত্যমিল ও চরণের ছন্দময়তা এমনভাবে বিন্যস্ত যে এটি গণমানুষের মুখে মুখে সহজেই গীত হতে পারে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- লোকসুরের সহজিয়া আবেদন: গানটির সুর কোনো কঠোর মার্গসংগীতের জটিলতায় আবদ্ধ নয়; বরং বাংলার মেঠো সুরের সারল্য ও তেজস্বী দোলায় গানটি আশ্রিত।
- ছন্দময় প্রবহমানতা: কাহারবা বা দাদরা তালের সাবলীল লয় গানের প্রতিটি শব্দকে একটি সমবেত পদযাত্রার মতো বলিষ্ঠ ছন্দ দেয়।
- বাণীর প্রত্যয়: সুরের ওঠানামায় খেদের চেয়ে প্রত্যয় ও ভালোবাসার আবেগ বেশি প্রাধান্য পাওয়ায় পরিবেশনে এক উদ্দীপনাময় আবহ তৈরি হয়।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাঙালির জাতীয় কবি ও অবিসংবাদিত সংগীতসাধক। ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দেশীয় সংস্কৃতি ও মেগাফোন-রেকর্ড কোম্পানির প্রসারে নজরুল ছিলেন প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁর রচিত স্বদেশী গানগুলো মুক্তিকামী মানুষের রক্তে শিহরণ জাগিয়ে তুলত।
- গুল বাগিচা সংকলন: ১৯৩৩ সালের জুনে প্রকাশিত ‘গুল বাগিচা’ গ্রন্থে নজরুলের বহু রাগপ্রধান ও স্বদেশী ধারার অবিস্মরণীয় গান সংকলিত হয়। মেগাফোন রেকর্ডের মাধ্যমে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে এই গানগুলো পৌঁছে গিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গুল বাগিচা (প্রথম সংস্করণ, ১৩৪০ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ), কাজী নজরুল ইসলাম, গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি, কলকাতা।
- নজরুল রচনাবলী (স্বদেশী ও দেশাত্মবোধক গান সংকলন), নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
- নজরুল-জীবনী, রফিকুল ইসলাম।






















