বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২)-এর একটি অত্যন্ত উগ্র, প্রলয়ঙ্করী ও মাতৃরূপী বিপ্লবী সৃষ্টি হলো ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’। এই কবিতায় কবি শ্বেতবসনের স্নিগ্ধতা ও শান্ত রূপের পরিবর্তে মা দুর্গাকালী বা শক্তিরূপিণী জননীকে রক্তাম্বর বা রক্তবর্ণ বসনে ভূষিত হয়ে অসুর বিনাশের জন্য এক ধ্বংসাত্মক ও উগ্র তান্ডবরূপে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | রক্তাম্বরধারিণী মা |
| কবির নাম | কাজী নজরুল ইসলাম |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | অগ্নিবীণা |
| প্রকাশের বছর | ১৯২২ (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | বিপ্লবী ও উগ্র শক্তিরূপী লিরিক কবিতা (Revolutionary / Apocalyptic Mother-Goddess Lyric) |
কবি ও গ্রন্থ পরিচিতি:
১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় কবি প্রচলিত কোমল মাতৃমূর্তির বাইরে গিয়ে এক ভয়ংকরী, রক্তরঞ্জিত ও প্রলয়রূপী শক্তির রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। সিথির সিঁদুর মুছে ফেলে কাল-চিতা জ্বালানো, খড়্গকে স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা বানানো, এবং নিদ্রিত শিবকে লাথি মেরে ভোলার ভাঙ-নেশা ভাঙানোর মধ্য দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার ও জালিমদের ধ্বংস করার যে উগ্র বিপ্লবী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে, তা নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
রক্তাম্বরধারিণী মা (পুরো কবিতা)
রক্তাম্বর পরো মা এবার
জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন
দেখি ওই করে সাজে মা কেমন
বাজে তরবারি ঝনন ঝন।
সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলো মা গো,
জ্বালো সেথা জ্বালো কাল-চিতা
তোমার খড়্গ-রক্ত হউক
স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা।
এলোকেশে তব দুলুক ঝঞ্ঝা
কালবৈশাখী ভীম তুফান,
চরণ-আঘাতে উদ্গারে যেন
আহত বিশ্ব রক্ত-বান।
নিশ্বাসে তব পেঁজা-তুলো সম
উড়ে যাক মা গো এই ভুবন,
অসুরে নাশিতে হউক বিষ্ণু–
চক্র মা তোর হেম-কাঁকন।
টুঁটি টিপে মারো অত্যাচারে মা,
গলহার হোক নীল ফাঁসি,
নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা
উঠুক সরোষে উদ্ভাসি।
হাসো খলখল দাও করতালি
বলো হরহর শঙ্কর!
আজ হতে মা গো অসহায়সম
ক্ষীণ ক্রন্দন সম্বরো।
মেখলা ছিঁড়িয়া চাবুক করো মা
সে চাবুক করো নঊ-তড়িৎ,
জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে
লালে লাল হোক শ্বেত হরিৎ।
নিদ্রিত শিবে লাথি মারো আজ,
ভাঙো মা ভোলার ভাঙ-নেশা,
পিয়াও এবার অ-শিব গরল
নীলের সঙ্গে লাল মেশা।
দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
অশিব-নাশিনী চণ্ডী-রূপ;
দেখাও মা ওই কল্যাণ-করই
আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তূপ।
শ্বেত শতদলবাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বরধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- শক্তির উদ্বোধন ও ধ্বংস: স্নিগ্ধতা বা শান্তির রূপ ছেড়ে মা-কে উগ্র রক্তাম্বরধারিণী এবং প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান।
- পরাধীনতা মুক্তির ব্যাকুলতা: জালিমদের বিনাশ এবং ধ্বংসের ছাই থেকে নতুন সৃষ্টির পূর্ণিমা নিয়ে আসার এক আপসহীন ও বিপ্লবী আকুতি—এই কবিতার মূল প্রাণ।
উৎস:
কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি কাজী নজরুল ইসলামের প্রামাণ্য রচনাবলী ও ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশনা (১৯২২) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।























