Editor's Choice

মরুভাস্কর কাব্যগ্রন্থের ‘অবতরণিকা’ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম

অবতরণিকা কবিতাটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর মরুভাস্কর কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে । মরুভাস্কর কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ । এই গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে। হজরত মোহাম্মদ সঃ এর জীবনী নিয়ে চারটি সর্গে ১৮ টি খণ্ড-কবিতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ।

 

অবতরণিকা কবিতা

জেগে ওঠ তুই রে ভোরের পাখি
               নিশি-প্রভাতের কবি!
লোহিত সাগরে সিনান করিয়া
               উদিল আরব-রবি।
ওরে ওঠ তুই, নূতন করিয়া
               বেঁধে তোল তোর বীণ!
ঘন আঁধারের মিনারে ফুকারে
               আজান মুয়াজ্জিন ।
কাঁপিয়া উঠিল সে ডাকের ঘোরে
               গ্রহ, রবি, শশী, ব্যোম,
ওই শোন শোন ‘সালাতের’ ধ্বনি
               ‘খায়রুমমিনান্নৌম !’
রবি-শশী-গ্রহ-তারা ঝলমল
               গগনাঙ্গনতলে
সাগর ঊর্মি-মঞ্জীর পায়ে
               ধরা নেচে নেচে চলে।
তটিনী-মেখলা নটিনি ধরার
               নাচের ঘূর্ণি লাগে
গগনে গগনে পাবকে পবনে
               শস্যে কুসুম-বাগে।
সে আজান শুনি থমকি দাঁড়ায়
               বিশ্ব-নাচের সভা,
নিখিল-মর্ম ছাপিয়া উঠিল
               অরুণ জ্যোতির জবা।
দিগ্‌‌দিগন্ত ভরিয়া উঠিল
               জাগর পাখির গানে,
ভূলোক দ্যুলোক প্লাবিয়া গেল রে
               আকুল আলোর বানে!
আরব ছাপিয়া উঠিল আবার
               ব্যোমপথে ‘দীন’ ‘দীন’,
কাবার মিনারে আবার আসিল
               নবীন মুয়াজ্জিন!
ওরে ওঠ তোরা, পশ্চিমে ওই
               লোহিত সাগর জল
রঙে রঙে হল লোহিততর রে
               লালে-লাল ঝলমল।
রঙ্গে ভঙ্গে কোটি তরঙ্গে
               ইরানি দরিয়া ছুটে,
পূর্ব-সীমায়,– সালাম জানায়
               আরব-চরণে লুটে।
দখিনে ভারত-সাগরে বাজিছে
               শঙ্খ, আরতি ধ্বনি,
উদিল আরবে নূতন সূর্য–
               মানব-মুকুট-মণি।
উত্তরে চির-উদাসিনী মরু,
               বালুকা-উত্তরীয়
উড়ায়ে নাচিয়া নাচিয়া গাহিছে–
               ‘জাগো রে, অমৃত পিয়ো!’
লু হাওয়া বাজায় সারেঙ্গি বীণ
               খেজুর পাতার তারে,
বালুর আবির ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারে
               স্বর্গে গগন-পারে।
খুশিতে বেদানা-ডালিম ডাঁসায়ে
               ফাটিয়া পড়িছে ভুঁয়ে,
ঝরে রসধারা নারঙ্গি শেউ
               আপেল আঙুর চুঁয়ে।
আরবি ঘোড়ারা রাশ নাহি মানে
               আশমানে যাবে উঠি,
মরুর তরণি উটেরা আজিকে
               সোজা পিঠে চলে ছুটি।
বয়ে যায় ঢল ধরে নাকো জল
               আজি ‘জমজম’ কূপে,
‘সাহারা’ আজিকে উথলিয়া ওঠে
               অতীত সাগর রূপে
পুরাতন রবি উঠিল না আর
               সেদিন লজ্জা পেয়ে,
নবীন রবির আলোকে সেদিন
               বিশ্ব উঠিল ছেয়ে।
চক্ষে সুরমা বক্ষে ‘খোর্মা’
               বেদুইন কিশোরীরা
বিনি কিম্মতে বিলাল সেদিন
               অধর চিনির শিরা!
‘ঈদ’ উৎসব আসিল রে যেন
               দুর্ভিক্ষের দিনে,
যত ‘দুশমনি’ ছিল যথা নিল
               ‘দোসতি’ আসিয়া জিনে।

  
নহে আরবের, নহে এশিয়ার,–
               বিশ্বে সে একদিন,
ধূলির ধরার জ্যোতিতে হল গো
               বেহেশ্‌ত জ্যোতিহীন!

ধরার পঙ্কে ফুটিল গো আজ
               কোটিদল কোকনদ,
গুঞ্জরি ওঠে বিশ্ব-মধুপ–
               ‘আসিল মোহাম্মদ!’
অভিনব নাম শুনিল রে
               ধরা সেদিন – ‘মোহাম্মদ!’
এতদিন পরে এল ধরার
               ‘প্রশংসিত ও প্রেমাস্পদ!’
চাহিয়া রহিল সবিস্ময়
               ইহুদি আর ইশাই সব,
আসিল কি ফিরে এতদিনে
               সেই মসিহ্‌ মহামানব?
‘তওরাত’ 'ইঞ্জিল’ ভরি
               শুনিল যাঁর আগমনি,
‘ইশা’ ‘মুসা’ আর ‘দাউদ’ যাঁর
               শুনেছিল পা-র ধ্বনি,
সেই সুন্দর দুলাল আজ
               আসিল কি নীরব পায়?
যেমন নীরবে আসে তপন
               পূর্ণ চাঁদ পুব-সীমায়।
  
এমনই করিয়া ওঠে রবি
               ওঠে রে চাঁদ, ধরা তখন
এমনই করিয়া ঘুমায়ে রয়
               রবি শশী হেরে স্বপন।
  
আলোকে আলোকে ছায় দিশি
               নব অরুণ ভাঙে রে ঘুম,
তন্দ্রালু সব আঁখি-পাতায়
               বন্ধুপ্রায় বুলায় চুম।
  
তেমনই মহিমা সেই বিভায়
               আসিল আজ আলোর দূত,
ঝরনার সুরে পাখিরা গায়,
               আতর গায় বয় মারুত।
  
শুষ্ক সাহারা এত সে যুগ
               হেরেছে রে যার স্বপন,
বেহেশ্‌ত হতে নামিল ওই
               সেই সুধার প্রস্রবণ।
  
খোর্মা খেজুরে মরু-কানন
               ফলবতী হলুদ-রং
মরুর শিয়রে বাজে রে ওই
               জলধারার মেঘ-মৃদং!

শোনেনি বিশ্ব কভু যে নাম –
               ‘মোহাম্মদ’ শুনে সে আজ
সেই সে নাম অবিশ্রাম
               একী মধুর, একী আওয়াজ!
  
আঁধার বিশ্বে যবে প্রথম
               হইল রে সূর্যোদয়
চেয়েছিল বুঝি সকল লোক
               এই সে রূপ সবিস্ময়!
  
এমনই করিয়া নবারুণের
               করিল কি নামকরণ,
সে আলোক-শিশু এমনই রে
               হরি আঁধার হরিল মন!
  
এমনই সুখে রে সেই সেদিন
               বিহগ সব গাহিল গান,
শাখায় প্রথম ফুটিল ফুল,
               হল নিখিল শ্যামায়মান।
  
গুলে গুলে শাড়ি গুলবাহার
               পরি সেদিন ধরণি মা
আঁধার সূতিকাবাস ত্যজি
               হেরে প্রথম দিক্‌সীমা।
  
ফুলবন লুটি, খোশখবর
               দিয়ে বেড়ায় চপল বায়,
‘ওরে নদ নদী ওরে নিঝর
               ছাড়ি পাহাড় ছুটিয়া আয়।
  
সাগর! শঙ্খ বাজা রে তোর,
               আসিল ওই জ্যোতিষ্মান,
একী আনন্দ একী রে সুখ
               এল আলোর একী এ বান!’
  
ফুলের গন্ধ, পাখির গান
               স্পর্শসুখ ভোর হাওয়ার,
জানিল বিশ্ব সেই সেদিন,
               সেই প্রথম ; আজ আবার
আঁধার নিখিলে এল আবার
               আদি প্রাতের সে সম্পদ
নূতন সূর্য উদিল ওই –
               মোহাম্মদ ! মোহাম্মদ !
Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত