বাংলা গীতিসাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘গুল বাগিচা’ (১৯৩৩) বিচিত্র সুর, ব্যাকরণ ও ভাবের এক পরম সুরভিত সঙ্গীত-উদ্যান। ১৯২০-এর দশকের শেষে ‘বুলবুল’ ও ‘চোখের চাতক’-এর মাধ্যমে বাংলা গানে যে গজল ও সুরের জোয়ার শুরু হয়েছিল, ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে ‘গুল বাগিচা’য় এসে তা বহুধা বিস্তৃত এক পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। পারস্যের ‘গুল বাগিচা’ বা গোলাপ বাগানে যেমন নানা বর্ণের ও নানা সুরভির ফুল ফোটে, কবি নজরুলও এই গ্রন্থে ঠুংরী, দাদরা, গজল, চৈতী, কাজরী, দেশাত্মবোধক, কীর্তন, ভাটিয়ালি এবং ইসলামী সঙ্গীতের বিচিত্র সুরপাপড়িকে একসাথে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
Table of Contents
Toggle১. প্রকাশনার ইতিহাস ও উৎসর্গ
‘গুল বাগিচা’ সংকলনটি ১৯৩৩ সালের ২৭ জুন (১৩৪০ বঙ্গাব্দের আশাড়) কলকাতার ‘গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি’ থেকে ১ম সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয়।
- প্রকাশক: গ্রেট ইস্টার্ন লাইব্রেরি, কলকাতা।
- মূল্য: ১ (এক) টাকা।
- উৎসর্গ: কবি তাঁর এই অনন্য সঙ্গীতগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন স্বদেশী ‘মেগাফোন-রেকর্ড কোম্পানি’র স্বত্বাধিকারী, তাঁর পরম অন্তরঙ্গ বন্ধু জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ-কে।
‘দুটি কথা’: কবির নিজস্ব বার্তা
গ্রন্থটির প্রারম্ভে কবি নজরুল ‘দুটি কথা’ শিরোনামে একটি অর্থপূর্ণ ভূমিকা সংযোজন করেন। সেখানে তিনি লেখেন:
“দুই-চারিটি ছাড়া ‘গুল-বাগিচা’র গানগুলি ‘স্বদেশী মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানী’ রেকর্ড করিয়াছেন। তাঁহাদের এই অনুগ্রহের জন্য আমি অশেষ ঋণী। ‘গুল-বাগিচা’য় ঠুংরী, গজল দাদরা, চৈতী, কাজরী, স্বদেশী, কীর্তন, ভাটিয়ালি, ইসলামী ধর্মসঙ্গীত প্রভৃতি বিভিন্ন ঢং-এর গান দেওয়া হইল। আমার সৌভাগ্যবশত প্রায় সমস্ত গান গুলি ইতিমধ্যে লোকপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে।… আমার অন্যান্য গানের বই-এর মত ‘গুল-বাগিচা’ও সমাদর লাভ করিবে—আশা করি।”
২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও বহুধা সুরধারা
‘গুল বাগিচা’ নজরুলের সঙ্গীত রচনার সেই পর্বের প্রতিনিধিত্ব করে, যখন তিনি একই সাথে বিভিন্ন ঘরানা ও তালের ওপর স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছিলেন:
ক) ধ্রুপদী ও লোকজ আঙ্গিকের মেলবন্ধন
এই সংকলনে উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদী অঙ্গের ঠুংরী, দাদরা, ও রাগাভিত্তিক রচনার পাশাপাশি মৌসুমী গান যেমন—কাজরী, চৈতী ও বরষার গান স্থান পেয়েছে। কবি আঞ্চলিক মেজাজের লোকসুরকে শাস্ত্রীয় রাগের সাথে যুক্ত করে বাংলা সুগম সঙ্গীতকে এক অতুলনীয় অলংকার দান করেছিলেন।
খ) অসাম্প্রদায়িক স্বদেশী ভাবনা ও দেশাত্মবোধ
পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রাম ও মাতৃভূমির প্রতি কবির চিরন্তন ভক্তি রূপায়িত হয়েছে এই গ্রন্থে। ‘গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা ঐ’, ‘স্বদেশ আমার জানি না তোমার’, ‘স্বপ্নে দেখেছি ভারত জননী’, কিংবা ‘আমার দেশের মাটি’ গানগুলোতে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ভারতমাতার স্বাধীনতার আকুল আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে।
গ) বিরহ, অনুরাগ ও প্রকৃতির সুরকাব্য
প্রেমিক হৃদয়ের নিভৃত ব্যাকুলতা, রূপের বন্দনা এবং প্রকৃতির রূপক নজরুলের সুরের ছোঁয়ায় অমরত্ব পেয়েছে। ‘বকুল চাঁপার বনে কে মোর’, ‘আঁখি বারি আঁখিতে থাক’, ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে’, ‘বাদল বায়ে মোর নিভিয়া গেছে বাতি’, এবং ‘রিমিঝিম্ রিমিঝিম্ ঐ নামিল দেয়া’ গানগুলোতে প্রকৃতি ও বিরহবেদনা একাকার হয়ে গেছে।
৩. গ্রামোফোন রেকর্ড ও মেগাফোনের যুগলবন্দী
‘গুল বাগিচা’ গ্রন্থটি প্রকাশের পেছনে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির অবদান ছিল অসামান্য। তৎকালীন মেগাফোন রেকর্ডের শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পী—যেমন ইন্দুবালা, আঙুরবালা, কে মল্লিক, ধীরেন দাস, জীতেন বন্দোপাধ্যায় ও শচীন দেববর্মন—এই গানগুলো গেয়ে গ্রামোফোন ডিস্কের মাধ্যমে প্রতিটি বঙ্গীয় পরিবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ‘গুল বাগিচা’ নজরুলের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সাফল্যের এক উজ্জ্বল দলিল।
‘গুল বাগিচা’ (১৯৩৩) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র
(সংগ্রহশালার কাঠামোগত সুবিধার্থে ‘গুল বাগিচা’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ৬৮টি গানের নির্ভুল ও পরিমার্জিত নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
- গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা কাবেরী যমুনা ঐ
- গুল বাগিচার বুলবুলি আমি
- সোনার মেয়ে সোনার মেয়ে গুল বাগিচা
- বকুল চাঁপার বনে কে মোর
- আঁখি বারি আঁখিতে থাক
- থাক ব্যথা হৃদয়ে
- ভুল করে কোন ফুলবিতানে
- পথ চলিতে যদি চকিতে
- কেন ফোটে কেন কুসুম ঝরে ঝরে যায়
- তোমার কুসুম বনে আমি আসিয়াছি ভুলে
- কত কথা ছিল বলিবার বলা হল না
- বুকে তোমায় নাই বা পেলাম
- বৃথা তুই কাহার পরে করিস্ অভিমান
- পিয়া পাপিয়া পিয়া বোলে
- চোখের নেশার ভালবাসা সে কি কভু থাকে গো
- এ কুঞ্জে পথ ভুলি কোন বুলবুলি আজ
- কোন কুসুমে তোমায় আমি
- পরো পরো চৈতালী সাঁঝে কুসুমি শাড়ি
- ঝুমকো লতার চিকন পাতায়
- বরষ মাস যায় সে নাহি আসে
- আমার বিজন ঘরে হেসে এল পথিক মুসাফির বেশে
- ভেঙো না ভেঙো বঁধু তরুণ চামেলি শাখা
- আসিলে কে গো বিদেশী
- এসো বঁধু ফিরে এসো ভোলো ভোলো অভিমান
- নাহি কেহ আমার ব্যথার সাথী
- মাধবী লতার আজি মিলন সখি
- আজি এ বাদল দিনে
- যৌবন সিন্ধু টলমল টলমল
- চারু চপল পায়ে যায় যুবতী গোরী
- দুধে আলতায় রং যেন তার সোনার অঙ্গ ছেয়ে
- আমার ভাঙা নায়ের বৈঠা ঠেলে
- বনে চলে বনমালী বনমালা দুলায়ে
- ঘন ঘোর মেঘ ঘেরা দুর্দিনে ঘনশ্যাম
- মোর পুষ্প পাগল মাধবী কুঞ্জে
- মনে যে মোর মনের ঠাকুর
- এই দেহেরই রঙমহলায়
- হে চির সুন্দর বিশ্ব চরাচর
- উভয়ে কপোত কপোতী উড়িয়া বেড়াই
- চম্পক বরণী টলমল তরণী
- এ কোথায় আসিলে হায় তৃষিত ভিখারি
- শিউলি ফুলের মালা দোলে
- স্বদেশ আমার জানি না তোমার
- দুরন্ত দুর্মদ প্রাণ অফুরান
- স্বপ্নে দেখেছি ভারত জননী
- জগতে আজিকে যারা আগে চলে ভয় হারা
- আমার দেশের মাটি
- বাদল বায়ে মোর নিভিয়া গেছে বাতি
- মেঘের হিন্দোলা দেয় পুব হাওয়াতে দোলা
- সাধ জাগে মনে পরজীবনে
- আঁচলে হংস মিথুন আঁকা
- অচেনা সুরে অজানা পথিক
- হেরি আজ শূন্য নিখিল
- কত কথা ছিল তোমায় বলিতে
- তুমি বর্ষায় ঝরা চম্পা
- অঝোর ধারায় বর্ষা ঝরে সঘন তিমির রাতে
- একলা ভাসাই গানের কমল সুরের রাতে
- তোমার আকাশে উঠেছিনু চাঁদ
- দুলিবি কে আয় মেঘের দোলায়
- কোন দূরে ও কে যায় চলে যায়
- রিমিঝিম্ রিমিঝিম্ ঐ নামিল দেয়া
- পাষাণ গিরির বাঁধন টুটে
- শেষ হল মোর ও জীবনে ফুল ফোটাবার পালা
- কাঁদিছে তিমির কুন্তলা সাঁজ
- আসে রজনী সন্ধ্যামণির প্রদীপ জ্বলে
- আজি কুসুম দীপালি জ্বলিছে বনে
- দোপাটি লো লো করবী নাই সুরভি রূপ আছে
- বাসন্তী রং শাড়ি পরো
- এস এস রস লোক বিহারী














![কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী [ সংক্ষিপ্ত ] কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী [ সংক্ষিপ্ত ]](/wp-content/uploads/2000/01/কাজী-নজরুল-ইসলামের-জীবনী-সংক্ষিপ্ত-Kazi-Nazrul-Islam-Biography-Short--1024x536.png)


