Editor's Choice

বাংলা গীতিসাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের ‘চোখের চাতক’ (১৯২৯) মূলত রাগাশ্রয়ী গজল ও সুকোমল বিরহগীতির এক অনন্য স্বর্ণপ্রসূ সংকলন। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত কবির প্রথম সফল সঙ্গীতগ্রন্থ ‘বুলবুল’-এর ধারাবাহিকতায় এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। চাতক পাখি যেমন একবিন্দু মেঘের জলের জন্য আকাশের দিকে চাতক আঁখিতে চেয়ে থাকে, তেমনই প্রেমানুরাগী মানুষের হৃদয়ের তৃষ্ণা, প্রিয়তমের জন্য চাওয়া আর অধরা বিরহের রূপক নিয়ে নজরুল রচনা করেছিলেন এই অনন্য গীতিমালা।

১. প্রকাশনার ইতিহাস ও উৎসর্গ

‘চোখের চাতক’ গ্রন্থটি ১৯২৯ সালের ২১ ডিসেম্বর (১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ৬ অগ্রহায়ণ) কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ডি এম লাইব্রেরি’ থেকে ১ম সংস্করণ হিসেবে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
  • প্রকাশক: ডি এম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা।
  • অবয়ব ও মূল্য: ৬ + ৬৫ পৃষ্ঠার এই বইটির সাধারণ সংস্করণের মূল্য ছিল ১ (এক) টাকা এবং বিশেষ রাজ সংস্করণের মূল্য ছিল ১ টাকা ৪ আনা (পাঁচ সিকা)।
  • উৎসর্গ: কবি তাঁর এই সুরভিত গীতিগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত বীণাকণ্ঠী গায়িকা প্রতিভা সোম-কে। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল:
    “কল্যাণীয়া বীণা-কণ্ঠী শ্রীমতী প্রতিভা সোম (রাণু) কল্যাণেষু…”
    এই প্রতিভা সোমই পরবর্তীতে প্রখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সহধর্মিণী এবং বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক প্রতিভা বসু নামে সুপরিচিত লাভ করেন।

২. সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য ও ভাববস্তু

‘চোখের চাতক’ গ্রন্থে নজরুল ভারতীয় ধ্রুপদী রাগসঙ্গীতের গভীরতা এবং ফারসি গজলের সুকোমল নমনীয়তাকে বাংলা গীতিভাষার সাথে এমনভাবে মিলিয়েছিলেন, যা তৎকালীন সুগম সঙ্গীতকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
ক) রাগাশ্রয়ী গজল ও ধ্রুপদী সুরের ব্যবহার
নজরুল এই সংকলনের প্রতিটি গজল ও গানে পিলু, ভৈরবী, খাম্বাজ, কাফি, সিন্ধু-ভৈরবী এবং দেশ রাগের অনবদ্য প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ওস্তাদি ঘরানার রাগসঙ্গীতকে ব্যাকরণের কঠিন শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে সাধারণ শ্রোতার বোধগম্য ও হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সুরে রূপান্তর করাই ছিল এই গ্রন্থের মূল কৃতিত্ব।
খ) ‘চোখের চাতক’: বিরহের শাশ্বত রূপক
কাব্যগ্রন্থটির নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর মূল ভাবাদর্শ। নয়নজুড়ে প্রিয়তমকে দেখার যে অপূর্ণ আকুলতা—সেই অমেট তৃষ্ণাই ‘চোখের চাতক’। ‘আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়’, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’, ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর’, কিংবা ‘তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা’ গানগুলোতে প্রেমাস্পদের অনুপস্থিতি এবং অনুরাগের এক নিভৃত হাহাকার ফুটে উঠেছে।
গ) ব্যাকরণ ও নান্দনিক শব্দচয়ন
নজরুল ‘চোখের চাতক’-এর গানগুলোতে আরবি-ফারসি শব্দাবলি এবং সংস্কৃত তত্সম পদাবলীর এমন এক অনুপম মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, যা বাংলা গীতি-কবিতার নান্দনিক মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

৩. গ্রামোফোন রেকর্ড ও বাংলা গানে প্রভাব

১৯২০-এর দশকের শেষভাগে গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডিং স্টুডিওগুলোতে ‘চোখের চাতক’-এর গানগুলো তুমুল ঝড় তুলেছিল। ইন্দুবালা, আঙুরবালা, কে মল্লিক, দিলীপকুমার রায় এবং পরবর্তীতে শচীন দেববর্মণ ও জীতেন বন্দোপাধ্যায়ের মতো বরেণ্য শিল্পীদের কণ্ঠে এই গানগুলো রেকর্ড হয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
বাংলা গানের ধারায় কেবল গীতিময়তা নয়, বরং রাগভিত্তিক সুকোমল গজল যে বাঙালি মানসিকতার সাথে গভীরভাবে মিশে যেতে পারে—’চোখের চাতক’ গ্রন্থটি তা চিরকালের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল।

‘চোখের চাতক’ (১৯২৯) গ্রন্থটির যাচাইকৃত সূচিপত্র

(সংগ্রহশালার কাঠামোগত সুবিধার্থে ‘চোখের চাতক’ গ্রন্থে সংকলিত কালজয়ী গানগুলোর পরিমার্জিত ও নির্ভুল নির্ঘণ্ট নিচে প্রদান করা হলো:)
  1. আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়
  2. আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন
  3. মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর
  4. তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা
  5. কেন মেঘের ছায়া আজি চাঁদের চোখে
  6. চোর-কাঁটা পড়েছিল পায়ে
  7. কথা কও কও কথা
  8. আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
  9. নিশি-পবন ফুলের দেশে যাও
  10. কেমনে রাখি আঁখি চাপিয়া
  11. নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল
  12. কি হবে জানিয়া বল কেন জল নয়নে
  13. বসন্ত মুখর আজি
  14. চোখ গেল চোখ গেল কেন ডাকিস রে
  15. পদ্মার ঢেউ রে
  16. কেউ ভোলে না কেউ ভোলে অতীত স্মৃতি
  17. দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি
  18. আমার সম্বল শুধু ওই স্মৃতিটুকু
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত