Editor's Choice

কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিঞ্জীর’ (১৯২৮) কাব্যগ্রন্থটি পরাধীনতার শিকল চূর্ণ করা, সুপ্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলা এবং বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাগরণের এক অসামান্য সাহিত্যিক আলেখ্য। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষভাগে, ১৯২৮ সালে (১৩৩৫ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের কাব্যধারায় এক ভিন্নমাত্রিক ওজস্বিতা ও আন্তর্জাতিক চেতনার সংযোজন করে। ‘জিঞ্জীর’ শব্দের শাব্দিক অর্থ শৃঙ্খল বা লোহার শিকল। পরাধীনতার যে পাষাণ-শৃঙ্খল ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষকে বন্দি করে রেখেছিল এবং সামাজিক জরাজীর্ণতা ও ভয় যে মানসিক শিকল দিয়ে জাতিকে আচ্ছন্ন করেছিল—সেই দ্বিমুখী ‘জিঞ্জীর’ চূর্ণ করার অদম্য উন্মাদনাই এই কাব্যের মূল প্রতিপাদ্য।

১. প্রকাশনার প্রেক্ষাপট ও নাম-মাহাত্ম্য

১৯২৮ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থটি নজরুলের সাহিত্যজীবনের এক অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও গতিময় অধ্যায়কে চিহ্নিত করে। ১৯২০-এর দশকের শেষ ভাগে একদিকে ভারতের অভ্যন্তরে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন নতুন রূপে জোরদার হচ্ছিল, অন্যদিকে তুরস্ক, মিশর, মরক্কো ও আফগানিস্তানের মতো এশীয় ও আফ্রিকীয় দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী রেনেসাঁ বা নবজাগরণের জোয়ার এসেছিল।

নজরুল অনুভব করেছিলেন যে শৃঙ্খল কেবল হাতে-পায়ের লোহাতেই থাকে না; মানুষের অবচেতন মনের জড়তা, কুসংস্কার, অনৈক্য এবং ভীতিও এক বড় ‘জিঞ্জীর’। তাই এই কাব্যে কবি শারীরিক বন্দিত্বের পাশাপাশি মানসিক দাসত্বের শিকল ভাঙার জন্য যৌবনের অদম্য শক্তিকে আবাহন করেছেন।

২. মূল ভাবাদর্শ ও বিষয়বস্তুর বহুমাত্রিকতা

‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থটিকে নজরুল কেবল রাজদ্রোহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; এতে তিনি সামাজিক সাম্য, আন্তর্জাতিক সংহতি, ধর্মীয় উৎসবের বৈপ্লবিক রূপায়ণ এবং ঐতিহাসিকভাবে মহীয়ান চরিত্রের জয়গান গেয়েছেন:

ক) বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা ও আন্তর্জাতিক সংহতি

নজরুল ছিলেন প্যান-এশীয় ও প্যান-ইসলামিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রামের এক মহা-উৎসাহী সমর্থক। কাব্যের ‘আমানুল্লাহ্’, ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ এবং ‘খালেদ’ কবিতাগুলোতে কবি এশীয় ও আফ্রিকীয় জাতির নিজস্ব সার্বভৌমত্ব অর্জনের লড়াইকে বন্দনা করেছেন।
  • আফগানিস্তানের আধুনিকায়ন ও স্বাধীনতার রূপকার আমানুল্লাহ খানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কবি সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘোষণা করেছেন।
  • মিশরের জাতীয়তাবাদী নেতা সা’দ জগলুল পাশার মৃত্যুতে রচিত ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, বিপ্লবীর শারীরিক মৃত্যু হলেও তাঁর মুক্তিকামী আদর্শ অমর।

খ) ঐতিহাসিক চরিত্রের পুনর্নির্মাণ ও ইসলামী সাম্যবাদ

‘উমর ফারুক’ ও ‘খালেদ’ কবিতা দুটি নজরুলের ইতিহাস-চেতনা ও আদর্শিক বিশ্বাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শ।
  • ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ)-এর অতি-সাধারণ জীবনযাপন, প্রজাবাত্সল্য, ন্যায়বিচার এবং সাম্যবাদী মানসিকতাকে কবি সাধারণ শোষিত জনতার পরম আশ্রয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবি প্রথাগত রাজতন্ত্র বা শাসককূলের উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে ‘উমর’-কে সাধারণ মানুষের খলিফা ও সাম্যের প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন।
  • ‘খালেদ’ কবিতায় বীর সেনাপতি খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের অদম্য সাহসকে স্মরণ করে কবি শোষণে জর্জরিত মুসলিম সমাজকে নিজেদের সুপ্ত শক্তি চিনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গ) উৎসবের সাম্যবাদী রূপায়ণ

‘ঈদ-মোবারক’, ‘নওরোজ’ এবং ‘আয় বেহেশ্‌তে কে যাবি আয়’ কবিতাগুলোতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে কবি সাম্য ও মিলনের মহা-প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ দিয়েছেন।
  • ‘ঈদ-মোবারক’ কবিতায় কবি ঈদকে কেবল উপাসনা বা ধনিকের উদযাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে দরিদ্র, অভাবী ও অনাহারী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক সমাজতান্ত্রিক আহ্বান হিসেবে তুলে ধরেছেন। ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে কোলাকুলি করার মধ্যেই যে ঈদের প্রকৃত সার্থকতা—কবি তা প্রাঞ্জল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

ঘ) নারী জাগরণ ও প্রগতিশীল সমাজ ভাবনা

কাব্যগ্রন্থের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘মিসেস্ এম. রহমান’, যা প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক মোসাম্মাৎ মরিয়াম খাতুন (মিসেস্ এম. রহমান)-এর স্মৃতি ও অবদানকে কেন্দ্র করে রচিত। সামন্তবাদী অবরোধপ্রথা ও অন্ধ কুসংস্কার কাটিয়ে নারী সমাজকে আলোর পথ দেখানোর ক্ষেত্রে এই প্রগতিশীল নারীর যে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ছিল, কবি তাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন এবং নারীমুক্তির বৈপ্লবিক বার্তাকে স্পষ্ট করেছেন।

৩. ভাষাশৈলী, শব্দচয়ন ও সাঙ্গীতিক গতিময়তা

‘জিঞ্জীর’ কাব্যের ভাষা অত্যন্ত ওজস্বী, ছন্দময় ও ঝংকারপূর্ণ। নজরুল এখানে আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত শব্দের এক দুর্লভ ও রাজকীয় মিশ্রণ ঘটিয়েছেন।
  • কুচকাওয়াজের ছন্দ: ‘নকীব’ বা ‘অগ্র-পথিক’ কবিতার মতো রচনাগুলোতে ছন্দের গতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা পাঠকের রক্তে বিপ্লবের দোলা দেয়।
  • নাটকীয় সংলাপ ও সুরের মেলবন্ধন: আবৃত্তির উপযোগী অলংকার ও নাট্যময়তার কারণে কবিতাগুলো শোনামাত্রই শ্রোতার মনে দৃশ্যপট তৈরি করতে সক্ষম হয়।

৪. সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র সাহিত্যসম্ভারে ‘জিঞ্জীর’ একটি বিশেষ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। একদিকে এর মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশি’র মতো দামামা ও দ্রোহের সুর, অন্যদিকে রয়েছে ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সিন্ধু-হিন্দোল’-এর মতো সামাজিক প্রগতিশীলতা ও গভীর ভাবের অনুপ্রবেশ। পরাধীনতার শিকল চূর্ণ করে বিশ্বমঞ্চে স্বীয় মর্যাদায় মাথা তুলে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন কবি দেখেছিলেন, ‘জিঞ্জীর’ তারই এক দীপ্ত ও অবিনাশী দলিল।

জিঞ্জীর কাব্যগ্রন্থের সূচিপত্র

কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিঞ্জীর’ (১৯২৮) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলোর সম্পূর্ণ তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:
  1. বার্ষিক সওগাত (বা অঘ্রাণের সওগাত)
  2. মিসেস্ এম. রহমান
  3. নকীব
  4. খালেদ
  5. “সুব্‌হ্-উম্মেদ”
  6. খোশ-আমদেদ
  7. নওরোজ
  8. ভীরু
  9. অগ্র-পথিক
  10. ঈদ-মোবারক
  11. আয় বেহেশ্‌তে কে যাবি আয়
  12. চিরঞ্জীব জগলুল
  13. আমানুল্লাহ্
  14. উমর ফারুক
Tags :

ফিচার ডেস্ক, আমার নজরুল

খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত