Editor's Choice

আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় (শ্যামাসঙ্গীত) | নজরুল সঙ্গীত

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভক্তিমূলক শাখা তথা শাক্ত পদাবলীর ধারায় এক অবিস্মরণীয়, ভাবগম্ভীর ও বিশ্বরূপ-অন্বেষার সৃষ্টি “আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়”। এই গানে দেবী কালী কেবল পৌরাণিক কোনো সংহারক রূপ নন; তিনি মহাবিশ্বের আদি জননী ও সৃষ্টির অনন্ত উৎস। ঘনঘোর তামসিক অন্ধকার থেকেই যে কোটি সূর্যের আলোকোজ্জ্বল রূপ প্রস্ফুটিত হয়, নজরুল সেই গভীর দার্শনিক সত্যকে অপূর্ব বাৎসল্য ও কাব্যিক দ্যোতনায় রূপায়িত করেছেন। রাগ জৌনপুরীর করুণ ও ভাবপূর্ণ বিস্তারে এবং দাদরা তালের দোলায় রচিত এই গানটি বাংলা শ্যামাসঙ্গীতের ইতিহাসে চিরকালীন এক কালজয়ী সৃষ্টি।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামআমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়
পর্যায়ভক্তিমূলক পর্যায় (শ্যামাসঙ্গীত)
গীতিকার ও সুরকারকাজী নজরুল ইসলাম
সংগীতধারানজরুল সঙ্গীত (শ্যামাসঙ্গীত / রাগাশ্রয়ী ভক্তিমূলক গীতি)
রাগজৌনপুরী
তালদাদরা (ছয় মাত্রা: ৩+৩)
মূল উপজীব্যকালীর মহাজাগতিক বিশ্বরূপ, অন্ধকারের বুকে আলোর জন্ম, অপার্থিব সৌন্দর্য ও ভক্তি
প্রধান চিত্রকল্পআলোর নাচন, শিবের বক্ষ, শিশু রবি-শশী, নীল-গগন, নিশীথিনীর কেশ, দিগ্বসন রূপ
আবেগীয় আবহভক্তিভাব, বিস্ময়, বাৎসল্য ও পরমসত্তায় আত্মনিবেদন

আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় (পুরো লিরিক)

কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।
(তার) রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।।
কালো মায়ের আঁধার কোলে
শিশু রবি শশী দোলে
(মায়ের) একটুখানি রূপের ঝলক স্নিগ্ধ বিরাট নীল–গগন।।
পাগলী মেয়ে এলোকেশী নিশীথিনীর দুলিয়ে কেশ
নেচে বেড়ায় দিনের চিতায় লীলার রে তার নাই কো শেষ।
সিন্ধুতে মা’র বিন্দুখানিক
ঠিকরে পড়ে রূপের মানিক
বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না মা আমার তাই দিগ্‌–বসন।।

Amar Kalo Meyer Payer Tolay (Puro Lyrics)

Kalo meyer payer tolay dekhe ja alor nachon.

(Tar) roop dekhe dey buk pete Shiv jar hate moron bachon.

Kalo mayer andhar kole

Shishu Robi Shoshi dole

(Mayer) ektukhani rooper jholok snigdho birat nil-gogon.

Pagli meye elokeshi nishithinir duliye kesh

Neche beray diner chitay leelar re tar nai ko shesh.

Sindhute mayer bindukhani

Thikre pore rooper manik

Bishwe mayer roop dhore na ma amar tai dig-boson.

গানের মূল ভাব

“আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়” গানটির মূল ভিত্তি হলো অন্ধকারের গর্ভ থেকে আলোর সৃষ্টি এবং পরমেশ্বরী কালীর বিশ্বরূপ দর্শন। সাধারণ দৃষ্টিতে কালো রঙকে অন্ধকারের বা ভীতির প্রতীক মনে করা হয়; কিন্তু নজরুল উপনিষদের গভীর সত্য অনুধাবন করে দেখিয়েছেন যে পরম অন্ধকারই হলো সমস্ত আলোর জননী।
কবির দৃষ্টিতে দেবী কালী কোনো কাল্পনিক ভয়াল প্রতিমা নন, বরং তিনি বিশ্বপ্রকৃতির এক অনন্ত লীলাময়ী রূপ। যাঁর রূপে স্বয়ং মহাদেব শিব মুগ্ধ হয়ে বক্ষ পেতে দেন, যাঁর আঁধার কোলে সূর্য ও চন্দ্রের মতো মহাজাগতিক নক্ষত্ররা শিশুর মতো দোলে, এবং যাঁর রূপের সামান্যতম স্ফুলিঙ্গে আকাশ ও সিন্ধু উদ্ভাসিত হয়—তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট মূর্তির কাপড়ে ঢেকে রাখা অসম্ভব। সমগ্র দিক বা আকাশই যাঁর বসন, সেই ‘দিগ্বসন’ মায়ের রূপ কোনো ক্ষুদ্র সীমানায় আবদ্ধ নয়; সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই তাঁর অনন্ত রূপের বহিঃপ্রকাশ।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. আলোর নাচন ও মহাদেবের সমর্পণ

  • “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন / রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন…”
    গানটির সূচনাই হয় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দিয়ে। দেবীর অঙ্গবর্ণ কালো, কিন্তু তাঁর পদতলে জন্ম নিচ্ছে অনন্ত আলোর বিচ্ছুরণ। স্বয়ং মৃত্যুঞ্জয় শিব, যিনি নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি ও ধ্বংসের নিয়ন্ত্রক, তিনিও এই রূপের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত হয়ে নিজের বুক পেতে দিয়েছেন।

২. মহাজাগতিক মাতৃত্ব ও প্রকৃতির বিস্তার

  • “কালো মায়ের আঁধার কোলে শিশু রবি শশী দোলে / একটুখানি রূপের ঝলক স্নিগ্ধ বিরাট নীল-গগন…”
    মাতৃত্বের এক মহাজাগতিক রূপক। আদি অন্ধকার থেকেই সূর্য ও চন্দ্রের জন্ম হয়েছে, যেন তারা মায়ের কোলে দোল খাওয়া দুটি নিষ্পাপ শিশু। আর মহাশূন্যের বিশাল নীল আকাশ দেবীর অপরূপ লাবণ্যেরই এক স্নিগ্ধ ঝলক মাত্র।

৩. প্রলয়ঙ্করী লীলা ও নিশীথিনীর কেশ

  • “পাগলী মেয়ে এলোকেশী নিশীথিনীর দুলিয়ে কেশ / নেচে বেড়ায় দিনের চিতায় লীলার রে তার নাই কো শেষ…”
    মহাকালের প্রলয় রূপ। রাত্রির অন্ধকার যেন তাঁরই উন্মুক্ত এলোকেশের বিস্তার। দিন যেখানে পুড়ে ভস্মীভূত হয় (দিনের চিতা), সেই ধ্বংসের প্রান্তরে দাঁড়িয়েও তিনি অবিরাম নেচে চলেন। ধ্বংসের অন্তরালেই যে নতুন সৃষ্টির সূচনা, এটি সেই অনন্ত লীলার প্রকাশ।

৪. সিন্ধুর বিন্দু ও অনন্ত দিগ্বসন

  • “সিন্ধুতে মা’র বিন্দুখানিক ঠিকরে পড়ে রূপের মানিক / বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না মা আমার তাই দিগ্‌-বসন…”
    কালীর অনন্ত বিস্তারের রূপায়ন। বিশাল সমুদ্রও যাঁর রূপের একবিন্দু মানিক ধারণ করতে পারে না, সেই সর্বব্যাপ্ত মহাশক্তিকে কোনো মানবনির্মিত বস্ত্র দিয়ে কীভাবে আবৃত করা সম্ভব? তাই সমস্ত দিক ও মহাশূন্যই যাঁর পরিধান, তিনি শাশ্বত ‘দিগ্বসন’।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

গানটিতে সৃষ্টি ও ধ্বংসের চিরন্তন চক্রের সামনে দাঁড়িয়ে পার্থিব অহংকারের বিদায় নেওয়ার এক রূপক প্রকাশ ঘটেছে। দিনের আলো নিভে যখন ‘দিনের চিতা’ জ্বলে ওঠে এবং মহাকালের পায়ে মৃত্যুর প্রহর ঘনিয়ে আসে, তখন মানুষের ক্ষুদ্র দৃষ্টি সম্পূর্ণ আশাহীন ও নিথর হয়ে পড়ে। কিন্তু নজরুল এই আশাহীন নয়নকে কোনো অবসাদে বিলীন হতে দেননি। জাগতিক সমস্ত সম্পর্কের সমাপ্তি ও বিদায়ের আঘাত মায়ের কোলে রবি-শশীর মতো আত্মসমর্পণে পরিণত হয়। সৃষ্টির অনিত্যতা স্বীকার করে নিয়ে আশাহীন চোখ মেলে মায়ের অসীম রূপের দিকে চেয়ে থাকাই সাধকের পরম মুক্তি।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • দ্বান্দ্বিক রূপকের মেলবন্ধন (Oxymoron): ‘কালো মেয়ের পায়ে আলোর নাচন’ কিংবা ‘আঁধার কোলে রবি শশী’—পরস্পরবিরোধী অনুষঙ্গের সার্থক ব্যবহারে কবিতাটি গভীর দার্শনিক তাৎপর্য পেয়েছে।
  • মহাজাগতিক কল্পনা (Cosmic Vision): সূর্য, চন্দ্র, সমুদ্র ও মহাশূন্যকে একটি পরিবারের মতো মায়ের কোলে উপবিষ্ট দেখিয়ে বিশ্বরূপের অপূর্ব কাব্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।
  • বাৎসল্য ও ভক্তির যুগল রূপ: ভয়াল চামুণ্ডা রূপকে ছাপিয়ে এখানে একাধারে ‘মেয়ে’ (কন্যা) ও ‘মা’ (জননী) সম্বোধনের মধ্য দিয়ে এক গভীর মমত্ববোধ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • জৌনপুরী রাগের আর্তি ও বিস্তার: আশাবরী ঠাটের অন্তর্গত মধ্যাহ্নকালীন রাগ ‘জৌনপুরী’-র আশ্রয়ে গানটি রচিত। জৌনপুরীর কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত ও কোমল নিখাদের গভীর সুরবিন্যাস বাণীর ভেতরের ভক্তিবিনম্র করুণ আবেদনকে প্রগাঢ় করে তোলে।
  • দাদরা তালের সমাহার: ছয় মাত্রার দাদরা তালের সাবলীল লয় গানের ‘আলোর নাচন’-এর ভাবটিকে এক নৃত্যময় প্রবহমানতা দান করেছে।
  • স্বরপ্রক্ষেপণ: উচ্চাঙ্গ সুরের বিস্তার সত্ত্বেও গানের প্রতিটি স্তবকে বাণীর ভাবাবেগ ও শব্দোচ্চারণ নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত থাকে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি ও মানবতার চিরন্তন বাণীবাহক। রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের পর বাংলা শ্যামাসঙ্গীতের ধারায় নজরুলই সবচেয়ে যুগান্তকারী নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। ইসলামি সংগীত রচনার পাশাপাশি শত শত শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তন রচনা করে তিনি বাংলার মাটিতে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
  • ঐতিহাসিক পরিবেশনা: প্রখ্যাত শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে গানটি বাঙালি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে প্রতিটি সংগীতপ্রেমীর অন্তরে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়” কেবল শাক্ত সম্প্রদায়ের কোনো ধর্মীয় প্রার্থনা নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম প্রধান স্মারক। একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কাজী নজরুল ইসলাম কীভাবে মায়ের বিশ্বজনীন রূপকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন, এই গান তারই চিরন্তন প্রমাণ। দীপাবলি ও কালীপূজার আসরে এই গানটি ভক্তি, সৌন্দর্য এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের এক পরম প্রেরণা হিসেবে আজও সমানভাবে সমাদৃত।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. নজরুল-গীতিকা (ভক্তিমূলক শাখা), কাজী নজরুল ইসলাম।
  2. নজরুল রচনাবলী ও শ্যামাসঙ্গীত সংকলন, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
  3. নজরুল সঙ্গীত পরিক্রমা, সুফি জুলফিকার হায়দার।

 

 

আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় (শ্যামাসঙ্গীত) | নজরুল সঙ্গীত

 

Tags :

কাজী নজরুল ইসলাম

<div id="model-response-message-contentr_6711829050503afa" class="markdown markdown-main-panel md-content enable-luminous-fast-follows enable-updated-hr-color tutor-markdown-rendering" dir="ltr" aria-live="polite"> <div>বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্মরণীয়। পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলিত মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সাম্যবাদ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের এক অনবদ্য দলিল। সাহিত্য ও সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল বিস্ময়কর; একদিকে যেমন তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রলয়োল্লাস’-এর মতো কবিতা পরাধীনতার বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে তাঁর সৃষ্ট চার সহস্রাধিক গান (নজরুল গীতি) বাংলা কাব্যসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আরবি-ফার্সি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি তিনি সমান মমতায় ইসলামি হামদ-নাত এবং শাক্ত ভাবধারার শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী সুরকে একসূত্রে বেঁধে নজরুল বিংশ শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বরং আজও তিনি মুক্তিকামী ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছেন।</div> </div>

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


খুঁজুন

জনপ্রিয় লেখা

বিভাগসমূহ

সর্বশেষ খবর

সর্বশেষ লেখা সরাসরি ই-মেইলে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!



    সাম্প্রতিক লেখা

    © ২০২৬ আমার নজরুল, GOLN — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত